সন্তানের আঁকা একটা ছবি। কয়েক বছর আগের স্কুলের রিপোর্ট কার্ড। কাগজে হাতের ছাপ। কচি হাতে লেখা ‘অ’, ‘আ’ বা ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’, ‘ডি’। এমন জিনিসের তেমন কোনো ব্যবহারিক মূল্য নেই। তবু সন্তান বড় হয়ে যাওয়ার পরও অনেক মা–বাবা এসব ফেলে দিতে পারেন না। কেন? প্রথম উত্তরটা সহজ, সন্তানের শৈশবের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য। কিন্তু মনোবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, বিষয়টি শুধু সন্তানের স্মৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না–ও থাকতে পারে।

সন্তানের পুরোনো জিনিস অনেক সময় মা–বাবার নিজের জীবনকাহিনিরও একটি অংশ হয়ে ওঠে। একটি ছবি শুধু শিশুটিকে মনে করিয়ে দেয় না; মনে করিয়ে দেয় সেই সময়ের বাড়ি, পরিবারের মানুষজন, মা–বাবার নিজের জীবন এবং সেই সময়ের মানুষটিকেও।
ছয় বছর বয়সী একটি শিশুর আঁকা ছবির কথাই ধরুন। স্বাভাবিকভাবেই ছবিটির সবই শিশুতোষ। আঁকা ছবিতে মানুষগুলোর হয়তো হাত-পা ঠিকঠাক নেই; রং ব্যবহারে মানা হয়নি কোনো ব্যাকরণ। শিল্পমূল্য প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু মা–বাবার কাছে ছবিটি হয়তো সেই সময়ের একটা জানালা।
ছবিটি দেখলে সেই জানালায় ভেসে উঠতে পারে পুরোনো দিনের অনেক ছবি। মনে পড়ে যেতে পারে, তখন পরিবার কোথায় থাকত, সন্তান কোন স্কুলে পড়ত, কী নিয়ে মেতে থাকত, কে তাকে ছবিটা আঁকতে বলেছিল কিংবা ছবি আঁকা শেষে সে কী বলেছিল।
আত্মজীবনীমূলক স্মৃতি নিয়ে গবেষণায় দেখা যায়, মানুষ নিজের অতীতকে শুধু আলাদা ঘটনা হিসেবে মনে রাখে না। এসব স্মৃতি নিজের পরিচয় ও জীবনের ধারাবাহিকতার সঙ্গেও যুক্ত থাকে। অতীতের কথা মনে করা নিজের সম্পর্কে বোঝাপড়া তৈরি করতে, অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখতে এবং বর্তমান ও ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তেও ভূমিকা রাখতে পারে।
শিশু যখন প্রথম স্কুলে যায়, তখন মা–বাবাও প্রথমবার স্কুলপড়ুয়া সন্তানের অভিভাবক হন। শিশু যখন প্রথম নিজের নাম লিখতে শেখে, তখন মা–বাবার জীবনেও সেটি একটি নতুন পর্যায়। প্রথম পুরস্কার, প্রথম রিপোর্ট কার্ড, প্রথম আঁকা ছবি—সবকিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে তাঁদের নিজেদের জীবনের কোনো না কোনো সময়।
তাই পুরোনো রিপোর্ট কার্ড খুললে শুধু সন্তানের ফলাফলই চোখে পড়ে না, কয়েক বছর আগের নিজের জীবনটিও চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তখন হয়তো সংসারটা অন্য রকম ছিল। কাজের ধরন ছিল আলাদা। সন্তান ছোট ছিল; মা–বাবার বয়সও ছিল কম।
সন্তান যখন ছোট, তখনকার দিনগুলো সাধারণত খুব ব্যস্ততায় কাটে। স্কুলে আনা–নেওয়া, খাওয়ানো, পড়ানো, খেলাধুলা, ঘরের কাজ, অফিস—সবকিছুর মধ্যে দিন কেটে যায়।
মজার ব্যাপার হলো, তখন মনে হতে পারে, প্রতিটি মুহূর্তই মনে থাকবে। কিন্তু কয়েক বছর পর দেখা যায়, ফেলে আসা দিনগুলো একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে।
এর একটা কারণ হতে পারে, তখন মনোযোগ একই সঙ্গে অনেক দিকে ছড়িয়ে থাকে। একটি শিশুর সঙ্গে কাটানো পুরো বিকেল হয়তো পরে আলাদা কোনো স্মৃতি হিসেবে মনে থাকে না। কিন্তু সেই বিকেলে শিশুটি যে ছবিটি এঁকেছিল, সেটি হাতে এলে হঠাৎ অনেক কিছু মনে পড়ে যেতে পারে। কোন ঘরে বসে ছবিটা আঁকছিল? বাইরে বৃষ্টি হচ্ছিল কি না? তখন শিশুটি কী বলেছিল? মা বা বাবা কী করছিলেন?
একটি বস্তু এভাবেই কখনো কখনো একটি স্মৃতির সূত্রধর হয়ে উঠতে পারে।
মনোবিজ্ঞানে আত্মজীবনীমূলক স্মৃতির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের কথা বলা হয়—নিজেকে বোঝা, অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা এবং অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বর্তমান বা ভবিষ্যতের জন্য দিকনির্দেশ পাওয়া। ব্রিটিশ মনোবিজ্ঞানী সুসান ব্ল্যাকমোর ও তাঁর সহকর্মীরা এসব কাজ নিয়ে গবেষণা করেছেন।
তাঁদের মতামত, সন্তানের একটি পুরোনো ছবি এই তিনটির সঙ্গেই কোনো না কোনোভাবে যুক্ত হতে পারে।
একজন মা বা বাবা ছবিটি দেখে নিজের জীবনের একটি পর্যায় মনে করতে পারেন। সন্তানের সঙ্গে ছবিটি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ‘পুরানো সেই দিনের কথা’ বলতে বলতে আবেগাক্রান্ত হতে পারেন। আবার নিজের জীবন কতটা বদলে গেছে, সেটিও উপলব্ধি করতে পারেন।
আজ যে সন্তান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, তার তিন বছর বয়সের আঁকা ছবির দিকে তাকালে মা–বাবা শুধু তখনকার শিশুটিকে দেখেন না। তাঁরা নিজেদেরও দেখতে পান; তখন তাঁরা কেমন ছিলেন, কী নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, কী স্বপ্ন দেখতেন।
শিশুর হাতের ছাপ দেওয়া একটা কাগজের বিশেষত্ব এর সৌন্দর্যে নয়। বরং সেটি শিশুটির শরীরের একটি নির্দিষ্ট সময়কে ধরে রাখে।
একসময় যে হাতটি এত ছোট ছিল, এখন সেটিই হয়তো মা–বাবার হাতের সমান বা তার চেয়েও বড়। একটি পুরোনো হাতের ছাপ তাই মনে করিয়ে দেয়, সময় কত দ্রুত চলে গেছে।
একইভাবে শিশুর প্রথম হাতের লেখা, আঁকাবাঁকা অক্ষর কিংবা স্কুলের প্রথম রিপোর্ট কার্ডও এমন একটি সময়ের চিহ্ন হয়ে থাকে, যে সময় আর ফিরে আসবে না। স্মারক হিসেবে এসবের মূল্য সেখানেই।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, সব মা–বাবা সন্তানের জিনিস একই কারণে জমিয়ে রাখেন না। কেউ স্মৃতি ভালোবাসেন, কেউ জিনিসপত্র জমাতে পছন্দ করেন, কেউ আবার জায়গার অভাবে প্রায় কিছুই রেখে দিতে পারেন না।
তাই যে মা–বাবা সন্তানের শৈশবের জিনিস জমিয়ে রাখেন আর যাঁরা রাখেন না, তাঁদের তুলনাও করাও ভুল। অর্থাৎ যাঁরা সংরক্ষণ করলেন, তাঁরা অধিক যত্নবান বা বেশি ভালোবাসেন আর যাঁরা সংরক্ষণ করলেন না, তাঁরা যত্নবান নন—এমন ঢালাও বিচার করা যায় না।
সন্তানের শৈশবের জিনিস জমিয়ে রাখার সঙ্গে মা–বাবার ভালোবাসার মাত্রার কোনো সম্পর্ক নেই।
সন্তানের জিনিসপত্র সংরক্ষণ করার আগে তাই নিজেকে প্রশ্ন করতে পারেন, কোন জিনিসটি সত্যিই সময়ের গল্প ধরে রেখেছে? একটি শিশুর শত শত আঁকার মধ্যে হয়তো পাঁচটিই বিশেষ। একটি হাতের ছাপ, একটি নিজের হাতে লেখা বাক্য, একটি রিপোর্ট কার্ড কিংবা এমন কোনো ছবি, যেটা দেখলেই একটা নির্দিষ্ট দিনের কথা মনে পড়ে। এটুকুই যথেষ্ট।
আর যেসব জিনিস রাখছেন না, সেসবের ছবি তুলে রাখাও ভালো এক সমাধান। অনেকেই এটি করেন।
সন্তান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুধু সন্তানই বদলায় না; বদলে যায় পরিবার, মা–বাবার ভূমিকা, বাড়ির পরিবেশ, দৈনন্দিন জীবন—এমনকি মা–বাবার নিজেদের পরিচয়ও। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, হয়তো এ কারণেই কিছু পুরোনো মামুলি কাগজ ফেলে দিতে এত কষ্ট হয়। আমরা সব সময় শুধু সন্তানকে ধরে রাখতে চাই না; কখনো কখনো নিজের জীবনের একটা অংশকেও ধরে রাখতে চাই।
স্মৃতির বাক্সে তাই শুধু শিশুর শৈশবই থাকে না, সেখানে চুপচাপ থেকে যায় দুজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের জীবনেরও কিছুটা অংশ।
সূত্র: দ্য আর্টফুল এজ