
শৈত্যপ্রবাহের কারণে তিন দিন পর বাচ্চাকে গোসল করালাম। তারপর বারান্দার রোদে পাটি পেতে দিলাম, সেখানেই খেলতে বসে গেল। সেই সুযোগে এক মগ চা নিয়ে পত্রিকাটা হাতে নিলাম। একটা খবরে চোখ আটকাল, বিস্তারিত পড়ছি, এমন সময় কাজের সহকারীর চিৎকারে সম্বিত ফিরল। ‘আপা, দেখেন বাবু কী অবস্থাটা করছে!’ আমার বাবু মোড়ার ওপর দাঁড়িয়ে বাসার পানি পিউরিফায়ারের কল খুলে তার বাবুদের অর্থাৎ কাপড়ের পুতুলগুলোকে ইচ্ছেমতো গোসল করাচ্ছে; ডাইনিং রুম পানিতে ভেসে গেছে!
দিনের ভেতর যখনই সুযোগ পায়, চেয়ার বেসিনের কাছে টেনে নিয়ে গিয়ে সাবান দিয়ে হাতটা ধুতেই থাকে, ধুতেই থাকে। আপনারও যদি একটা টডলার (১ থেকে ৩ বছর বয়সী শিশু) থাকে, খেয়াল করলে দেখবেন, ওরা পানি খুব ভালোবাসে। সারাক্ষণ পানি নিয়ে খেলতে চায়, পানি নিয়ে খেলার কোনো সুযোগ হাতছাড়া করে না। আপনি যদি আপনার মা–বাবার কাছে শোনেন, তাহলে ওই বয়সে আপনিও পানি নিয়ে মেতে থাকতেন, এমন উত্তর পাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে। এই বয়সের শিশুরা কেন পানি নিয়ে খেলতে এত ভালোবাসে?
১. সব ইন্দ্রিয়ের মিলিত অভিজ্ঞতা
আরও ছোটবেলা থেকে গোসলের মাধ্যমে পানির সঙ্গে শিশুদের পরিচয়। পানির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কারণেই তারা পানি নিয়ে কৌতূহলি থাকে। পানি শিশুদের ত্বকে লেগে অনুভূতি দেয়, পানি শব্দ সৃষ্টি করে, শিশুরা পানি খায়, পানি আকৃতি বদলায় (যখন যে পাত্রে রাখা হয়, সেই আকৃতি নেয়)—তাই এটি শিশুকে একটি পূর্ণ ইন্দ্রিয়লব্ধ (স্পর্শ, দর্শন, শ্রবণ, স্বাদ) অভিজ্ঞতা দেয়।
২. নিয়ন্ত্রণ ও আত্মবিশ্বাসের অনুভূতি
পানির কল খুলতে লাগাতে পারলে, পানি ঢালতে বা ছিটাতে পারলে তারা ক্ষমতাবান বোধ করে। শিশুরা মনে করে, ওরা কিছু একটা অর্জন করতে পেরেছে।
৩. ক্রমাগত ‘গবেষণা’ ও শেখা
শিশুরা স্বভাবগতভাবেই কৌতূহলি। তাঁরা প্রতিনিয়ত কারণ ও ফলাফল খোঁজে—পানি দ্রুত ঢাললে কী হয়, কীভাবে পানি দিয়ে জামাকাপড় ভেজে, কীভাবে সাবানের ফেনা হয় বা পানিতে কী ভাসে বা ভাসে না অথবা কোন জিনিস পানিতে ভেজালে কেমন হয় ইত্যাদি নিয়ে প্রতিনিয়ত পরীক্ষা–নিরীক্ষা করতে থাকে।
৪. শক্তি খরচ ও আবেগের প্রকাশ
পানি ছিটানো ও পানি নিয়ে খেলার মাধ্যমে শিশুরা শক্তি ব্যয় করে। শিশুদের আবেগ প্রকাশের পথ খুলে যায়।
আপনি শিশুকে যতই পানি নিয়ে খেলার জন্য বকা দেন না কেন, এটা কিন্তু আদতে শিশুর জন্য ভালো। পানি নিয়ে খেলা শিশুদের জন্য শান্তিদায়ক ও আরামদায়ক। পানিতে হাত লাগানো, ঢালা বা ছিঁটানোর মতো ইন্দ্রিয়গত অভিজ্ঞতা তাদের মন শান্ত করে, অতিরিক্ত শক্তি বের করতে সাহায্য করে এবং মনোযোগ বাড়ায়। একই সঙ্গে তারা আনন্দ নিয়ে খেলতে পারে।
জল ঢালা, চেপে ধরা, স্কুপ করা বা স্প্রিঙ্কলারের মধ্যে দৌড়ানোর মতো কাজগুলো শিশুদের ফাইন মোটর স্কিল (হাত-চোখের সমন্বয়, আঙুলের শক্তি) ও গ্রস মোটর স্কিল (ভারসাম্য, শরীরের বড় নড়াচড়া, কোর শক্তি) উন্নত করতে সাহায্য করে। পানি সহজে রূপ বদলায় বলে শিশুরা নানা কল্পনার খেলা তৈরি করতে পারে—সমুদ্রের গল্প, নৌকা ভাসানো, বুদ্বুদ বা রং মেশানো ইত্যাদি। এতে তাদের সৃজনশীল চিন্তা আরও প্রসারিত হয়।
পানি নিয়ে খেলতে খেলতেই শিশুরা ভাসা-ডোবা, গরম-ঠান্ডা, কার্যকারণ, বেশি-কম, খালি-ভরা ইত্যাদির ধারণা শেখে। এটি তাদের প্রাথমিক বিজ্ঞান ও গণিত বোঝার ভিত্তি তৈরি করে।
তাই পানি নিয়ে খেলার জন্য বকাঝকা বা কড়া শাসনের কিছু নেই। শিশুদের অফুরন্ত সময় আর পানি হাতের নাগালেই, তাই পানি নিয়ে খেলাটাই স্বাভাবিক। কেবল খেয়াল রাখবেন শিশু যাতে (নিজের ফেলা পানিতে পিছলে পড়ার মতো) কোনো ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটিয়ে ফেলে। বালতিতে পানি রাখবেন না। আর বাথরুমের দরজা সব সময় লাগিয়ে রাখবেন। জামাকাপড় ভিজিয়ে বা অতিরিক্ত পানি ঘাটার ফলে যাতে ঠান্ডা না লেগে যায়, সে দিকটাও খেয়াল রাখবেন।
সূত্র: সেন্ট নিকোলাস আর্লি এডুকেশন