নানা দেশের বন্ধুদের নিয়ে ঈদ আয়োজন
নানা দেশের বন্ধুদের নিয়ে ঈদ আয়োজন

‘ক্যাম্পাসের ক্যানটিন থেকে ভূমধ্যসাগর দেখা যায়’

ঈদে সবারই যে ‘স্বপ্ন বাড়ি ফেরে’, তা তো নয়। অনেকেই দেশ থেকে হাজারো মাইল দূরের কোনো ভিনদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঈদ উদ্‌যাপন করেন। বাড়ির জন্য মন কাঁদে ঠিক। তবে ভিন্ন পরিবেশে, নানা দেশের সহপাঠী–বন্ধুদের সঙ্গে ঈদ উদ্‌যাপনেরও কিন্তু একটা আলাদা আনন্দ আছে। সে আনন্দের কথাই লিখে জানিয়েছেন খুর্শিদ রাজীব

ইরাসমাস মুন্ডাসের মাস্টার্স প্রোগ্রামগুলো বড় অদ্ভুত! চার সেমিস্টার চারটি দেশে করতে হয়। অর্থাৎ পাঁচ মাস পরপরই নতুন দেশ, নতুন শহর। যেমন ভূমধ্যসাগরীয় দেশ মাল্টায় প্রথম সেমিস্টার করে আমাকে আসতে হলো গ্রিসে। ইজিয়ান সাগরের বুকে জেগে ওঠা ক্রিট দ্বীপের ছোট্ট শহর রেথিমনোতে আমার দ্বিতীয় ক্যাম্পাস। ইউনিভার্সিটি অব ক্রিটে চলছে আমার দ্বিতীয় সেমিস্টার।

পাহাড় আর সাগরের মধ্যখানে ভীষণ সুন্দর ও ছিমছাম একটা শহর। ৩৫ হাজার নগরবাসীর ৯৮ শতাংশই অর্থোডক্স খ্রিষ্টান। স্থানীয় ক্রেটানরা ছাড়া তেমন একটা বিদেশি এখানে চোখে পড়ে না। সবে মাসখানেক হলো, মাল্টা ছেড়ে এই শহরে এসেছি। এখনো শহরটাই ঠিকমতো চেনা হয়ে ওঠেনি, এর মধ্যে ঈদ চলে এল।

শহরের একমাত্র মসজিদে এশীয় ও আফ্রিকান মুসল্লির সঙ্গে নামাজ পড়ে ছুটতে হয়েছিল ক্লাসে। রেথিমনো শহরে তখন চিরায়ত ব্যস্ততা, ঈদের আমেজের ছিটেফোঁটাও নেই। দেশে থাকলে কী জমকালোভাবেই না দিনটা কাটত! সেমাই-ফিরনির ঘ্রাণ, নতুন পাঞ্জাবি, মাঠে ঈদের জামাত, চেনা মুখের ভিড়, কোলাকুলি, মায়ের হাতের রান্না…অথচ এই বিদেশ–বিভুঁইয়ে ঈদের দিনও ক্লাস করতে হলো!

ক্লাসে বসে যখন এনভায়রনমেন্টাল নিউরোসায়েন্সের জটিল লেকচার শুনছি, মাথায় ঘুরছে দূর স্বদেশে আমার পরিবার, বন্ধু, স্বজন আর গ্রাম। দুপুরে খেতে বসে মনটা খুব খারাপ হলো। এত দূরের এক অচেনা দেশে এমন নিরানন্দ ঈদ কারই বা ভালো লাগে! ক্যাম্পাসের ক্যানটিন থেকে ভূমধ্যসাগর দেখা যায়। সেই উত্তাল সাগরের ঢেউয়ের সঙ্গে যেন প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদ পালনের স্মৃতিগুলো ভেসে আসছিল!

কাকতালীয়ভাবে ২০ মার্চ ছিল ফারসি নওরোজ (নববর্ষ) উৎসব। ইরানি বন্ধু নাদিয়ার উদ্যোগে ক্লাসে ছোট করে নওরোজ উদ্‌যাপন করলাম। ফুল দিয়ে সাজানো খামে ভরে সে সবাইকে একটা উপহারও দিল—নওরোজ নিয়ে কবি হাফিজের লেখা কবিতার মূল ফারসি ও ইংরেজি অনুবাদ। চলমান যুদ্ধ ও দীর্ঘ অর্থনৈতিক অবরোধ সত্ত্বেও ইরানের মানুষ কীভাবে নববর্ষ ও ঈদ উদ্‌যাপন করছে, সে গল্পও শুনলাম। প্রবাসে প্রথম ঈদের দিনে নওরোজ উৎসবের ব্যাপারটা সবচেয়ে উজ্জ্বল স্মৃতি হয়ে রইল।

পরদিন আমরা ঈদ-পরবর্তী উৎসবের আয়োজন করলাম। মুসলিম বন্ধুরা মেজবান আর অমুসলিমরা মেহমান। দুপুরে বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, তুরস্ক, পাকিস্তান আর লেবাননের নানা পদের খাবারে ভরে উঠল টেবিল। চলল নানা দেশের লোকজ গান, নাচ, খেলাধুলা আর মেহেদি উৎসব। অমুসলিম বন্ধুদের জন্য এটা ছিল একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা। তারা খুব আগ্রহ নিয়ে শুনল রোজা ও ঈদের তাৎপর্য। মেহেদি আঁকার সময় তাদের চোখেমুখে বিস্ময় ও মুগ্ধতার অন্ত ছিল না। এভাবেই পৃথিবীর চার মহাদেশের ২১ দেশের বন্ধুদের নিয়ে ঈদ আয়োজন হয়ে ওঠে সংস্কৃতি বিনিময়ের উৎসবে।