সম্পর্ক ধ্বংস করার ‘সবচেয়ে সহজ’ উপায়গুলোর একটি হলো ‘কিপিং স্কোর’। অর্থাৎ আপনি সঙ্গীর জন্য কতটা করলেন, আর সঙ্গী আপনার জন্য কতটা করল, তার হিসাব রাখা।
হয়তো আপনি তাঁর জন্য ৩ ঘণ্টা অপেক্ষা করেছেন। কিন্তু তিনি ইচ্ছা করে, আলসেমি বা অবহেলা করে দেরি করে আসেননি। তিনি হয়তো সত্যিই কাজে আটকা পড়েছিলেন।
‘আমি ওর জন্য এত কিছু করেছি’
‘আমি সব সময় আগে ফোন করি’
‘মেসেজ পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গে আমি সিন করি, রিপ্লাই দিই, অথচ ১৩ মিনিট হয়ে গেছে, ও এখনো আমার মেসেজ সিন করেনি’
‘ওর জন্মদিনে আমি এত কিছু করেছিলাম, অথচ আমার জন্মদিনে…?’
‘আমি এতবার ওকে বুঝেছি, ও আমাকে একবারও বুঝল না’
ওপরের সবই আদতে কিপিং স্কোর।
এই হিসাবগুলো শুরুতে খুব স্বাভাবিক মনে হয়। কারণ, আমরা সবাই চাই, আমাদের দেওয়া ভালোবাসা, সময়, শ্রম ও ত্যাগের মূল্যায়ন হোক। কিন্তু যখন সম্পর্কের প্রতিটি কাজের পাশে মনে মনে একটি করে সংখ্যা বসতে শুরু করি আমরা, তখন ভালোবাসা ধীরে ধীরে লেনদেনে পরিণত হয়। পড়ে যায় হিসাব-নিকাশের দুষ্টচক্রে।
আপনি আজ সঙ্গীর জন্য কিছু করলেন। বিনিময়ে কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা করলেন না। কিন্তু কয়েক দিন পর মনে হলো, ‘আমি তো এটা করেছি, সে আমার জন্য কী করেছে?’ সেখান থেকেই শুরু হয় অভিমান।
এরপর পুরোনো ঘটনাগুলো একে একে সামনে আসে। কে কতবার ক্ষমা চেয়েছে, কে কতবার ছাড় দিয়েছে, কে কতটা সময় দিয়েছে—সবকিছুর হিসাব মেলানো শুরু হয়।
সমস্যা হলো, ভালো সম্পর্ক কখনো ৫০-৫০ হিসাবের সম্পর্ক নয়। আর পৃথিবীতে আদতে ‘ফিফিটি ফিফটি’ বলে কোনো সম্পর্ক হয় না। কোথাও আপনি একটু বেশি দিচ্ছেন, কোথাও অপরজন।
কখনো একজন বেশি দেবে; কারণ, অন্যজন তখন কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কখনো একজন ক্লান্ত থাকবে, আর অন্যজন একটু বেশি দায়িত্ব নেবে। আবার সময় বদলালে ভূমিকা বদলে যাবে। সম্পর্কের সৌন্দর্য এখানেই, প্রতিদিন সমান দেওয়ার মধ্যে নয়, বরং প্রয়োজনের সময় একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যে।
তাই সঙ্গী আপনার জন্য যা করেননি, তার তালিকা বানানোর আগে ভাবুন তিনি হয়তো এমন অনেক কিছু করছেন, যেসব আপনি হিসাবের খাতায় কখনো তোলেনইনি। হয়তো তিনি আপনার কথা মন দিয়ে শোনেন। হয়তো আপনার খারাপ দিনটায় আপনাকে একটু বেশি সময় দেন। হয়তো আপনার ছোট ছোট পছন্দ মনে রাখেন।
হয়তো আপনার সাফল্যে সত্যিই খুশি হন। হয়তো আপনি ভেঙে পড়লে নীরবে পাশে থাকেন। ভালোবাসার সবচেয়ে মূল্যবান কাজগুলোর অনেকগুলোরই কোনো দৃশ্যমান মূল্য নেই। তাই সেগুলোকে সংখ্যায় মাপাও যায় না।
‘কিপিং স্কোর’ না করার অর্থ এই নয় যে অন্যায় সহ্য করতে হবে। যদি একজন ব্যক্তি নিয়মিতভাবে শুধু নেয়, আর অন্যজন শুধু দিয়ে যায়; সেটি আদতে কোনো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কই নয়। যদি আপনার প্রয়োজন, অনুভূতি ও সীমারেখাগুলো বারবার উপেক্ষা করা হয়, তাহলে সেটি ‘হিসাব রাখা না-রাখার’ বিষয়ই নয়, বরং সম্পর্কের ভারসাম্য নিয়ে কথা বলা প্রয়োজন।
একটি স্বাস্থ্যকর সম্পর্ক সেটি, যেখানে দুজনেই সম্পর্কটাকে নিজের এক শ এক শ দেন। মানে নিজেদের সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করে দেন সম্পর্কটাকে সুন্দর রাখতে। সঙ্গীর জন্য কিছু করতে পারার আনন্দে আনন্দিত থাকেন।
কে কার জন্য কতটা করতে পারল, এই দৌড়ে নিজে এগিয়ে থাকতে চাওয়া, আর কোনো হিসাব না রেখে সঙ্গীর জন্য কিছু করতে পেরে খুশি থাকা সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্কের অন্যতম সেরা বৈশিষ্ট্য।
ভালোবাসা কোনো স্কোরবোর্ড নয়। এখানে জেতার জন্য পয়েন্ট জমাতে হয় না। কখনো আপনি বেশি দেবেন, কখনো অপরজন। কখনো আপনি সম্পর্কের গ্রিপ ধরে রাখবেন, কখনো তিনি।
শেষ পর্যন্ত সুন্দর সম্পর্কগুলো টিকে থাকে তখনই, যখন দুজন ব্যক্তি কে কত দিল তার হিসাব না করে একে অন্যের জন্য কতটা হাত বাড়িয়ে সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠতে পারল, সেটাকে গুরুত্ব দেয়।
সূত্র: রিলেশনশিপ ম্যাটারস