পূর্বাচলে মিষ্টিমুখের নতুন ঠিকানা, পাবেন নানা স্বাদের মিষ্টি

পূর্বাচলের নীলা মার্কেটের মিষ্টির সেই পুরোনো স্বাদ ও ঐতিহ্য যেন নতুন করে ফিরেছে মহারাজা সুইটসে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাহারি মিষ্টির সমাহারে দোকানটি হয়ে উঠছে মিষ্টিপ্রেমীদের নতুন ঠিকানা।

সম্প্রতি পূর্বাচলে নীলা মার্কেটের কাছেই গড়ে উঠেছে নতুন এক মিষ্টির দোকান—মহারাজা সুইটস
ছবি: সুমন ইউসুফ

ছোট ছোট ছাউনির নিচে গড়ে ওঠা মিষ্টির দোকানগুলো ছিল একসময় পূর্বাচলের নীলা মার্কেটের মূল আকর্ষণ। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেই কড়াইয়ে মিষ্টি ভাজার দৃশ্য, গরম রসের ঘ্রাণ আর ক্রেতাদের ভিড়ে জায়গাটি বেশ রাত পর্যন্ত জমজমাট থাকত।

এখানকার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল কড়াই থেকে সদ্য তুলে দেওয়া গরম-গরম মিষ্টি। অনেকেই শুধু এই মিষ্টি খাওয়ার উদ্দেশ্যেই সেখানে যেতেন। এখানে পাওয়া যেত রসগোল্লা, স্পঞ্জ মিষ্টি, ছানার মিষ্টি, চমচম, মালাই চপ, সন্দেশ, লেংচা, রাজভোগ, জিলাপি, দইসহ নানা ধরনের মিষ্টি। বিশেষ করে বড় আকৃতির বালিশ মিষ্টি নীলা মার্কেটের বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছিল।

একটা সময় হাঁসের মাংস নীলা মার্কেটের জনপ্রিয় খাবার হয়ে উঠলে মিষ্টির সেই ক্রেজে কিছুটা ভাটা পড়ে। তবে সম্প্রতি পূর্বাচলে নীলা মার্কেটের কাছেই গড়ে উঠেছে নতুন এক মিষ্টির দোকান—মহারাজা সুইটস। যেই দোকানে শুধু নীলা মার্কেটের মিষ্টিই নয়, পাবেন বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মিষ্টি।

দোকানটির দেয়ালে আঁকা হয়েছে দেয়ালচিত্র

সেই মিষ্টির স্বাদ নিতে গত সোমবার আমিও গিয়েছিলাম। নীলা মার্কেট বাসস্ট্যান্ড থেকে মাত্র ১০ টাকার অটো ভাড়ায় চলে আসি পূর্বাচলের বড়ুলিয়া চত্বর। এখান থেকে একটু দূরেই চোখে পড়ে মহারাজা মিষ্টির দোকান। সামনে এগোতেই গেটের দুপাশে গাড়ির সারি দেখে বোঝা যাচ্ছিল, ভেতরের মানুষজন সব মহারাজার সুইটসে মিষ্টিমুখ করছেন।

আমিও কাচের দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ি। ভেতরটা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত। দোকানটির দেয়ালে আঁকা হয়েছে পালকির আদলে গড়া দেয়ালচিত্র, আছে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। সুন্দর করে টেবিল-চেয়ার দেওয়া আছে, রয়েছে একসঙ্গে প্রায় ১৫০ জনের খাওয়ার ব্যবস্থা। মিষ্টি ঘিরে যাত্রা শুরু করা মহারাজা এখন বেকারি আইটেম, কাবাব, কফিসহ অনেক রকম খাবার নিয়ে এসেছে।

কাচের শোকেসবন্দী হরেক রকমের মিষ্টি

যেহেতু মিষ্টির খোঁজে এসেছি, শুরুতেই তাই ক্যাশ কাউন্টারের পাশে কাচের শোকেসবন্দী হরেক রকমের মিষ্টি দেখতে গেলাম। মিষ্টির নাম এবং দাম দেখে লোভ সামলানো দায়! রসে ডোবানো রসমালাই থেকে শুরু করে মালাই রোল, মালাই কেক, মতিচুর, মতিনাট লাড্ডু, রাবড়ি জামুন, হাঁড়িভাঙা, স্পঞ্জ, ছানার আমৃতি, চমচম, কাজু কাটলি, কাঁচাগোল্লাসহ কতশত মিষ্টি!

গরমে ঘেমে-নেয়ে এসেছি বলে মিষ্টি না চেয়ে বরং এক গ্লাস মাঠা অর্ডার করি। মাঠায় চুমুক দিতে দিতে মহারাজার প্রতিষ্ঠাতা মায়িশা রহমান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তাঁর স্বামী নওসাদ হাসনাইনের সঙ্গে কথা হয়। মায়িশা রহমান জানান, অস্ট্রেলিয়া থেকে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে করোনার সময় একপ্রকার আটকে পড়েন। তখন ভাবলেন, ভিনদেশে পাড়ি না জমিয়ে দেশে কিছু একটা করবেন। নিজেদের অন্যান্য ব্যবসা থাকার পরও নতুন কিছু করার চিন্তাভাবনা থেকে ঠিক করলেন মিষ্টি নিয়ে কাজ করবেন। সেই থেকেই সাত হাজার বর্গফুটের নিজেদের এই জায়গায় গড়ে তোলেন মিষ্টির কারখানা।

মহারাজার ভেতরে আছে খোলামেলা ও পরিচ্ছন্ন আবহ

সামনে খাওয়ার জায়গা আর পেছনে মূল কারখানা। মাত্র একজন কারিগর ও তাঁর সহকারী নিয়ে যাত্রা শুরু করা মহারাজা সুইটসে এখন কাজ করছেন ১০ জন কারিগরসহ ৪০ জন কর্মী। অটোরিকশাচালকদের কাছে বিরান প্রান্তরে গড়ে ওঠা জায়গাটা শুরুতে ছিল ‘এসিওয়ালা মিষ্টির দোকান’।

ধীরে ধীরে মহারাজা মিষ্টির স্বাদে তৃপ্ত গ্রাহকেরা বারবার এখানে ছুটে আসতে শুরু করেন। বেলা ১১টা থেকে শুরু করে মিষ্টি খাওয়ার এই আয়োজন চলে রাত ১২টা পর্যন্ত। কখনো কখনো রাত ১টা–২টা পর্যন্তও গড়ায়। বিশেষ করে শুক্রবারসহ ছুটির দিনগুলোতে ভিড় থাকে দেখার মতো। বসে খাওয়ার পাশাপাশি যে কেউ চাইলে বাসাবাড়ির জন্য বা নিমন্ত্রণে যাওয়ার উদ্দেশ্যে প্যাকেটজাত করে মিষ্টি নিয়ে যেতে পারেন।

দরদাম কেজি হিসেবে মিষ্টি বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত। আর প্রতি পিস মিষ্টি খাওয়ার সুযোগ রয়েছে ৮০ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে। এ ছাড়া ফরমায়েশি বিয়েবাড়ির আয়োজনের জন্য মিষ্টির ডালা সাজিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। কিছুদিন আগে প্রায় ২০ কেজি ওজনের এক ডালা সাজিয়ে নেন উত্তরার এক বাসিন্দা। বড় সেই ডালা চারজন মিলে পিকআপে করে নিয়ে যেতে হয়েছিল! মিষ্টির ডালার ক্ষেত্রে নিয়ম হচ্ছে—কমপক্ষে এক সপ্তাহ আগে জানাতে হবে এবং চাহিদা অনুযায়ী অর্ডার নিশ্চিত করতে হবে।

দূর–দূরান্ত থেকে ক্রেতারা মিষ্টি কিনতে আসেন

যেভাবে যাবেন

শুরুতেই ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে আসতে হবে কুড়িল বিশ্বরোডে। সেখান থেকে মাত্র ৩০ টাকা ভাড়ায় চলে আসুন নীলা মার্কেট বাসস্ট্যান্ড। নীলা মার্কেট যে পাশে, তার ঠিক উল্টো পাশ থেকে অটোতে চেপে মাত্র ১০ টাকা ভাড়ায় চলে আসতে পারবেন মহারাজা সুইটসে। আর যাঁদের নিজস্ব গাড়ি আছে, তাঁরা তো জ্যামহীন রাস্তায় সরাসরি চলে আসতে পারবেন।