বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সাবিনা খান পৌঁছে গেছেন মাস্টারশেফ ইউকের কোয়ার্টার ফাইনালে। বাঙালির বিকেলের নাশতার পেঁয়াজু আর মুড়ি দিয়েই বাজিমাত করেছেন ৪৯ বছর বয়সী এই অপেশাদার রাঁধুনি। বিচারকেরা তো মজা করে মুচমুচে পেঁয়াজুকে ডাকছেন ‘বুলেটস অব জয়’। গোল গোল ক্রিসপি পেঁয়াজুকে তাঁরা দেখছেন আনন্দের বুলেট হিসেবে।

মাস্টারশেফ ইউকের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের এক ভিডিওতে দেখা যায়, জনপ্রিয় ব্রিটিশ খাদ্য সমালোচক জে রেইন সাবিনার রান্না চেখে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘এটা দুর্দান্ত, সবকিছু একদম ঠিকঠাক।’
সে সময় সাবিনার চোখে পানি চিকচিক করছিল। তিনি বলেন, ‘বহু বছর ধরে জে রেইনকে অনুসরণ করি। একদিন তিনি আমার রান্না খাবেন, এটা ছিল স্বপ্ন। তিনি এভাবে প্রশংসা করেছেন, মনে হচ্ছে আমি এখনো ঘোরের মধ্যে আছি। এখন মনে হচ্ছে, বোধ হয় রান্নাটা আমি টুকটাক পারি।’
টুকটাক নয়, বলতে হবে বেশ ভালোই পারেন সাবিনা। আর তেমনটাই বলছেন বিশ্বের প্রথম সারির পেশাদার শেফরা।
বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও উত্তেজনাপূর্ণ রান্নার প্রতিযোগিতাগুলোর একটি মাস্টারশেফ। বিবিসি ওয়ান ও বিবিসি আইপ্লেয়ারে শুরু হয়েছে মাস্টারশেফ ইউকের ২২তম সংস্করণ। এ বছরের প্রতিযোগিতার প্রথম হিটের জন্য হাজারো আবেদন থেকে নির্বাচিত হয়ে অংশ নিয়েছেন ছয় প্রতিভাবান রাঁধুনি। তাঁদেরই একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সাবিনা খান।
ইতিমধ্যে বাকি পাঁচজনকে পেছনে ফেলে কোয়ার্টার ফাইনালেও উঠেছেন সাবিনা। আট সপ্তাহ ধরে এ রকম আটটি হিটে মোট ৪৮ জন (প্রতি হিটে ছয়জন) থেকে মাত্র আটজন লড়বেন কোয়ার্টার ফাইনালে।
সেখান থেকে চারজন যাবেন সেমিফাইনালে। আর বাংলাদেশের ঢাকায় বড় হওয়া সাবিনা ইতিমধ্যে প্রথম হিট থেকে বিজয়ী হয়েছেন।
লন্ডনের পরিবেশবিষয়ক পরামর্শক সাবিনা যে খাবারটি রেঁধেছেন, তার নাম তিনি দিয়েছেন ‘সালাদ অব হারমোনি’।
তুমি একদম ঠিকঠাক নামটাই দিয়েছ। বিটের রঙে রাঙানো ক্রিম বয়েলড ডিম, কুড়মুড়ে পেঁয়াজু, মুড়ি, গাজর, বিট, মটর, মুচমুচে করে ভাজা মুরগির চামড়া, রসুন আর এসবের ওপরে শর্ষের তেলের সসের নরম স্পর্শ, কী নেই এখানে! প্রতিটি খাবারের আসল স্বাদ আলাদা আলাদাভাবে পাওয়া যাচ্ছে, আবার সব মিলে কী যে মজা লাগছে খেতে! ব্যাপারটা সত্যিই দারুণ হারমোনিয়াস।অ্যানা হফ, বিশ্বখ্যাত আইরিশ শেফ (মাস্টারশেফ প্রতিযোগিতায় সাবিনা খানকে)
সাবিনার জন্ম বাংলাদেশে, বড় হয়েছেন রাজধানীর গুলশানে। বাড়িতে বাইরের খাবার খাওয়া একরকম মানা ছিল। তবে বাড়ির খাবারের টেবিলেই থাকত রেস্তোরাঁর সব স্বাদ। সেখানে মাছের ঝোল, পিৎজা থেকে চায়নিজ ব্ল্যাক বিন চিকেন—সবই থাকত।
আর এসব খাবার ঘরে তৈরি করতেন সাবিনার মা মুনাওয়ার। দুপুরে স্কুল থেকে ফিরে টেবিলে বসে যে নানা খাবার চেখে দেখা, সেটিই সাবিনার রান্নার অনুপ্রেরণা।
সাবিনাকে তাঁর মা বার্গার, কাবাব, বিরিয়ানি, কেক, কুকিজ, ডোনাট ও নানা পেস্ট্রি নিজ হাতে বানিয়ে খাওয়াতেন। সাবিনাও তাঁর দুই সন্তানকে সেভাবেই খাওয়াতে চেয়েছেন। সাবিনা তাঁর রান্নাঘরকে বলেন ‘ফ্লেভার ল্যাব’। আর সেখানেই নানা রকম পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে প্রতিদিনের ডাইনিং অভিজ্ঞতাকে বানাতেন স্বাদে স্মৃতিময়।
রান্নার বাইরে সাবিনা দৌড়ানো, শরীরচর্চা আর প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসেন। গান তাঁর আরেক ভালোবাসা। তাঁর মতে, ভালো খাবারের সঙ্গে ভালো গান থাকলে অভিজ্ঞতাটাই বদলে যায়। সাবিনার রান্নাঘরেও সব সময় বাজতে থাকে গান।
১৬ বছর আগেও সাবিনা একবার মাস্টারশেফে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু তখন তিনি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। শুটিংয়ের সময় সন্তান জন্মের সম্ভাবনা থাকায় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেননি।
পরে সংসার ও সন্তানদের বড় করার ব্যস্ততায় সেই স্বপ্ন চাপা পড়ে যায়। তবে এবার তাঁর দুই ছেলেই তাঁকে আবার আবেদন করতে উৎসাহ দিয়েছিল।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই শখের রাঁধুনি রান্নার আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশি হেঁশেলের স্বাদ ও সংস্কৃতিকে সঙ্গে নিয়ে চূড়ান্ত বিজয়ী হতে পারবেন কি না, তা জানা যাবে জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে।
সূত্র: ক্রাম্ব নিউজ