সবকিছু ঠিক থাকলে, আগামী ১০ মার্চ মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষা হবে। গত বছর এই পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন খুলনার সুমাইয়া মোসলেম। এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়ছেন তিনি। কেমন ছিল তাঁর পরীক্ষার সময়টা? কীভাবে এত প্রতিযোগিতামূলক একটা পরীক্ষার চাপ সামলেছিলেন তিনি?

গত বছর এই সময়টা যেমন ছিল...
আমাদের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১ এপ্রিল। ভর্তিযুদ্ধের মতো এমন কঠিন পরীক্ষার আগের মুহূর্তগুলোতে সব শিক্ষার্থীকেই নানা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে সময় পার করতে হয়। আমার পরিবারে আর কোনো চিকিৎসক না থাকায় সবার আশা ছিল অনেক বেশি। এই ভরসাই এই সময়টাতে আমাকে প্রতিনিয়ত লেগে থাকার অনুপ্রেরণা দিত। পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে কখনো কখনো হতাশ হয়ে যেতাম। কিন্তু হাল ছাড়তাম না। আশপাশের কাছের মানুষগুলোর হাসিমুখের কথা ভেবে চেষ্টা চালিয়ে যেতাম। সাদা অ্যাপ্রনের আবেদনটাও ছিল অন্য রকম। শুভ্র এই কাপড়টাকে নিজের করে নেওয়ার ইচ্ছাও কাজ করত প্রবলভাবে।
কেমন যাচ্ছে মেডিকেলজীবন...
আমাদের মেডিকেল কলেজের ক্লাস শুরু হয় ১ আগস্ট থেকে। দেখতে দেখতেই ছয় মাসের বেশি পার হয়ে গেছে। পরিবার, আপন মানুষদের ছেড়ে এক নতুন আমিকে খুঁজে পেয়েছি। শুরুর দিকে প্রতিনিয়ত আইটেম, কার্ডের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উঠতে আমরা সবাই হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। হুট করে এসেই নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ, পড়াশোনার চাপ সামলাতে হিমশিম খাওয়াই স্বাভাবিক। এসব ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ শিক্ষকেরা অভিভাবকের মতো সব সময় সাহায্য করতে চেষ্টা করেছেন। আবার মন খারাপের সময়গুলোতে বন্ধুবান্ধবও ভাইবোনের মতো পাশে থেকে মানসিক সমর্থন দিয়েছে। সব পরিস্থিতিতে পাশে থাকে, এমন কিছু মানুষের সঙ্গে পথচলার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আমি আল্লাহর কাছে অনেক কৃতজ্ঞ। এই মানুষদের কাছ থেকে প্রতিনিয়তই নতুন কিছু শিখছি।
চিকিৎসক হওয়ার কথা ভাবলে যেটা সবার আগে মাথায় আসে, তা হলো অ্যাপ্রন পরে গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলিয়ে ওয়ার্ডে গিয়ে রোগী দেখা। কিন্তু এটার জন্য এক বছরেরও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়। এই অপেক্ষাটা কিছুটা কষ্টের। যেহেতু এই সময়টাতে ক্লিনিক্যাল কোনো বিষয়ের সঙ্গে আমাদের হাতে–কলমে পরিচয় হয় না।
আবার যদি ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পেতাম...
আম্মু স্বাস্থ্যকর্মী হওয়ায় আমার ছোটবেলার একটা অংশ হাসপাতালেই কেটেছে। শত ধরনের ওষুধ, রোগী, এগুলো দেখতে দেখতেই বড় হয়েছি। কত মানুষের কত ধরনের অসুস্থতা! তাই চিকিৎসা ক্ষেত্রের প্রতি আলাদা একটা অনুভূতি সব সময়ই ছিল। কিন্তু এটাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার স্বপ্ন তখনো দেখা হয়নি। বড় হওয়ার পর ইচ্ছা ছিল কম্পিউটার প্রকৌশল পড়ব। পরে আম্মুর স্বপ্ন, পরিবারে একজন ডাক্তারের অভাব বোধ করে নিজ ইচ্ছাতেই সিদ্ধান্ত বদলেছি। মেডিকেলে সুযোগ পাওয়ার পর একজন চিকিৎসকের ওপর মানুষের আস্থার পরিধি উপলব্ধি করেছি আরও নিবিড়ভাবে। তাই আরেকবার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ পেলে আবারও হয়তো মেডিকেলের জন্যই চেষ্টা করতাম।
যখন সবচেয়ে ভালো লাগে...
পরীক্ষা শেষ করে বাসায় যাওয়ার মুহূর্তটাই আমার কাছে সবচেয়ে প্রশান্তির। বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো আড্ডার সময়গুলোও খুব সুন্দর।
এবার যাঁরা পরীক্ষা দেবেন, তাঁদের জন্য...
সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১০ মার্চ ভর্তি পরীক্ষা হবে। হাতে তো খুব বেশি সময় নেই। একেবারে শেষ সময়ে এসে করণীয় হলো পরীক্ষার জন্য মানসিকভাবে তৈরি থাকা। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ মুহূর্তে নতুন কিছু শেখার চেষ্টা না করা। উচ্চমাধ্যমিকে গত দুই বছরে যেটা পড়া হয়েছে এবং গত দুই মাসে যা প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন, সেগুলোই হবে এখন মূল পড়াশোনা। যেসব বিষয় এত দিন পড়েছেন এবং যেসব প্রশ্ন পরীক্ষায় আসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ—সেগুলোর ওপরই জোর দিতে হবে।
পাশাপাশি ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে যেসব পরীক্ষা দিয়েছেন, সেসব পরীক্ষায় যে ভুলগুলো হয়েছে, সেগুলো শোধরানোর বিষয়ে মনোযোগী হতে হবে। অর্থাৎ যেসব বিষয়ে খানিকটা দুর্বলতা রয়েছে, সেগুলোই বারবার রিভাইস করতে হবে। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় ৬০ মিনিটে ১০০ প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। এটা একটু জটিল। তবে বারবার পরীক্ষা দিতে গিয়ে সময় ব্যবস্থাপনা আমরা ভালোভাবে রপ্ত করে ফেলি। ভালো ফলাফলের জন্য অবশ্যই ৯০–এর অধিক প্রশ্নের উত্তর করা শ্রেয়।
পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার বিড়ম্বনা...
ভালো ফল ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ, সবার প্রত্যাশার মান রাখার চেষ্টা, এসব মিলিয়ে একটা সূক্ষ্ম মানসিক চাপ কাজ করে। যদিও এটা তো আর বিড়ম্বনা না, একধরনের ভালো লাগাই বলতে পারেন।