ফ্যাশন হাউস মানাস ও পপ–আপ রেস্তোরাঁ সঞ্চয়িতার স্বত্বাধিকারী শিল্পী ফায়জা আহমেদের বাড়িতে আলো-বাতাস যেমন আছে, তেমনি বাসার আনাচকানাচে ছড়িয়ে আছে পুরোনো দিনের স্মৃতি ও আভিজাত্য।
নতুন বাসায় উঠলেই যে সব নতুন করে সাজাতে হবে, এমনটা কখনোই মনে করেন না ফায়জা। আসলে বাসা সাজানোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো বাজেট বা চলতি ধারা অনুসরণ করেন না এই উদ্যোক্তা, ‘আমি দেখি, আমার যা যা ভালো লাগে সেগুলো আছে কি না। আর সেই জিনিসগুলো কোথায় রাখলে আমার ভালো লাগবে।’
দরজার পাশের দেয়ালে লেখা ‘সুনিয়েল ও ফায়জার আনন্দ নিলয়ম’। বাসায় ঢুকতেই চোখে পড়ে বসার ঘরের সঙ্গে লাগোয়া খাবার ঘর। দুই ঘরে বড় বড় দুটি জানালা। বসার ঘরের জানালাটি উত্তরমুখী আর খাবার ঘরেরটি দক্ষিণমুখী। খালি জায়গা তাঁর কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। ফায়জার মতে, বাতাস চলাচল ও আলো ঢোকার সুযোগ চাই-ই চাই। ভারী পর্দা বা অপ্রয়োজনীয় আসবাব দিয়ে কখনোই আলো-বাতাস আটকাতে চান না।
কাঠের টেবিল, শোকেস, সিন্দুক ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আনা সোফা দিয়ে বসার ঘর সাজিয়েছেন ফায়জা আহমেদ। রসুইঘরের যে জিনিসগুলো সাধারণত আড়ালে থাকে, যেমন তামার পাতিল, ঝাঁজরি, সেগুলোই তাঁর ঘরে দৃশ্যমান জায়গায় উঠে এসেছে। কারণ হিসেবে বলেন, ‘যে জিনিস দিয়ে আমরা খাই, সেটাকে লুকিয়ে রাখার কোনো কারণ দেখি না।’
ফায়জা আহমেদ পছন্দ করেন হাতে বানানো জিনিস। শান্তিনিকেতন থেকে আনা হাতে বোনা কাপড়ের পর্দা, মায়ের কাছ থেকে পাওয়া ছোটবেলার কাঁথা, মাটি আর কাঁসার পাত্র সব মিলিয়ে তাঁর বসার ঘরটি যেন এক জীবন্ত স্মৃতিশালা। অফিসে বহুদিন ধরে ব্যবহার করা আলমারি নতুন করে রং করেছেন। নতুন জিনিসের চেয়ে পুরোনো, ব্যবহৃত, গল্প ভরা জিনিসই তাঁর বেশি প্রিয়। অনেক কিছুই সংগ্রহ করা। বাড়িতে যা দরকার নেই, সেটা সরিয়ে ফেলেছেন।
ফায়জা বলেন, ‘মিনিমালিজমের ট্রেন্ডে গা ভাসাতে গিয়ে আমরা আর দেশি থাকতে পারছি না। আমার মনে হয় শুধু সাদা দেয়াল বা ইউরোপিয়ান ধাঁচের সাজ মিনিমালিজম নয়। বরং গ্রামবাংলার সহজ, কম জিনিস রাখার অভ্যাসই প্রকৃত মিনিমালিজম। গুগল কিংবা পিনটারেস্ট না দেখে আমার দেশের শিকড় কীভাবে সরল ছিল, সেটাকে অনুকরণ করতেই বেশি পছন্দ করি।’
ফায়জার শোবার ঘরেও রয়েছে একটি খাট আর আলমারি। বাসাজুড়ে নানা চিত্রকর্ম। পেইন্টিংগুলো কিছু তাঁর নিজের করা, কিছু করেছে তাঁর ছেলে আর কিছু নানা সময়ে কিনে সংগ্রহ করেছেন। ফায়জার ডাইনিং টেবিলের দুই পাশে দুটি বেঞ্চ রাখা। হেলান দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। টেবিলের ওপরে বিছিয়ে রেখেছেন যশোরের নকশিকাঁথা। তার ওপর শীতলপাটি আর কাঁসা, তামার পাত্র। সাজিয়েছেন বৈজয়ন্তীর বীজ।
খাবার ঘরের দক্ষিণমুখী জানালা দিয়ে দেখা যায় বাগান। বাগানের জন্যই বাসাটি নিয়েছেন ফায়জা। সকালে ঘুম থেকে উঠেই বাগানে সময় কাটান। সাজানো–গোছানো বাগান তাঁর পছন্দ নয়। আগাছাও ফেলেন না। তুলসী, ধুন্দুল, কুমড়া, কলাগাছ, আকন্দ, বাসক, নিম, গাজর, কুমড়া, কাঁচা মরিচসহ নানা ধরনের গাছ রয়েছে। সাদা, লাল ও গোলাপি জবা দিয়ে নিজের চুলের জন্য তেল বানান। আছে বাগানবিলাস আর ছেলের পছন্দের গোলাপ।
ফায়জা আহমেদের বাসায় কোনো টেলিভিশন নেই। তাঁর মনে পড়ে আশির দশকের কোনো এক ফুটবল বিশ্বকাপে তাঁর বাবা তাঁকে টেলিভিশন কিনে দিয়েছিলেন। এবার বিশ্বকাপে হয়তো ছেলের আবদার মেটাতে নতুন টিভি কিনবেন ফায়জা।
ফায়জার বাসায় সিন্দুকে শুধু দুটি তালা লাগানো আছে, আগের দিনে টেলিফোনে এ ধরনের তালা লাগানো থাকত। পুরো বাসায় এটাই একমাত্র তালা। সিন্দুকটাতে কিছু কাঁথা আছে। আর আছে মায়ের দেওয়া খুবই অল্প কিছু গয়না। বিড়ম্বনা থেকে বাঁচতে বেশির ভাগ গয়নাই বিক্রি করে ফেলেছেন। দেশের একটি অ্যান্টিক শপ থেকে সিন্দুকটি কিনেছিলেন। ফায়জা বলেন, তাঁর বাসায় চোর এলে বরং বিরক্ত হবে। এসে নেওয়ার মতো কিছু খুঁজে পাবে না। পাবে না ভাঙার মতো কোনো তালাও!