তখন স্কুলে পড়ি। জ্বর হয়েছিল খুব। সে সময় জ্বর হলে কম্বল চাপা দিয়ে শুয়ে থাকতে হতো, নো গোসল, নো ভাত (কী আশ্চর্য, উল্টে গেছে চিকিৎসা। জ্বর বেশি হলে এখন সোজা স্নানঘরে নিয়ে ঝরনার নিচে দাঁড় করিয়ে দেয়, উঠে গেছে ভাতের নিষেধাজ্ঞা)।
জীবনে জ্বরও কম হয়নি, আর ভাত তো ৩৬৫ দিনই খাই। তবু ভুলিনি সেদিনের কথা।
তিন–চার দিনের জ্বরে কাবু। এর মধ্যে শুধু পাউরুটি, স্যুপ, হরলিকস...কাঁহাতক সহ্য হয়? দুপুরবেলা খেয়েদেয়ে সবাই ঘুমিয়েছে। কেউ কেউ বাসার বাইরে, কাজে কিংবা ক্লাসে। আমারও জ্বর একটু কম। ভাতের জন্য মন আনচান।
চুপি চুপি বিছানা থেকে উঠলাম। নিজের বাড়িতে চোরের মতো পা টিপে টিপে সিঁড়ি দিয়ে নামলাম। ঢাকার আসাদ গেটের নিউ কলোনির ছোট্ট ডুপ্লেক্স বাসার রান্নাঘরটা ছিল নিচতলায়। গিয়ে দেখি, ভাতের হাঁড়িতে তখনো উষ্ণ ভাত।
পাশেই বাটিতে ঢাকনা দেওয়া টসটসে টমেটোর ভর্তা। আমি জানি এই ভর্তার রেসিপি। পাকা টমেটোগুলো টুকরা টুকরা করে লবণ দিয়ে সেদ্ধ করে নিতে হয়। তারপর কাঁচা মরিচকুচি, পেঁয়াজকুচি, সামান্য লবণ (আগে যেহেতু লবণ দেওয়া হয়েছে, তাই স্বাদ বুঝে) দিয়ে মেখে নিতে হয়। অল্প একটু শর্ষের তেল ছড়িয়ে শেষে আরেকবার মেখে নেওয়া। ওরে স্বাদ! আর জ্বরমুখে আমার মনে হচ্ছিল, এই খাবার পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ খাবার।
চুপি চুপি এদিক–ওদিক তাকিয়ে কয়েক লোকমা খেয়ে ফেললাম। চিবিয়ে খাওয়ার সময় নাই রে ভাই, কে কোথা থেকে দেখে ফেলে; বলা যায়, টপাটপ গিলেই ফেললাম। আহ্ শান্তি। ঝটপট বাসন–চামচ ধুয়ে, যেখানকার ঢাকনা সেখানে দিয়ে অকুস্থলে অপরাধের কোনো চিহ্ন না রেখে ফিরে এলাম বিছানায়।
কেউ কিছু বুঝল না, কিন্তু সন্ধ্যার পর আবার থার্মোমিটারের পারদ উঠে গেল। জ্বরে কাবু আমি কম্বলের ভেতর থেকে শুনি, মা–খালারা বলাবলি করছেন, ‘জ্বরটা তো নেমে গিয়েছিল, আবার যে কেন উঠল!’ আমি মনে মনে নিজেকে বলি, লুকিয়ে টমেটোভর্তা দিয়ে ভাত খাওয়ার ফল, আত্মগ্লানিতে মরে যাই।
যদিও অনেক পরে জেনেছি, ভাত খাওয়ার সঙ্গে জ্বরের সম্পর্ক হয়তো ছিল না, বেচারা টমেটোভর্তাও ছিল নির্দোষ। জীবনে বহুবার টমেটোভর্তা খেয়েছি। কিন্তু আজও মনে আছে সেই নির্জন দুপুরের কথা। সাধারণ রন্ধনপ্রণালির অসাধারণ স্বাদের কথা।
স্কুলজীবনে গরমের ছুটিতে বা ঈদের ছুটিতে দাদুর বাড়ি বেড়াতে গেলে সকালে একটা নাশতা খেতাম। ছোট ছোট গোল আলু দিয়ে বাচ্চা মুরগির ঝোল, সঙ্গে গরম–গরম ছিটা রুটি। নরসিংদী অঞ্চলের জনপ্রিয় নাশতা।
ষাটোর্ধ্ব জীবনে কত ধরনের নাশতা খেয়েছি। বাড়িতে তৈরি প্রতিদিনের আলুভাজা, হাতের রুটি থেকে শুরু করে ছুটির দিনের বউ খুদ, শুঁটকিভর্তা কিংবা ল্যাটকা খিচুড়ি আর ডিমভাজা হয়ে পাঁচ তারকা হোটেলের বুফে ব্রেকফাস্ট। কিন্তু ছিটা রুটি আর মুরগির পাতলা ঝোল স্মৃতির পাতায় তার গৌরব একই আসনে ধরে রেখেছে। দারুণ!
এখনো মনে আছে, খেত থেকে তুলে আনা ছোট ছোট লাল আলুগুলো সেদ্ধ করে ছাল ছাড়িয়ে রাখা হতো। পালা মুরগি থেকেই একটা ছোট মুরগি কেটে ধুয়ে পরিষ্কার করে অল্প তেল–মসলা দিয়ে ঝোল করা হতো। যোগ হতো সেই লাল আলু।
ঘুলঘুলিতে বাসা বাঁধা কবুতরের বাক–বাকুম শুনতে শুনতে ঘুম থেকে উঠেই দেখতাম, দাদুর নির্দেশে মুরগির ঝোল তৈরি। কিন্তু না, ছিটা রুটির দেখা নাই। চালের গুঁড়া, মাটির চুলা, নারকেলের আইচার ডাবুর (একধরনের চামচ), কলাগাছের অংশ দিয়ে তৈরি ব্রাশ, কড়াই—সব সরঞ্জাম তৈরি।
সবাই খেতে বসার পর ছিটা রুটি তৈরি হতো গরম–গরম। লবণ–পানি–চালের গুঁড়ার মিশ্রণকে ডাবুর দিয়ে মিশিয়ে নেওয়া হতো। কড়াইতে কলাগাছের ব্রাশ দিয়ে নামমাত্র তেল মাখিয়ে হাত দিয়ে ছিটিয়ে চালের মিশ্রণ দেওয়া হতো।
তারপর রুটির পিঠ উল্টিয়ে গরম–গরম পরিবেশন। রীতিমতো লাইভ কিচেন। রুটির চেহারা অনেকটা জালির মতো। টলটলা ঝোলে ডুবিয়ে যাঁরা এই রুটি খেয়েছেন, তাঁরাই জানেন এর কী অপূর্ব স্বাদ!
জীবনে কত খাবার খেয়েছি, খাচ্ছি। কিন্তু লিখতে গিয়ে জ্বরমুখে টমেটোভর্তা আর লাইভ কিচেনের ছিটা রুটি কেন জয়যুক্ত হলো, তার উত্তর মনোবিজ্ঞানীরাই দিতে পারবেন বোধ হয়!
(লেখাটি প্রথম আলোর বিশেষ ম্যাগাজিন বর্ণিল খাবারদাবার ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত)