প্রথম দেখা পরিচিত হওয়ার শুরু, তাই মুহূর্তটি নিয়ে কমবেশি সবার মধ্যেই চাপা উত্তেজনা কাজ করে। কী পরবেন, কী বলবেন, সামনে থাকা মানুষটি আপনাকে পছন্দ করবেন কি না—এসব ভাবনা তো থাকেই। তার সঙ্গে যোগ হয় নিজের জীবন নিয়েও নানা প্রশ্নের সম্ভাবনা।
আসলে প্রথম ডেট কোনো চাকরির সাক্ষাৎকার নয়। এখানে নিজের প্রতিটি সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে কাউকে সন্তুষ্ট করার প্রয়োজন নেই; বরং দুজন মানুষ কথা বলবেন, একে অপরকে জানবেন এবং দেখবেন—একসঙ্গে সময় কাটাতে তাঁরা কতটা স্বচ্ছন্দ। তাই কিছু বিষয় আছে, যেগুলো নিয়ে প্রথম দেখাতেই অতিরিক্ত ব্যাখ্যা বা কৈফিয়ত না দিলেও চলে।
প্রথম ডেটেই সব বিষয়ে স্বচ্ছন্দ হওয়া জরুরি নয়। আপনি হয়তো খুব ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলতে চান না কিংবা কোথায় দেখা করবেন, সে বিষয়েও নিজের পছন্দ আছে। এসব জানাতে গিয়ে দীর্ঘ ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ‘এটা নিয়ে এখন কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছি না’—এ কথাটিই যথেষ্ট।
আপনার সীমারেখা অন্যজনের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে আলাদা যুক্তি দেখাতে হবে না; বরং প্রথম সাক্ষাতেই কেউ আপনার ‘না’কে সম্মান করছেন কি না, সেটি লক্ষ করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সুস্থ সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মান। আপনার স্বাচ্ছন্দ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য অন্যজনের কারণ জানার প্রয়োজন নেই।
প্রথমবারের দেখাতেই যে নিজের সব সাফল্য কিংবা নিজের সব ঘাটতি প্রকাশ করতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। চাকরি এখনো পছন্দমতো হয়নি, ক্যারিয়ার বদলানোর কথা ভাবছেন, পড়াশোনা শেষ হলেও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা পরিষ্কার নয়—এসব নিয়ে হয়তো মনে হতে পারে, অন্যজন কী ভাববেন। কিন্তু মানুষের জীবন সব সময় একই গতিতে থাকে না।
কারও ক্যারিয়ার আগে গোছানো হয়ে যায়, কারও ব্যক্তিগত জীবন; কেউ আবার দীর্ঘ সময় ধরে নিজের জায়গা খুঁজতে থাকেন। তাই প্রথম দেখাতেই নিজের বর্তমান অবস্থাকে ন্যায্য প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই। আপনি এখন যেখানে আছেন, সেটি আপনার জীবনের একটি পর্যায় মাত্র। ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা থাকতে পারে, আবার কিছু বিষয় এখনো অনিশ্চিতও হতে পারে। নিজের এই অনিশ্চয়তাকে লুকিয়ে নিখুঁত একটি জীবন দেখানোর চেয়ে স্বাভাবিক থাকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সম্পর্কের শুরুতেই মেসেজের উত্তর কত দ্রুত দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে অনেক সময় অদৃশ্য এক হিসাব শুরু হয়ে যায়। কয়েক ঘণ্টা উত্তর দেওয়া হয়নি—কেন হয়নি, তার ব্যাখ্যাও যেন দিতে হবে। অথচ কাজের ব্যস্ততা, পড়াশোনা, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা নিজের জন্য কিছুটা সময় রাখা—সবই জীবনের স্বাভাবিক অংশ। অবশ্যই কাউকে ইচ্ছা করে দিনের পর দিন উপেক্ষা করা আর ব্যস্ততার কারণে কয়েক ঘণ্টা পর উত্তর দেওয়া এক বিষয় নয়।
যোগাযোগে আগ্রহ থাকলে সেটি প্রকাশ করাও জরুরি। তবে প্রতিটি দেরির জন্য দীর্ঘ কৈফিয়ত দেওয়ার অভ্যাস সম্পর্কের শুরুতেই অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করতে পারে। একটি সম্পর্কের জায়গা এমন হওয়া উচিত, যেখানে মানুষ নিজের কাজ করতে গিয়ে অপরাধবোধে ভুগবেন না। তাই প্রথম ডেটেই বোঝা ভালো—সামনের মানুষটি যোগাযোগের ক্ষেত্রে আপনার স্বাভাবিক ছন্দকে সম্মান করেন কি না।
‘আমি একটু বেশি কথা বলি’, ‘আমি আসলে খুব চুপচাপ’, ‘আমি অনেক প্রশ্ন করি, কিছু মনে করবেন না’—প্রথম ডেটে নিজের স্বভাবের জন্য আগেই ক্ষমা চাওয়ার প্রবণতা অনেকের মধ্যেই থাকে। অবশ্য নিজের আচরণে অন্য কেউ অস্বস্তি বোধ করলে তা বোঝার চেষ্টা করা দরকার। কিন্তু শুধু অন্যজনকে খুশি করার জন্য নিজের স্বাভাবিক ব্যক্তিত্বকে ছোট করে দেখানোর প্রয়োজন নেই।
আপনি কথা বলতে ভালোবাসেন, একটু লাজুক, অনেক প্রশ্ন করেন কিংবা নিজের মতামত সরাসরি জানান—এসবই আপনার ব্যক্তিত্বের অংশ। প্রথম ডেটেই নিজেকে পাল্টানোর চেষ্টা করলে পরে সেই আচরণ ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে; বরং প্রথম দেখার অন্যতম উদ্দেশ্যই হওয়া উচিত—দুজন মানুষ নিজেদের স্বাভাবিক অবস্থায় কতটা স্বচ্ছন্দ থাকতে পারেন, তা বোঝা।
প্রথম ডেটেই ‘তুমি এখনো সিঙ্গেল কেন?’ এমন প্রশ্ন আসতে পারে। প্রশ্নটি শুনে অনেকেই নিজের পুরোনো সম্পর্ক, বিচ্ছেদ, কেন কোনো সম্পর্ক টেকেনি—সবকিছুর বিস্তারিত বলতে শুরু করেন। অথচ একা থাকা এমন কোনো বিষয় নয়, যার সমাধান বা ব্যাখ্যা দিতে হবে। হয়তো আপনি ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, হয়তো নিজের মতো থাকতে চেয়েছেন, আবার হয়তো উপযুক্ত মানুষের সঙ্গে এখনো দেখা হয়নি।
কারণ যা–ই হোক, সেটি কতটা বলবেন, তা আপনার সিদ্ধান্ত। প্রথম দেখাতেই ব্যক্তিগত সম্পর্কের ইতিহাস খুলে বলার বাধ্যবাধকতা নেই। আরেকটি বিষয়ও মনে রাখা ভালো যে কেউ সিঙ্গেল কেন, সেই প্রশ্নের উত্তর শুনে তাঁকে বিচার করার প্রবণতা থাকলে সেটিও খেয়াল করার মতো বিষয়।
প্রথম ডেট শুধু কাউকে পছন্দ করানোর সুযোগ নয়; দুজনের একে অপরকে জানারও সময়। তাই নিজের জীবন, সিদ্ধান্ত বা ব্যক্তিত্বের প্রতিটি দিকের ব্যাখ্যা না দিয়ে কথোপকথনকে স্বাভাবিক হতে দিন। প্রথম দেখা কোনো পরীক্ষা নয়, নিজের মতো থাকার জন্য এখানে কোনো কৈফিয়তেরও প্রয়োজন নেই।
টাইমস অফ ইন্ডিয়া অবলম্বনে হুমায়রা মাহজাবিন