ঈদ এলেই আম্মার কথা মনে পড়ে

মা রাবেয়া খাতুনের সঙ্গে ফরিদুর রেজা সাগর
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

ঈদ এলেই আমার আম্মা (লেখক রাবেয়া খাতুন) কথা মনে পড়ে। আম্মা আমাদের বড় করেছেন খুব সাধারণভাবে। বিলাস–বৈভব তিনি পছন্দ করতেন না। ঈদ এলেই আমাদের ভাই–বোনদের জন্য নির্ধারিত থাকত একটা জামা, একটা প্যান্ট, এক জোড়া জুতা। আব্বা ও আম্মা আমাদের নিয়ে কোনো একদিন বের হতেন ঈদের কেনাকাটা করতে।

মনে পড়ে, কোনো এক ঈদে আব্বা–আম্মা আমাদের মোকাসিনের জুতা কিনে দিলেন। বাটা কোম্পানির জুতা। এই জুতার বৈশিষ্ট্য ছিল—ফিতা উল্টে দিলে পাম্পশুর মতো হয়ে যেত। আর ফিতা পরলে জুতা হয়ে যেত। মজার এই জুতা আমরাও খুব পছন্দ করলাম।

আমরা যে এলাকায় থাকতাম, সেখানকার ছেলেমেয়েরাও ঈদের দিনে নতুন পোশাক পরত। তখন অবশ্য এখনকার মতো পাঞ্জাবি–পায়জামার এতটা চল ছিল না। ঈদের জামাকাপড় ছাড়াও আম্মা আমাদের উপহার দিতেন বই। আম্মার এই উপহারের মধ্যেই আমরা পড়েছিলাম গালিভারের ভ্রমণ কাহিনি, শার্লক হোমস, ট্রেজার আইল্যান্ড, আম আঁটির ভেঁপু, আরব্য রজনীর গল্প, হাতেম তাই, ঠাকুরমার ঝুলিসহ অনেক জনপ্রিয় বই। এই বইগুলো আমাদের ঈদের আনন্দ আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিত।

বাবা ফজলুল হক ও মা রাবেয়া খাতুনের সঙ্গে চার সন্তান। পেছনে দাঁড়িয়ে কেকা ফেরদৌসি ও ফরিদুর রেজা সাগর, সামনে বসা ফাহাদুর রেজা প্রবাল ও ফারহানা কাকলী

ঈদ মানেই বাড়িতে বাড়িতে নানা রকম খাবারের বাহার। পোলাও, রোস্ট, সেমাই, পায়েস, ক্ষীরসহ নানান আয়োজন। আম্মা ঈদের দিন খুব সকালে উঠে রান্না শুরু করতেন। আমরা ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে বাবার সঙ্গে ঈদগাহতে যেতাম। আমি আর আমার ছোট ভাই প্রবাল নতুন জামা পরে বাবার সঙ্গে ঈদের নামাজে চলে যেতাম। সেখানে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা হতো। তাদের আমন্ত্রণ জানাতাম। তারাও বলত, ‘তুমিও এসো বাসায়।’ যারা নামাজ পড়তে আসত, তাদের শরীরে থাকত আতরের ঘ্রাণ। নানা রকম রঙিন জামা।

নামাজে যাওয়ার আগে আম্মার হাতের সেমাই মুখে দিতাম। ঈদের দিন কারও বাড়িতে গেলেই বলত, ‘কিছু খেয়ে যাও।’ বাসায় ফিরে আব্বা তাঁর ছেলেবেলার কথা বলতেন। আম্মাও বলতেন তাঁর ছেলেবেলায় গ্রামে ঈদ কেমন হতো। তখনো ঈদে নতুন পোশাকের চাহিদা ছিল। পাড়া–প্রতিবেশী একে অপরের বাড়িতে বেড়াতে আসত। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না ভাগ করে নিত। ঈদের আনন্দটাই ছিল অন্য রকম। আমাদের বন্ধুবান্ধবরাও নতুন জামা কিনত, কিন্তু ঈদের আগে সেই জামা দেখাতে চাইত না। আমরা আমাদের জামাকাপড় লুকিয়ে রাখতাম। আমাদের জন্য কোন ধরনের জামা কিনতে হবে, সেসব আম্মা নিজে পরিকল্পনা করতেন।

আম্মা ছিলেন কর্মঠ মানুষ। নিজ হাতে রান্না করতেন, আবার এরই ফাঁকে ঈদসংখ্যার লেখা লিখতেন। তখন এত ধরনের ঈদসংখ্যা প্রকাশিত হতো না। মনে আছে, বেগম পত্রিকা লেখকদের ছবি দিয়ে ঈদসংখ্যা করত। সব লেখাই থাকত নারীদের। আর প্রতিটি দৈনিক পত্রিকায় ঈদের কয় দিন আগে বিশেষ

সংখ্যা হিসেবে রঙিন চার বা আট পাতা ঈদসংখ্যা হিসেবে ছাপা হতো। মনে আছে, বিচিত্রা এ রকম আলাদা একটি সংখ্যা বের করেছিল তৎকালীন দৈনিক বাংলা থেকে। এখন যেমন প্রতিটি দৈনিকের ঈদসংখ্যা করার একটি রেওয়াজ আছে এবং একটি প্রতিযোগিতাও আছে। আমরাও ঈদসংখ্যা বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংগ্রহ করে পড়ার চেষ্টা করি। আম্মা যে হাতে ঈদসংখ্যার লেখা লিখতেন, সেই হাতেই খিচুড়ি পাকাতেন, হাঁসের মাংস রান্না করতেন—এই স্মৃতি আমার খুব মনে পড়ে।

একবার আব্বা-আম্মার সঙ্গে আমরা ঈদের শপিং করতে সদরঘাট গেছি। সদরঘাটে যাওয়ার পথে একটা নিয়ন সাইন দেখলাম। নিয়ন সাইন তখন নতুন এসেছে। সেখানে লেখা আছে—হাবিব ব্যাংক লিমিটেড। একটা ল্যাম্পপোস্টের ওপরে লাগানো নিয়ন সাইনটা। একবার জ্বলছে, একবার নিভছে। একবার লেখা উঠছে ‘ইয়োর ব্যাংক’, আবার ভেসে উঠছে ‘আওয়ার ব্যাংক’। আমি হঠাৎ দাঁড়িয়ে এই মজার আলোর খেলাটা দেখলাম। আমি ভুলেই গেলাম যে আমি এসেছি ঈদের জামাকাপড় কিনতে। কেনাকাটার চেয়েও সুখের ছিল সেই স্মৃতি।