
পাঁচ কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী। ঘরে বসে ইন্টারনেট ঘেঁটেঘুঁটে তাঁরাই এক কাণ্ড ঘটিয়ে বসেছেন! কণাপদার্থবিজ্ঞানের মতো জটিল বিষয় নিয়ে শুধু যে গবেষণা করেছেন, তা নয়; এই খাতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সার্ন আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বিজয়ীও হয়েছেন তাঁরা।
পাঁচজনের পরিচয়টা আগে দিই। চৌমুহনী সরকারি সালেহ আহমেদ কলেজের সালমান আলম, আবদুল রহিম ও এস এম তাওসিফ; রংপুর কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের নাজিয়া তিতিম এবং ঢাকার বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের নাজিফা তাসনিম। তাঁদের দলের নাম পোলারিস, অর্থাৎ ধ্রুবতারা। ধ্রুবতারাকে পথ দেখিয়েছেন মো. নিশাদ আহমেদ। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী ছিলেন কোচ।
প্রতিবছর ‘ইউরোপিয়ান অর্গানাইজেশন ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ’ (সার্ন) আয়োজন করে ‘বিমলাইন ফর স্কুল’। জার্মানির গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ডেজি (ডিইএসওয়াই) ও জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ের কণা ত্বরক কেন্দ্র ইএলএসএ এই আয়োজনের সহযোগী। প্রতিযোগিতায় কণাপদার্থবিজ্ঞান–সম্পর্কিত একটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার প্রস্তাবনা জমা দিতে হয়। অংশ নেন উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা।
বিজয়ী দলগুলো সার্ন, ডিইএসওয়াই ও ইএলএসএ—এই তিন গবেষণাগার ভ্রমণের সুযোগ পান। সেখানে তাঁরা আধুনিক যন্ত্রপাতিসমৃদ্ধ একটি বিমলাইনে (কণা-রশ্মি পরিচালনা ব্যবস্থা) নিজেদের দেওয়া প্রস্তাবনাটি পরীক্ষা করে দেখেন।
এ বছর প্রতিযোগিতাটির ১৩তম আসর অনুষ্ঠিত হলো। অংশ নিয়েছিল বিশ্বের ৮৯টি দেশের প্রায় সাড়ে ৪ হাজার শিক্ষার্থী। মোট ৭১২টি প্রস্তাবনা জমা পড়েছিল এবার। ফলাফল ঘোষিত হয় ২ জুন।
উদ্যোগটা নিয়েছিলেন সালমান আলম। বিজ্ঞানপ্রিয় এই শিক্ষার্থী ইউটিউবের মাধ্যমে বিমলাইন ফর স্কুলের খোঁজ পান। এর পর থেকেই সংশ্লিষ্ট একটি ফেসবুক গ্রুপে দল খুঁজতে শুরু করেন। কিন্তু কেউ তাঁকে দলে নেয়নি। পরে নিজেই দল গঠনের সিদ্ধান্ত নেন সালমান। প্রাথমিকভাবে কলেজের দুই বন্ধুকে নিয়ে শুরু করেন ‘পোলারিস’। সালমান বলেন, ‘পোলারিস বা ধ্রুবতারা নাবিকদের পথ দেখায়। আমরা প্রতিযোগিতায় কাজ করেছি পলিসিলোক্সেন নিয়ে। দুটির নামের মধ্যে কিছুটা মিল আছে। আবার আমাদের মোটিভেশনের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় এই নাম দিয়েছি।’
দল গঠনের পর তিন বন্ধু যান তাঁদের প্রাইভেট টিউটর নিশাদের কাছে। নিশাদ তাঁদের পদার্থবিজ্ঞান পড়াতেন। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এই শিক্ষার্থী তাঁর ছাত্রদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। পরে সেই ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে দলে যুক্ত হন তাসনিম ও তিতিম।
তিতিম বলেন, ‘ফেসবুক গ্রুপে সালমানের সঙ্গে কথা হয়। পরে আমরা কাজ শুরু করি। আমি বেশ ইন্ট্রোভার্ট (অন্তর্মুখী)। তাই দলের সঙ্গে কাজ করার এই যাত্রা আমার জন্য একটু বিশেষ ছিল।’
রেডিওথেরাপিতে ব্যবহৃত সিন্টিলেটরের (বিকিরণে আলোক উৎপাদক পদার্থ) উপাদান নিয়ে নতুন করে ভেবেছে পোলারিস। বুঝিয়ে বললেন নিশাদ আহমেদ, ‘রেডিওথেরাপিতে রেডিয়েশন প্রদানের সময় একটি বিশেষ যন্ত্রে সিন্টিলেটর ব্যবহার করা হয়। যেখানে ইলেকট্রনের আঘাতে উৎপন্ন হয় বিকিরণ। বর্তমানে এই কাজে প্রধানত পলিভিনাইল টলুইনভিত্তিক একধরনের প্লাস্টিক সিন্টিলেটর ব্যবহার করা হয়। দীর্ঘ সময় উচ্চমাত্রার বিকিরণ ও উচ্চ তাপমাত্রার সংস্পর্শে পলিভিনাইল টলুইনের কার্যকারিতা কমে যায়। উপাদানটির দ্রুত ক্ষয় হয়। ফলে এটি বারবার পরিবর্তন করতে হয়। খরচ বাড়ে।’
এ সমস্যা সমাধানে পোলারিস পলিসিলোক্সেনভিত্তিক একটি নতুন সিন্টিলেটর উপাদান ব্যবহারের প্রস্তাব করেছে। উপাদানটির এখনো অস্তিত্ব নেই। তবে তারা তাত্ত্বিকভাবে দেখিয়েছে, এটি তৈরি করা সম্ভব। দলের সদস্যরা জানান, তাঁদের পরীক্ষা সফল হলে রেডিওথেরাপি–শিল্পের খরচ অনেক কমে আসবে।
গবেষণার গাণিতিক কাজের জন্য প্রয়োজন ছিল একটি ভালো মানের কম্পিউটার। সালমানের কম্পিউটার নেই। সাধারণ একটি স্মার্টফোন ব্যবহার করেই কাজ করেছেন তিনি। সালমানের মা-বাবা এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার ব্যাপারে জানতেন না। তাঁরা ভাবতেন, পড়ালেখা বাদ দিয়ে সারা দিন ফোনের পেছনে সময় নষ্ট করছে ছেলে। তাওসিফেরও একই চিত্র। কম্পিউটারের অনেক কাজ তাঁদের খাতা-কলমে করতে হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসেন নিশাদ। তাঁরও ল্যাপটপের কার্যক্ষমতা যথেষ্ট ছিল না। নিশাদ বলেন, ‘আমাদের কম্পিউটেশনাল ফিজিকসের বেশ ভালো একটা কাজ ছিল। যেটা করতে আসলে অনেক ভালো মানের একটা জিপিইউ লাগে, সিপিইউ দিয়ে হয় না। এ কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ইনস্টল করার পর আমার ল্যাপটপ ক্র্যাশ করে। তখন আমার আবার পরীক্ষা চলছিল। ১৫ দিন ল্যাপটপ ওভাবেই ছিল।’
পরে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাহায্য পেয়েছে ‘পোলারিস’। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নাহিদা আক্তার দলটিকে গবেষণাগার ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছেন।
বাংলাদেশের দলটি ছাড়া অপর চার বিজয়ী দল ভারত, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী আগস্ট মাসে পোলারিস যাবে জার্মানির ইএলএসএ গবেষণাগারে। নিয়ম অনুযায়ী তাঁরা সেখানে ১৪ দিন থেকে গবেষণার সুযোগ পাবেন। খরচাপাতি বহন করবেন আয়োজকেরাই।
কিন্তু মুশকিল হলো, পোলারিসের পাঁচ সদস্যের চারজনই উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। আগামী মাসে তাঁদের পরীক্ষা। সালমান বলছিলেন, যাওয়ার আগে তাঁদের লিখিত পরীক্ষা শেষ হয়ে যাবে। তবে ব্যবহারিক পরীক্ষার নির্দিষ্ট তারিখ না থাকায় দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। লিখিত পরীক্ষার পর ব্যবহারিক পরীক্ষা দ্রুত নেওয়ার জন্য সালমান ও তাওসিফ কলেজে যোগাযোগ করেছেন। তবে ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।
নিশাদ জানালেন, সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত সার্নের গবেষণাগারটিও পরিদর্শন করতে চায় পোলারিস। জার্মানি থেকে সেখানে যেতে হবে নিজ খরচে। কিন্তু দলের অধিকাংশ সদস্যের সেই আর্থিক সক্ষমতা নেই। অস্ট্রেলিয়ার পিএইচডি গবেষক সালাউদ্দিন পাঠান দলটিকে স্পনসর খুঁজে দিতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এখনো কোনো ব্যবস্থা হয়নি।