শপিং করবেন, টাকা লাগবে না—কোরিয়ায় জনপ্রিয় হচ্ছে ‘ডোপামিন সাইট’

ধরুন, নতুন একটি ফোন কার্টে যোগ করলেন। অর্ডারও দিয়ে দিলেন। কিছুক্ষণ পর দেখছেন, কুরিয়ার আপনার বাসার দিকেই এগিয়ে আসছে। অথচ বাস্তবে আপনি এক টাকাও খরচ করেননি, আর আপনার দরজায় কখনোই কোনো পণ্য পৌঁছাবে না। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও দক্ষিণ কোরিয়ায় জনপ্রিয় হচ্ছে এমনই কিছু ‘ডোপামিন সাইট’, যেখানে কেনাকাটার পুরো রোমাঞ্চটাই আছে, শুধু সত্যিকারের কেনাকাটাটাই নেই।

শুনতে অদ্ভুত লাগলেও দক্ষিণ কোরিয়ায় জনপ্রিয় হচ্ছে এমনই কিছু ‘ডোপামিন সাইট’, যেখানে কেনাকাটার পুরো রোমাঞ্চটাই আছে, শুধু সত্যিকারের কেনাকাটাটাই নেই
ছবি: পেক্সেলস

এসব আদতে ভুয়া অনলাইন শপিং প্ল্যাটফর্ম, যেখানে কেনাকাটার পুরো অভিজ্ঞতাই নকল, কিন্তু অনুভূতিটা একেবারে বাস্তব। পণ্য দেখা থেকে শুরু করে কার্টে যোগ করা, অর্ডার দেওয়া, এমনকি কুরিয়ারের অবস্থান ট্র্যাক করাও সম্ভব। শুধু কোনো টাকা খরচ হয় না, আর কোনো পণ্যও কখনো পৌঁছায় না। কিন্তু কেন এমন সাইট তৈরি হলো, আর কেন লাখো তরুণ এতে সময় কাটাচ্ছেন?

কেনাকাটা, কিন্তু কিছুই কেনা নয়

প্রথম দেখায় এসব ওয়েবসাইটকে সাধারণ ই-কমার্স সাইটই মনে হবে। পণ্যের ছবি দেখা যাবে, রিভিউ পড়া যাবে, কার্টে যোগ করা যাবে, এমনকি অর্ডারও দেওয়া যাবে।

এরপর শুরু হবে আরেক ধাপ। পর্দায় দেখা যাবে একজন কুরিয়ার সার্ভিস কর্মী আপনার অর্ডার নিয়ে রওনা দিয়েছেন। ম্যাপে তাঁর অবস্থানও দেখা যাবে। পুরো বিষয়টি এতটাই বাস্তব মনে হয় যে অনেকেই প্রথমে বুঝতে পারেন না, এটি আসলে একটি সিমুলেশন।

তবে শেষ পর্যন্ত আপনার দরজায় কেউ কড়া নাড়বে না। কারণ, কোনো পণ্যই কখনো পাঠানো হয় না।

কেন এমন সাইটে ভিড়?

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অনেক মানুষের ক্ষেত্রে কেনাকাটার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর মুহূর্তটি পণ্য হাতে পাওয়ার সময় নয়, বরং তার অপেক্ষার সময়

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অনেক মানুষের ক্ষেত্রে কেনাকাটার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর মুহূর্তটি পণ্য হাতে পাওয়ার সময় নয়, বরং তার অপেক্ষার সময়। অর্ডার দেওয়ার পর কুরিয়ারের অবস্থান বারবার দেখা, কখন পণ্য আসবে সেই প্রত্যাশা—এসবই মস্তিষ্কের পুরস্কারব্যবস্থাকে সক্রিয় করতে পারে এবং ডোপামিন নিঃসরণের সঙ্গে সম্পর্কিত অনুভূতি তৈরি করতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়ার এই ওয়েবসাইটগুলো ঠিক সেই মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতাকেই কাজে লাগিয়েছে। অর্থাৎ কেনাকাটার আনন্দটুকু পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু বিল দিতে হচ্ছে না।

তরুণদের কাছে কেন আকর্ষণীয়?

অনেকের কাছে ডোপামিন সাইট এক ধরনের ‘নিরাপদ বিকল্প’ হয়ে উঠেছে

দক্ষিণ কোরিয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইনফ্লুয়েন্সার সংস্কৃতি ও অনলাইন বিজ্ঞাপন তরুণদের মধ্যে নতুন কিছু কেনার আকাঙ্ক্ষাও বাড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু সবার পক্ষে নিয়মিত কেনাকাটা করা সম্ভব নয়।

ফলে অনেকের কাছে এসব সাইট এক ধরনের ‘নিরাপদ বিকল্প’ হয়ে উঠেছে। একজন ব্যবহারকারী মজা করে বলেছেন, ‘এটা অনলাইন শপিংয়ের কারাওকে—সব অনুভূতি আছে, কিন্তু কোনো আর্থিক ক্ষতি নেই।’

সত্যিই কি কেনাকাটার নেশা কমায়?

এ প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়। কিছু ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা হলো, হঠাৎ করে কিছু কিনে ফেলার প্রবণতা (ইমপালস বায়িং) কমাতে এসব সাইট সহায়ক হতে পারে। কেনার ইচ্ছা জাগলে অনেকেই বাস্তব ই-কমার্স সাইটে না গিয়ে এসব প্ল্যাটফর্মে সময় কাটান।

তবে সমালোচকেরা বলছেন, এতে হয়তো কেনাকাটার অভ্যাস কমছে না, বরং অন্যভাবে একই আচরণ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

আরেকটি বড় প্রশ্ন

ডোপামিন সাইটের ট্রেন্ড নিয়ে উদ্বেগও আছে

তবে এই ট্রেন্ড নিয়ে উদ্বেগও আছে। এসব ওয়েবসাইট কারা পরিচালনা করছে? ব্যবহারকারীদের তথ্য কীভাবে সংরক্ষণ বা ব্যবহার করা হচ্ছে?

এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। যদিও এখানে সত্যিকারের কেনাকাটা হয় না, তবু ব্যবহারকারীর ব্রাউজিং অভ্যাস, পছন্দ বা অন্যান্য তথ্য সংগ্রহের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বাংলাদেশেও জনপ্রিয় হতে পারে?

বাংলাদেশেও অনলাইন কেনাকাটা দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে

বাংলাদেশেও অনলাইন কেনাকাটা দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। একই সঙ্গে ফেসবুক, টিকটক ও বিভিন্ন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের বিজ্ঞাপন অনেককেই তাৎক্ষণিক কেনাকাটায় উৎসাহিত করে।

এ কারণে বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এ ধরনের ধারণা অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে এটি সত্যিই মানুষের অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা কমাতে সাহায্য করবে, নাকি শুধু সাময়িক মানসিক তৃপ্তি দেবে—তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

সূত্র: ইয়াহু ও মিটইনক