ফুটবলের মাঠে যেমন প্রতিটি দলের নিজস্ব খেলার ধরন আছে, তেমনি খাবারেও আছে স্বতন্ত্র ঐতিহ্য ও স্বাদ
ফুটবলের মাঠে যেমন প্রতিটি দলের নিজস্ব খেলার ধরন আছে, তেমনি খাবারেও আছে স্বতন্ত্র ঐতিহ্য ও স্বাদ

ফুটবলে আপনার প্রিয় দেশের জনপ্রিয় খাবারগুলো সম্পর্কে জেনে নিন

ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে। বিশ্বকাপে পছন্দের দলকে সমর্থন দিতে গিয়ে পুরো দেশ এখন বিভক্ত। বাড়িতে অনেকেই ফুটবলে নিজের পছন্দের দেশের পতাকা ওড়াচ্ছেন। গায়ে জড়িয়েছেন দলের জার্সি। এই সময়টায় পছন্দের দল ও দেশ নিয়ে জানতে আগ্রহ বাড়ে সবার। কোন খেলোয়াড় কত গোল করেছেন, কবে কে কাকে কত গোলে হারিয়েছে—এ রকম নানা কিছু। প্রিয় দলকে ঘিরে চলে তর্কবিতর্ক, পরিসংখ্যান আর স্মৃতিচারণা। কিন্তু ফুটবলে আপনার পছন্দের দেশের খাবার নিয়ে কি ধারণা আছে? ফুটবলের মাঠে যেমন প্রতিটি দলের নিজস্ব খেলার ধরন আছে, তেমনি খাবারেও আছে স্বতন্ত্র ঐতিহ্য ও স্বাদ।

১. ব্রাজিল

ফেইজোয়াদা

ব্রাজিলিয়ান রান্না পর্তুগিজ, আফ্রিকান ও আদিবাসী ঐতিহ্যের মিশেল। ফেইজোয়াদা দেশটির অন্যতম জনপ্রিয় খাবার। কালো শিম ও মাংস দিয়ে এই ঐতিহ্যবাহী পদ রান্না করা হয়। ব্রাজিলের ইতিহাসের সঙ্গেও খাবারের এই পদ জড়িয়ে আছে। আফ্রিকান ক্রীতদাসেরা খাবারটি প্রথম নিয়ে আসেন। এখন এটি রিও কিংবা সাও পাওলোর ঝুপড়ি থেকে দামি রেস্তোরাঁ—সব জায়গায় সমানভাবে জনপ্রিয়।

আকারাখে

বাহিয়া অঞ্চলের রান্নায় নারকেলের দুধ ও পাম তেলের ব্যবহার বেশি। এ অঞ্চলের জনপ্রিয় দুটি পদ মোকুয়েকা ও আকারাখে।

কোশিনিয়া

স্ট্রিট ফুডের মধ্যে আছে কোশিনিয়া নামের মুরগির পদ। আর মিষ্টির তালিকায় ব্রিগাদেইরো ব্রাজিলিয়ানদের প্রিয়।

২. আর্জেন্টিনা

আসাদো

দক্ষিণ আমেরিকায় আর্জেন্টিনার রান্না সবচেয়ে বেশি বৈচিত্র্যময়। এতে স্থানীয় সংস্কৃতির পাশাপাশি আছে ইতালীয় ও স্প্যানিশ রান্নার প্রভাব। দেশটির সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার আসাদো। এটি মূলত মাংসের বারবিকিউ। বিভিন্ন সামাজিক আয়োজনে কাঠ–কয়লার আগুনে ধীরে ধীরে রান্না করা হয়।

এমপানাদাস

গরুর কিমা দিয়ে বানানো মসলাদার এমপানাদাস দেশজুড়ে জনপ্রিয়। ইতালীয় প্রভাবের কারণে পিৎজা আর্জেন্টাইন রান্নায় বিশেষ স্থান করে নিয়েছে।

ডুলসে দে লেচে

রাজধানী শহর বুয়েনস এইরেসে পিৎজা তৈরি শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য। মিষ্টান্নের মধ্যে দুধ ঘনীভূত করে তৈরি আঠালো ডুলসে দে লেচে আর্জেন্টিনাজুড়ে বিখ্যাত।

৩. জার্মানি

জাওয়াব্রাটেন

মাংস আর আলুর পদ জার্মান খাবারে সবচেয়ে বেশি। জনপ্রিয় খাবারের মধ্যে আছে জাওয়াব্রাটেন। মসলা ও ভিনেগারে লম্বা সময় মাংস ম্যারিনেট করে এটি তৈরি করা হয়। স্বাদ টক–মিষ্টি।

সসেজ

জার্মানিতে প্রায় ১ হাজার ২০০ প্রকার সসেজ পাওয়া যায়। এর মধ্যে বাথওর্স্ট সসেজ বেশ বিখ্যাত। এ ছাড়া আছে ধীরে ধীরে রান্না করা টাটকা রুটি ও পেস্ট্রি। পেস্ট্রির মধ্যে প্রেটজেলস ও হেজেব্লেৎসে বেশ জনপ্রিয়।

৪. পর্তুগাল

সামুদ্রিক কড মাছের পদ বাকালাও

পর্তুগালের দক্ষিণ ও পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর। ফলে দেশটির খাবারে সামুদ্রিক পদের আধিক্য আছে। রান্নায় জলপাই তেল ও রসুনের ব্যবহার বেশি দেখা যায়। সামুদ্রিক কড মাছের পদ বাকালাও দেশটির জনপ্রিয় খাবার। বাকালাওয়ের ৩৬৫টির বেশি রেসিপি আছে। কালদো ভেরজে নামের সবজির স্যুপও বেশ জনপ্রিয়।

পাস্তেইস জি নাতো

মিষ্টির তালিকায় আছে দারুচিনি ছিটানো কাস্টার্ডের পদ পাস্তেইস জি নাতো। এ ছাড়া আছে ঝালঝাল স্বাদের মুরগির পদ পেরি-পেরি চিকেন, সামুদ্রিক খাবারের পদ আহোজ জি মারিস্কো ও স্যান্ডউইচ ফ্রান্সেজিনিয়ো।

৫. স্পেন

স্প্যানিশরা খেতে ভালোবাসে। আমরা তিন বেলা খাওয়ায় অভ্যস্ত। তবে স্প্যানিশরা খায় পাঁচ থেকে ছয় বেলা। খাবারকে ঘিরেই জমে আড্ডা। জনপ্রিয় খাবারের মধ্যে আছে পায়েয়া। এটি দুপুরের খাবার হিসেবে খাওয়া হয়।

পায়েয়া

ঐতিহ্যবাহী পায়েয়ায় জাফরান, শিম, সবজি, শামুক, খরগোশ, মুরগি ও হাঁসের মাংসের মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়। আলুর অমলেট তর্তিয়া তে পাতাসাস ও টমেটোর ঠান্ডা স্যুপ গাজপাচো বেশ জনপ্রিয়। হ্যামোন নামের বিশেষ ধরনের শুকনা মাংসও বেশ জনপ্রিয়।

গাজপাচো

৬. ফ্রান্স

সৌন্দর্য, বৈচিত্র্য ও স্বাদের জন্য ফ্রান্সের খাবার বিশ্বজুড়ে পরিচিত। ফরাসি রান্নার বিশেষত্ব হলো, সাধারণ উপকরণ থেকে অসাধারণ স্বাদের খাবার তৈরি। জনপ্রিয় খাবারের মধ্যে আছে গরুর মাংসের পদ বিফ বুগিনিয়ন।

বিফ বুগিনিয়ন

মার্সেইয়ের সামুদ্রিক মাছের বিখ্যাত স্যুপ বুইয়াবেস অনেকের প্রিয়। এই স্যুপের জন্য নির্দিষ্ট ছয়টি মাছ আছে। স্যুপ বানাতে মাছগুলোর অন্তত চারটি দিতেই হয়।

স্যুপ বুইয়াবেস
চকলেট সুফলে

নিরামিষভোজীদের জন্য আছে সবজির সুস্বাদু পদ হাতেতুই। এ ছাড়া ফ্রেঞ্চ অনিয়ন স্যুপ, ক্রেপ ও কিশ লোরেনও সমাদৃত। মিষ্টির জগতে ক্রেম ব্রুলে, চকলেট সুফলে ও টার্ট টাটিন বেশ জনপ্রিয়।

৭. ইংল্যান্ড

ফিশ অ্যান্ড চিপস

রসনার বাইরে ব্রিটিশ খাবার দেশটির ইতিহাস ও সংস্কৃতির অংশ। ভাজা মাছ ও আলুর চিপসের পদ ফিশ অ্যান্ড চিপস ইংল্যান্ডে সবচেয়ে জনপ্রিয়। এটি চলতি পথের খাবার।

ইংলিশ ব্রেকফাস্ট

সকালের নাশতায় ডিম, সসেজ, বেকন ও টোস্টের মিশেলে ফুল ইংলিশ ব্রেকফাস্ট বিশেষভাবে সমাদৃত। ছুটির দিনের আয়োজনে থাকে রোস্ট ডিনার। এটি মূলত ঝোলসহ গরুর মাংসের পদ, সবজি দিয়ে পরিবেশন করা হয়।

মিষ্টি পেস্ট্রি স্কোন

বিকেলের চায়ের সঙ্গে হালকা মিষ্টি পেস্ট্রি স্কোন, জ্যাম ও ক্রিম খাওয়ার চল আছে। মিষ্টির মধ্যে ভিক্টোরিয়া স্পঞ্জ কেক ও স্টিকি টফি পুডিং বেশ পরিচিত।

৮. মেক্সিকো

টাকোস

ঝাঁজালো স্বাদ, বর্ণিল পরিবেশন ও বৈচিত্র্যের জন্য মেক্সিকান খাবার বিশ্বজুড়েই জনপ্রিয়। ভুট্টা, শিম, টমেটো ও মরিচ মেক্সিকান রান্নার প্রধান উপাদান।

ইনচিলাডাস

দেশটির ঐতিহ্যবাহী খাবারের মধ্যে আছে টাকোস, ইনচিলাডাস, কেসাডিয়াস ও তামালেস। নরম টর্টিলার (ভুট্টা অথবা গমের আটা দিয়ে তৈরি নরম রুটি) ভেতরে মাংস, সবজি ও মসলা দিয়ে তৈরি টাকোস মেক্সিকোর সবচেয়ে পরিচিত খাবার।

চুরোস

সকালের নাশতায় চিলাকিলেসও বেশ জনপ্রিয়। মিষ্টান্নের মধ্যে আছে চুরোস। ভাজা ময়দার তৈরি এই মিষ্টান্ন চিনি ও দারুচিনির গুঁড়া ছড়িয়ে পরিবেশন করা হয়।

৯. জাপান

স্বাস্থ্যকর উপাদানের জন্য জাপানের খাবার বিশ্বজুড়ে পরিচিত। দেশটির সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবারের মধ্যে আছে সুশি, রামেন, উডন ও টেম্পুরা। তাজা মাছ, ভাত, নুডলস ও সামুদ্রিক মাছের পদ জাপানি রান্নার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সুশি

সুশি জাপানের পরিচিত খাবার হলেও বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন স্বাদের রামেনও সমান জনপ্রিয়। বেন্টো বক্স নামে ছোট ছোট খোপের লাঞ্চ বক্সের চল আছে। এতে পুষ্টির ভারসাম্য রক্ষা করে খাবার রাখা হয়।

রামেন

এ ছাড়া স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিদিনের নাশতাজাতীয় খাবারের তালিকায় থাকে তাকোইয়াকি ও ওকোনোমিয়াকি। জাপানি খাবারে স্বাদের পাশাপাশি সুন্দর পরিবেশনকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

১০. নেদারল্যান্ডস

বিটারবালেন

সমুদ্রঘেঁষা বলে নেদারল্যান্ডসে মাছের পদের চল বেশি। দেশটির জনপ্রিয় খাবারের মধ্যে আছে ফ্রিটস (ডাচ ফ্রেঞ্চ ফ্রাই), হেরিং মাছ, বিটারবালেন ও প্যানেনকুকেন।

প্যানেনকুকেন

পনিরের জন্য ডাচদের বিশ্বজুড়ে খ্যাতি। বিভিন্ন ধরনের চিজ দিয়ে তৈরি স্যান্ডউইচ তাদের প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় থাকে।

স্ট্রুপওয়াফল

মিষ্টান্নের মধ্যে স্ট্রুপওয়াফল ব্যাপক জনপ্রিয়। মচমচে ওয়াফল-কুকির মধ্যে মিষ্টি সিরাপের পুর দিয়ে এটি তৈরি করা হয়। শীতকালে অলিবোলেন নামের মচমচে এক খাবার খাওয়া হয়। দেখতে গোলাকার বলের মতো। ময়দার তৈরি এই বল ডুবো তেলে ভাজা হয়।

সূত্র: উইরোড, চিমু ব্লগ, সেলিব্রিটি ক্রজেস, হাউজিং এনি হোয়্যার, সিএনএন, ইনসাইটফুল, ট্রাভেলার্স ফেয়ার, আ ওয়াক অ্যান্ড আ লার্ক, গ্লোব ট্রোভ