আপনার সন্তান দেশের নামকরা কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। ছোটবেলা থেকেই তার প্রাতিষ্ঠানিক ফল ভালো। খুব বিনয়ী এবং নম্র স্বভাবের ছিল বরাবরই। কিন্তু কয়েক দিন ধরে সে নিখোঁজ রয়েছে। বাসার কারও সঙ্গে কোনো যোগাযোগই নেই তার। নিখোঁজ হওয়ার আগে তার চালচলনে কিছুটা পরিবর্তনও দেখতে পেয়েছিলেন। কিন্তু অতটা গুরুত্ব দেননি বিষয়টাতে। সম্প্রতি গুলশান ট্র্যাজেডিতে জঙ্গিদের পরিচয় জানার পর সন্তানকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। ভাবছেন—সন্তান আবার বিপথে গেল না তো! এখন কী উপায়? আইন অনুযায়ী কি কিছু করার আছে? প্রিয় সন্তানটি কি জঙ্গিদের তালিকায় নাম লিখিয়েছে? নাকি সে অন্য কোথাও অন্য কারণে নিখোঁজ রয়েছে? সন্তানকে ফিরে পাওয়ার জন্য কী করার আছে আইনত? যদি সত্যিই জঙ্গিদের তালিকায় নাম চলে আসে, তাহলে কী করবেন আপনি?
কী করণীয়
কোনো কারণে সন্তান যদি নিখোঁজ হয়, তাহলে প্রথমেই নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে হবে। কোনোভাবেই সন্তান নিখোঁজের বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়। আবার মান-সম্মানের ভয়ে যদি সন্তান নিখোঁজের বিষয়টি গোপন করে রাখেন, তাহলে এতে নিজের পরিবার ও দেশের জন্য আরও বড় বিপদ ডেকে আনবেন। সম্প্রতি র্যা ব মহাপরিচালকও সন্তান নিখোঁজের বিষয়টি জানাতে বলেছেন। ইচ্ছা করলে জিডি করার পর জিডির কপিসহ লিখিতভাবে র্যা ব অফিসে জানাতে পারেন। যদি কোনো কারণে সন্তানের গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হয় কিংবা নিখোঁজের পেছনে কোনো কারণ থাকে, তা-ও খোলাখুলি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অবগত করে রাখা উচিত।
জিডি কীভাবে করবেন
নিখোঁজ সন্তানের বিষয়ে সম্পূর্ণ বিবরণ দিতে হবে জিডিতে। সন্তানের পূর্ণাঙ্গ নাম (যদি ডাকনাম এবং বন্ধুমহলে কোনো বিশেষ নাম থাকে, তা-ও উল্লেখ করুন), ঠিকানা, বয়স, সে কোথায় পড়াশোনা করছে, তার শারীরিক গঠনের বর্ণনা প্রভৃতি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। কবে, কখন থেকে নিরুদ্দেশ হয়েছে, কারও সঙ্গে বের হয়েছে কি না, বিশেষ কারও নাম-ঠিকানা বলে গিয়েছে কি না, তা-ও উল্লেখ করুন। এ বিষয়ে জিডিতে পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে হবে। প্রয়োজনে জিডি বড় হলেও কোনো সমস্যা নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিষয়টি এখন সবচেয়ে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। সন্তান কোন মোবাইল নম্বর ব্যবহার করত, পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের নম্বর—সবকিছু উল্লেখ করুন। সে যদি কোনো দেশে ভ্রমণ করে থাকে, সে দেশের নাম এবং কবে ভ্রমণ করেছে, তা-ও উল্লেখ করতে পারেন। জিডিতে একটি নম্বর পড়বে। এ নম্বরসহ জিডির কপি সংরক্ষণ করুন। থানায় যাওয়ার পর পুলিশও নিজের মতো করে জিডি লিখতে পারে। পুলিশকে সব তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে হবে এবং কোনো তথ্য বাদ পড়ে গেল কি না, সেটা খেয়াল রাখুন। যদি মনে হয়, সন্তান অপহরণের শিকার হয়েছে, তাহলে জিডি না করে সরাসরি এজাহার দায়ের করতে পারেন। সন্দেহভাজন কেউ থাকলে তাকে আসামি করে এজাহার দায়ের করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পুলিশ ইচ্ছা করলে জিডি এজাহারে রূপান্তর করতে পারে। জিডিতে আপনার পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর উল্লেখ করবেন। সন্তানের রুমে বা কম্পিউটারে সন্দেহজনক কোনো বই বা তথ্য পাওয়া গেলে তা-ও পুলিশ বা র্যা বকে অবগত করুন। মনে রাখতে হবে, সন্তান নিখোঁজ হলেই যে জঙ্গি হয়ে যাচ্ছে বা যাবে, সেটি নিশ্চিত করে বলা যাবে না। নিখোঁজের অন্য কোনো কারণও থাকতে পারে। তাই নিখোঁজ হলেই যে তাকে জঙ্গি হিসেবে ধরেই জিডি করবেন, তা-ও নয়। পুলিশি তদন্ত শেষেই হয়তো পুলিশ এ বিষয়ে বলতে পারবে। তবে নিখোঁজের বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নিতেই হবে।
যা মনে রাখতে হবে
সন্তানের সঙ্গে যদি কোনো জঙ্গি সংগঠনের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পান, তাহলে এটি মনে করে সন্তান গোল্লায় গেছে বলে বিষয়টি লুকিয়ে রাখা ঠিক নয়। আইনি কোনো উদ্যোগ না নিলে তা নিজের ও দেশের জন্য আরও বড় কোনো বিপদ নিয়ে আসতে পারে। তাই কোনোভাবেই এ বিষয়ে গোপন করা ঠিক নয়। দেশ ও জাতির প্রতি আপনারও দায়বদ্ধতা রয়েছে। তাই দেশ এবং জাতির স্বার্থেই নিজের বখে যাওয়া সন্তানের বিষয়ে পুলিশকে অবগত করুন। নিখোঁজ হয়ে গেলেও অবশ্যই পুলিশ বা র্যা বকে অবগত করুন। মনে রাখতে হবে, নিজের মান-সম্মান বাঁচানোর জন্য সন্তানের বিষয় গোপন রাখতে গিয়ে দেশের অনেক বড় সর্বনাশ ডেকে আনবেন।
লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট