
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে ভালো সিজিপিএ না-ও আসতে পারে নানা কারণে। তাই বলে কি ভিনদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন থেমে যাবে? কারও কারও অভিজ্ঞতা কিন্তু বলছে, এই বাধাও অতিক্রম করার উপায় আছে।
‘গণ বিশ্ববিদ্যালয়’ থেকে যাত্রা শুরু আবুযায়েদ মাসুমের। ছিল না কোনো নামী অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক, সমৃদ্ধ ল্যাবরেটরি। আরও কত বাধা! সব ডিঙিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক নামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে ফুল ফান্ডেড পিএইচডির অফার পেয়েছেন তিনি।
শুরুর যাত্রাটা ছিল আরও চ্যালেঞ্জিং। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার আগেই বাবা স্ট্রোকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যান। একমাত্র সন্তান হিসেবে পুরো পরিবারের ভার এসে পড়ে মাসুমের কাঁধে। অভাবের তাড়নায় একবার ভেবেছিলেন পড়াশোনা ছেড়ে গার্মেন্টসে যোগ দেবেন। সেখানে মাসে অন্তত ১২ হাজার টাকার নিশ্চয়তা আছে। কিন্তু মনের গহিনে থাকা উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন তাঁকে থামতে দেয়নি। টিউশনি করিয়ে নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি সামলেছেন পরিবার। মাসুম বলেন, ‘সকাল থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ব্যাচ আর টিউশন করতাম। মানুষ আমাকে প্রচণ্ড অপমান করেছে, নানা কথা শুনিয়েছে। কিন্তু আমি জানতাম, এই সবকিছু আমি শুধু একটা স্বপ্ন ছুঁয়ে দেখার জন্য সহ্য করছি। আমার একটাই শক্তি ছিল—যতবার ব্যর্থ হব, ততবার উঠে দাঁড়াব।’
রসায়নে মাসুমের প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করেছে গণ বিশ্ববিদ্যালয়। স্নাতকে পান সিজিপিএ–৩.২৪। এরপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে শিখিয়েছে গবেষণার প্রতি ভালোবাসা। সবশেষে বুয়েটে পেয়েছেন আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার অভিজ্ঞতা। মাসুম বলেন, ‘বুয়েটে আমি এমন একটা পরিবেশ পেয়েছি, যেখানে কেউ কাউকে অবহেলা করে না। ল্যাবগুলো বেশ আপন মনে হতো। ওখানে পাশের রুমের কেউ ফ্লোরিডা যাচ্ছে, কেউ টেক্সাসে। বুয়েটে পা রেখেই মনে হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যাওয়াটা খুব সাধারণ একটা ব্যাপার, কঠিন কিছু নয়।’
২০২৫ সালের শেষ দিকে ৫ শতাধিক অধ্যাপককে মেইল করেছিলেন মাসুম। সেটাও স্রেফ ই–মেইল অ্যাড্রেস পেয়েই চিঠি পাঠিয়ে দেওয়া নয়। প্রত্যেক অধ্যাপকের কাজ ঘেঁটে, তাঁর সম্পর্কে জেনে তারপরই লিখতেন তিনি। এ এক বিশাল ধৈর্যের পরীক্ষা। মাসুমের ভাষায়, ‘মেইলের ড্রাফট আমি এপ্রিল থেকেই লেখা শুরু করেছিলাম। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত শিডিউল করে মেইল পাঠাতাম। ৫০০ মেইলের মধ্যে পজিটিভ রিপ্লাই এসেছিল মাত্র ৪টি। কিন্তু আমি জানতাম, কেবল একটি পজিটিভ রিপ্লাই-ই পুরো যাত্রা সফল করার জন্য যথেষ্ট।’
সবকিছু ঠিক থাকলে, শিগগিরই ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটসে পড়তে যাচ্ছেন আবুযায়েদ মাসুম। ছোটদের জন্য তাঁর পরামর্শ, ‘তুমি কোন প্রতিষ্ঠান থেকে উঠে এসেছ, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং তুমি কতটা নাছোড়বান্দা, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের অধ্যাপকেরা তোমার বিশ্ববিদ্যালয়ের নামও হয়তো জানেন না। তাই নিজেই নিজেকে টেনে তুলতে হবে। এই যুদ্ধটা শেষ পর্যন্ত তোমার নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধ।’