ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্যদের রাজকীয় অনুষ্ঠানগুলোয় দেখা যায় নিত্যনতুন পোশাকে। একই পোশাক তাঁদের দ্বিতীয়বার পরতে দেখা যায় না বললেই চলে। অনেকের মনে তাই প্রশ্ন, কোটি কোটি টাকার ব্যবহৃত ওই পোশাকগুলো কী হয়? এসব কি ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়? নাকি গোপনে কাউকে দিয়ে দেওয়া হয়? সাধারণ মানুষের এমন সব কৌতূহলী প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন রাজপরিবারের ফ্যাশন–বিশেষজ্ঞ বেথান হোল্ট। তিনি রাজপরিবারের স্টাইল ও ফ্যাশন নিয়ে দুটি জনপ্রিয় বইও লিখেছেন। চলুন, জেনে নেওয়া যাক রাজপরিবারের পোশাকের পেছনের কিছু অজানা ও চমকপ্রদ তথ্য, যা হয়তো আগে কখনো শোনেননি।

ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রতিটি কাজের পেছনে হাজারো নিয়ম। তবে অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কী করা হবে, তা নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম বা নির্দেশ নেই। কোনো একটি জিনিসের শেষ পরিণতি কী হবে, তা মূলত নির্ভর করে জিনিসটি দেখতে কেমন বা এর মালিক কে, তার ওপর।
যদিও ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে কিছু জিনিস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য যত্ন করে তুলে রাখতে হয়। তবে রাজপরিবারের সদস্যরা আদতে বেশ বাস্তববাদী। তাঁরা চান তাঁদের ব্যবহৃত প্রতিটি জিনিস যেন নষ্ট না হয়ে সবচেয়ে ভালো কোনো কাজে লাগে।
রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ কোনো পোশাক কেবল পছন্দ হচ্ছে না বলে ফেলে দেওয়া মোটেও পছন্দ করতেন না। তাঁর মধ্যে ছিল বিশ্বযুদ্ধের সময়ের সেই মিতব্যয়ী আর সাশ্রয়ী মানসিকতা।
এ কারণেই রানির পুরোনো কাপড় কেটে নতুন করে অন্য পোশাক বানিয়ে নেওয়ার অনেক গল্প প্রচলিত আছে। বিশেষ করে প্রাসাদের ভেতরে যখন তিনি নিজের মতো করে সময় কাটাতেন, তখন ওই পুরোনো পোশাকগুলোই বারবার পরতেন।
অবাক করা বিষয় হলো, কোনো পোশাক বারবার ব্যবহারের ফলে যখন একদম ছিঁড়ে যেত বা পরার অনুপযোগী হয়ে পড়ত, তখনো তা ফেলে দেওয়া হতো না। রানি সেই কাপড়ের টুকরাগুলো ঘর মোছার কাপড় হিসেবে ব্যবহার করার নির্দেশ দিতেন।
একটু কল্পনা করে দেখুন, রানির কোনো এক সময়ের মহামূল্যবান পোশাকের টুকরা দিয়েই হয়তো প্রাসাদের কর্মীরা বইয়ের তাক বা আসবাবের ধুলাবালি ঝাড়তেন।
পোশাকের ব্যাপারে রানি এলিজাবেথের সাশ্রয়ী মনোভাব তাঁর পরিবারের অন্যদের মধ্যেও প্রভাব ফেলেছে। প্রিন্স ফিলিপ, রাজা চার্লস ও প্রিন্সেস অ্যান—একই পোশাক বারবার পরতে পছন্দ করেন।
রাজা চার্লসকে প্রায়ই একটি বিশেষ ক্যামেল কোট পরতে দেখা যায়, যা আদতে তাঁর বাবার ছিল। চামড়ার বোতাম আর চমৎকার বেল্টের এই কোট চার্লস ২০২৩ সালের এক প্রার্থনা সভায়ও পরেছিলেন। অথচ তাঁর বাবা প্রিন্স ফিলিপকে প্রথম এই পোশাকে দেখা গিয়েছিল ১৯৫৬ সালে।
প্রিন্সেস অ্যানও এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। সম্প্রতি একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রিন্সেস অ্যান ৫৭ বছরের পুরোনো একটি কোট পরেছিলেন। সাদা রঙের এই কোট তিনি যখন প্রথম পরেছিলেন, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর।
২০২৬ সালের মার্চ মাসে নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করার আগে তিনি কোটটির কলার পরিবর্তন করে সামান্য নতুন রূপ দিয়ে নিয়েছিলেন।
তবে সবাইকে ছাপিয়ে গেছেন প্রিন্স ফিলিপ। তিনি তাঁর বিয়ের জুতাজোড়া টানা ৭০ বছর পায়ে গলিয়েছিলেন।
এ ক্ষেত্রে রাজপরিবারের অন্য সদস্যরাও পিছিয়ে নেই। প্রিন্সেস ডায়ানা তাঁর পোশাকগুলো বারবার পরতে ও সেসবে নতুনত্বের ছোঁয়া দিতে পছন্দ করতেন।
১৯৮৭ সালে পর্তুগাল সফরে তিনি লম্বা হাতার একটি হালকা নীল গাউন পরেছিলেন। ঠিক দুই বছর পর একটি দাতব্য অনুষ্ঠানে সেই একই গাউন আবার দেখা যায়। তবে এবার আর হাতা ছিল না এবং গলার নকশায়ও আনা হয়েছিল চমৎকার পরিবর্তন।
বর্তমান সময়ে পোশাকের এমন ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়েন প্রিন্সেস কেট। বড়দিন, উইম্বলডন কিংবা বাফটার মতো বড় বড় অনুষ্ঠানে তাঁকে প্রায়ই তাঁর প্রিয় পুরোনো পোশাকে দেখা যায়।
প্রিন্সেস কেটের কাছে এক জোড়া পেনেলোপি চিলভার্স বুট আছে, যা টানা ২২ বছর ধরে ব্যবহার করছেন।
রাজপরিবারের গয়নাগুলো সাধারণত এক হাত থেকে অন্য হাতে ঘোরে। রাজমুকুটগুলো দেশের সম্পদ হিসেবে গণ্য হলেও ব্যক্তিগত গয়নাগুলোর মালিক রাজপরিবারের সদস্যরা।
কয়েক প্রজন্ম ধরে চলা রাজকীয় প্রতীক আর অমূল্য গয়নার এক বিশাল ভান্ডার আছে তাঁদের কাছে। মজার ব্যাপার হলো রাজপরিবারের সদস্যরা নিজেদের এই গয়নাগুলোর মালিক মনে না করে বরং রক্ষক মনে করেন। যাতে এসব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুরক্ষিত থাকে।
এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে এমন এক বিখ্যাত গয়না হলো রানি মেরির ‘লাভার্স নট টিয়ারা’। মুক্তা বসানো এই ঝলমলে মুকুট ১৯১৩ সালে রানি মেরির জন্য বানানো হয়েছিল। এরপর এটি রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ, প্রিন্সেস ডায়ানা ও বর্তমানে প্রিন্সেস কেট ব্যবহার করছেন।
তেমনি আরেকটি গয়না রানি ভিক্টোরিয়ার স্যাফায়ার ব্রোচ বা নীলকান্তমণি ব্রোচ। ১৮৪০ সালে বিয়ের আগের রাতে প্রিন্স অ্যালবার্ট তাঁর হবু স্ত্রী ভিক্টোরিয়াকে এটি উপহার দিয়েছিলেন।
এরপর থেকে এটি পরবর্তী সব রানির কাছে হস্তান্তরিত হয়েছে। ২০২৪ সালে রানি ক্যামিলাকেও এই ঐতিহাসিক ব্রোচটি পরতে দেখা গেছে।
রানি এলিজাবেথের পোশাকগুলোর ঐতিহাসিক মূল্য এতই বেশি যে সেসবের বেশির ভাগই উইন্ডসরের একটি বিশেষ আর্কাইভে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে রাখা হয়েছে।
সেখানে চার হাজারের বেশি পোশাক ও অন্যান্য জিনিস আছে। সাধারণ মানুষের জন্য এই জায়গায় প্রবেশ নিষিদ্ধ হলেও এ বছর রানির শততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বাকিংহাম প্যালেসে একটি বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে।
সেখানে রানির মাত্র আট বছর বয়সে পরা ব্রাইডসমেড পোশাক থেকে শুরু করে তাঁর বিয়ের রাজকীয় গাউন—সব মিলিয়ে প্রায় ২০০ দুর্লভ জিনিস দেখার সুযোগ পাচ্ছেন দর্শনার্থীরা।
রাজপ্রাসাদের সব জিনিসই যে সব সময় নিখুঁত থাকে; তা কিন্তু নয়। মাঝেমধ্যে সেখানেও বিপত্তি ঘটে। রাজকীয় আর্কাইভের কিছু পুরোনো আসবাবের কাঠে পোকার ছিদ্র পাওয়া গেছে। ধারণা করা হয়, বিশেষজ্ঞদের কাছে আসার আগে সেসব হয়তো কোনো অন্ধকার ঘরে অবহেলায় পড়ে ছিল।
সাধারণত প্রাসাদের যেসব আসবাবের আর প্রয়োজন হয় না, সেসব রয়্যাল ট্রাস্টের আর্কাইভে বা অন্য কোনো প্রাসাদে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
আর যদি কোনো আসবাব একদমই ভেঙে যায় বা কোনোভাবেই আর ব্যবহার করা না যায়, তাহলে সেসব ফেলে দেওয়া হয়।
রাজপরিবারের দামি সব পোশাক চ্যারিটি শপেও (দাতব্য কাজের জিনিসপত্র বিক্রির দোকান, মূলত অলাভজনক) পাওয়া যায়। প্রিন্সেস ডায়ানার অনেক পোশাক মাঝেমধ্যেই এমন দোকানে পাওয়া যেত। আদতে রাজপরিবারের সদস্যরা অনেক সময় তাঁদের কর্মীদের পোশাক উপহার দেন।
আর সেই কর্মীরাই আবার সেসব চ্যারিটি শপে দান করে দিতেন। ফলে কিছু পোশাক সাধারণ মানুষের কাছে চলে আসে। অনেক সময় ভাগ্যের জোরে কেউ কেউ এসব দোকান থেকে খুব সস্তায় দামি কোনো পোশাক কিনে ফেলেন। পরে হয়তো পুরোনো কোনো ছবি বা ভিডিও দেখে তাঁরা আবিষ্কার করেন, এটি আদতে কোনো রাজকীয় ব্যক্তির পোশাক ছিল। এরপর সেই পোশাক আবার কেউ কেউ নিলামে তুলে বিপুল অর্থও আয় করেছেন।
১৯৯৭ সালে প্রিন্সেস ডায়ানা ক্যানসার ও এইডসের ওপর গবেষণার জন্য তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশে৵ তাঁর ৭৯টি পোশাক নিলামে তুলেছিলেন। সেই নিলাম থেকে সংগৃহীত হয়েছিল প্রায় ৩০ লাখ ডলার।
রাজপরিবারের অন্য সদস্যরা সাধারণত নিজেদের জিনিস হাতছাড়া করতে চান না। তবে তাঁদের মৃত্যুর পর অনেক সময় উত্তরাধিকারীরা সেসব নিলামে তুলতে বাধ্য হন।
২০০৬ সালে প্রিন্সেস মার্গারেটের মৃত্যুর পর তাঁর বিখ্যাত পোলটিমোর টিয়ারা প্রায় ১৪ লাখ ডলারে বিক্রি করা হয়। তবে এই টাকা কিন্তু দান করা হয়নি; বরং বিশাল অঙ্কের উত্তরাধিকার কর মেটাতেই তা বিক্রি করতে হয়েছিল।
আপনি কি রাজকীয় কোনো স্মৃতি নিজের সংগ্রহে রাখতে চান? তবে আপনাকে হয় খুব ধনী হতে হবে, না হয় খুব সৌভাগ্যবান।
কেননা, ডায়ানার বিখ্যাত কালো রিভেঞ্জ ড্রেসটি ১৯৯৭ সালে নিলামে বিক্রি হয়েছিল ৭৪ হাজার ডলারে। আবার ২০২৩ সালে তাঁর একটি ব্যালে-স্টাইলের গাউন বিক্রি হয়েছে প্রায় ১০ লাখ ডলারে।
তবে ১৯৯৬ সালে ইংল্যান্ডের বার্কশায়ারের এক দোকান সহকারী মাত্র ২০০ পাউন্ড দিয়ে একটি সিল্কের গাউন কিনেছিলেন। পরে একটি তথ্যচিত্র দেখে জানতে পারেন, পোশাকটি হুবহু প্রিন্সেস ডায়ানার বাহরাইন সফরে পরা পোশাকের মতো।
পরীক্ষা করে দেখা যায়, সেটি আদতেই রাজকীয় পোশাক ছিল। পরবর্তী সময়ে এক জাদুঘর সেটি ২ লাখ ১০ হাজার ডলারে কিনে নেয়।
পুরোনো পোশাক নতুন করে পরা কিংবা কোনো জিনিসকে মেরামত করে আবার ব্যবহার করা রাজপরিবারে নতুন কিছু নয়। তবে এই প্রথাকে আধুনিক সময়ে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ও তাঁর স্বামী প্রিন্স ফিলিপ।
রানি ও তাঁর স্বামী বেড়ে উঠেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কঠিন সময়ে। যখন রেশনিং ও সীমিত সম্পদে জীবন চালানোর বাধ্যবাধকতা ছিল। যা আছে, তা দিয়েই কাজ চালানো—এই দর্শনই তাঁদের বাস্তববাদী করে তুলেছিল।
বিলাসিতা আর জাঁকজমকের মধে৵ বাস করেও তাঁরা এই সাধারণ জীবনবোধ হারাননি। আর একই শিক্ষা তাঁরা দিয়ে গেছেন তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মকেও।
তবে পরবর্তী প্রজন্মের এই পরিবেশ সচেতনতার পেছনে আরও একটি বড় কারণ আছে। বর্তমান রাজা চার্লস পাঁচ দশক ধরে পরিবেশ সুরক্ষা ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করছেন।
অন্যদিকে প্রিন্স উইলিয়ামও জলবায়ু পরিবর্তনে সচেতনতা গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখছেন। তাই রাজপরিবারের মিতব্যয়ী হওয়ার এই চেষ্টা আদতে তাঁদের পরিবেশবাদী চিন্তাধারারই একটি অংশ।
সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট