
মিরপুর ২ এলাকার লাভ রোড ভোজনপ্রেমীদের জন্য আকর্ষণীয় এক জায়গা। সেখানে বিভিন্ন দোকানে মেলে নানা পদের খোঁজ। সব দোকানের বাইরে বেশ আলাদা স্বকীয়তা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিখ্যাত রাজা চা। এখানে দেখা যায় নানা পদের চা। কাজুবাদাম, হরলিকস, ম্যাট কফি, ব্ল্যাক কফি, কিশমিশ, গুঁড়া দুধ আর কনডেন্সড মিল্কের এক অপূর্ব মিশ্রণে পাওয়া যায় স্পেশাল রাজা চা।
প্রতি কাপের সর্বনিম্ন দাম ৫০ টাকা হলেও এক কাপ চায়ের জন্য লম্বা সিরিয়ালে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতেও দ্বিধা করেন না চা-প্রেমীরা। টোকেন নিয়ে সিরিয়াল দিয়ে চা পান এখন রাজা মামার দোকানের নিয়মিত দৃশ্য। আজহার উদ্দিন ওরফে রাজা মিয়া এই চায়ের উদ্যোক্তা। দোকানে তাঁর খোঁজ করতেই জানা গেল, তিনি এখন কক্সবাজারে। বছরের শেষ সময়, নতুন বছরের জন্য কক্সবাজারে অনেক পর্যটকের ভিড়। সেই পর্যটকদের নানা পদের চা পরিবেশন করতে তিনি এখন কক্সবাজারে। শেষ পর্যন্ত মুঠোফোনেই চলে আমাদের মিনিট বিশেকের আড্ডা।
দোকানের মেনু থেকে দেখা যায়, স্পেশাল রাজা চা, রাজা লাভ চা, রাজা কাশ্মীরি গোলাপি চা, ইরানি জাফরান লাল চা, রাজা স্পেশাল মালাই চা, তুর্কি লাল চাসহ ১৩-১৪ পদের বাহারি রকমের চা। ৫০ টাকা থেকে শুরু হয়ে ১০০ টাকা পর্যন্ত এক কাপ চায়ের দাম। এ ছাড়া পাওয়া যায় রাজা কুলফি রসমালাই, রাজা স্পেশাল ইরানি জাফরান লাচ্ছি, রাজা স্পেশাল কাশ্মীরি লাচ্ছি, মালয়েশিয়ান চকলেট লাচ্ছি।
ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার নওধার গ্রামে জন্ম নেওয়া আজহার উদ্দিন রাজার শৈশব ছিল চরম অভাব-অনটনে ভরা। তিনি জানান, এক বেলা খেয়ে না খেয়ে দিন কেটেছে। জীবন বাঁচাতে মানুষের বাড়িতে কাজ করেছেন, ফেরি করে বিক্রি করেছেন পান–সিগারেট আর চকলেট। রাজধানী ঢাকায় মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না। ভাগ্য অন্বেষণে একদিন পাড়ি জমান সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে।
সেখানে বিভিন্ন দেশের নামী শেফদের সাহচর্যে রপ্ত করেন চা বানানোর নানা কৌশল। সেই অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করেই ২০২০ সালে মিরপুর ২ এলাকায় মাত্র তিন হাজার টাকা নিয়ে শুরু করেন স্বপ্নের যাত্রা। এখন নিয়মিত দোকান, ভ্যানগাড়িসহ বিভিন্ন বিবাহ বা সাংস্কৃতিক আয়োজনে তাঁর ডাক পড়ে। মোগল পোশাকে ঢাকার বিভিন্ন আয়োজনে তাঁকে দেখা যায়। তাঁর সুনামের জন্য মাঝেমধ্যে দোকানে ভিনদেশি পর্যটকেরাও চলে আসেন। মিরপুরসহ তাঁর বিভিন্ন দোকানে চা পরিবেশন শুরু হয় দুপুর ১২টা থেকে আর চলে মধ্যরাত অবধি।
রাজা মিয়ার দোকানের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মোগলাই আভিজাত্য। তাঁকে দেখতেও যেন হুবহু কোনো রাজপুরুষের মতো লাগে। চমৎকার পাকানো গোঁফ আর চা পরিবেশনের অভিনব ঢঙের কারণে সবাই তাঁকে ভালোবেসে ডাকেন রাজা মামা। তাঁর দোকানে চা পানের অভিজ্ঞতা অন্য সব জায়গার চেয়ে আলাদা। এখানে চা পরিবেশন করা হয় মাটির কাপে আর পরিবেশনায় থাকে পিতলের ট্রে—ঠিক যেন মোগল আমলের কোনো রাজকীয় আয়োজন।
ভ্যানগাড়িতে যে ব্যবসার শুরু হয়েছিল, মাত্র চার বছরে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের ২৮টি শাখায় তা ছড়িয়ে পড়েছে। এসব দোকানে কাজ করছেন অন্তত ১০০ কর্মচারী। মিরপুর ২, গাজীপুরের মাওনা, চট্টগ্রামের মিরসরাই কিংবা অক্সিজেন মোড়ে দেখা যায় আজহার উদ্দিন রাজার দোকানের রাজকীয় সাজসজ্জা। অ্যারাবিয়ান ডিজাইনের কেটলি আর ভেষজ মসলার ঘ্রাণে ম ম করে চারপাশ।
আজহার উদ্দিন এখন কেবল একজন সফল ব্যবসায়ী নন, পরিচিত একজন ব্যক্তিত্বও বটে। দুপুরের পর থেকেই তাঁর দোকানে ভিড় করেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। তাঁকে দেখামাত্র সেলফি তুলতে ছুটে আসে মানুষ।
রাজা মিয়া মৃদু হেসে ফোনে বলেন, ‘চা বিক্রি করে শুধু টাকা নয়, যে ভালোবাসা পেয়েছি, তা অমূল্য। একসময় যেখানে থাকার জায়গা ছিল না, চায়ের অসিলায় আজ সেখানে শত মানুষের কর্মসংস্থান করতে পেরেছি। এটাই আমার জীবনের বড় সার্থকতা।’