নতুন বছর মানেই শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা বদলানো নয়; বরং নিজেকে নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার একটি বড় সুযোগও বটে। নিজের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, মানসিক শান্তি, দক্ষতা অর্জন, সম্পর্ক এবং সময় ব্যবস্থাপনা—এ কয়েকটি দিকেই যদি একটু মনোযোগ দিতে পারেন, তাহলে ২০২৬–ই হতে পারে আপনার স্বপ্ন পূরণের বছর।

নতুন বছরে নতুনভাবে শুরু করার জন্য প্রথমে অতি প্রক্রিয়াজাত খাবার বাদ দিন। যেমন বার্গার, পিৎজা, হটডগ, ফ্রোজেন খাবার, চিপস, মিষ্টি, সফট ড্রিংকস, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, কেক, প্যাকেটজাত পেস্ট্রি ইত্যাদি। কারণ, শিল্পকারখানায় তৈরি এসব খাবারে কৃত্রিম উপাদান যুক্ত থাকে। এ ধরনের অতি প্রক্রিয়াজাত খাবার কলোরেক্টাল ক্যানসারসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। এগুলো একেবারেই পুরোপুরি বাদ দিতে না পারলে ধাপে ধাপে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করুন।
ফিট ও সুস্থ থাকতে নতুন বছরে একটি স্থিতিশীল ‘স্বাস্থ্য রুটিন’ মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, বছরে অন্তত তিনবার নিয়মিত চিকিৎসক দেখানোর পরিকল্পনা করতে পারেন। নিয়মিত চেকআপের মাধ্যমে আপনার স্বাস্থ্য ঠিক আছে কি না, সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাবেন।
এ জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করার প্রয়োজন নেই—এখন কয়েকটি সাধারণ টেস্টের মাধ্যমেও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত প্রাথমিক ধারণা নেওয়া সম্ভব। ফলে আপনার শারীরিক স্বাস্থ্য নিয়মিত নজরদারির মধ্যে থাকবে এবং সমস্যা সময়মতো চিহ্নিত করে সমাধান করা যাবে।
প্রতি মাসে অনেকেই ঠিক করেন এই মাসেই হাঁটা শুরু করবেন, কিন্তু পরিকল্পনা করা এবং তা বাস্তবায়ন করা সহজ হয় না। নতুন বছরে এই স্বাস্থ্যকর অভ্যাসটি শুরু করতে পারেন। আপনি নিশ্চয় জানেন, সুস্থ থাকতে হাঁটা কতটা জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট আব হেলথ অ্যান্ড হিউম্যান সার্ভিসেসের মতে, প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন যতটা সম্ভব শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা উচিত। গবেষণা দেখিয়েছে, নিয়মিত হাঁটা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। তাই বেশি বেশি হাঁটুন।
একজন মানুষের চলার জন্য একটা বাস্তবধর্মী বাজেট থাকা খুব দরকার। বাজেট মানে খরচ একেবারে বন্ধ করা নয়। বাজেট হলো কোন খাতে খরচ করবেন আর কোন খাতে কমাবেন। এটি আপনার সব খরচকে আয়ের মধ্যে রাখার চেষ্টা করবে।
চাইলে বাজেট অ্যাপ ব্যবহার করে আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখতে পারেন। বাজেট মেনে চললে মাসের শেষে হঠাৎ টাকার চাপ পড়ে না, অপ্রয়োজনীয় খরচ কমে, ধীরে ধীরে সঞ্চয়ের অভ্যাস তৈরি হয় এবং জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকা যায়।
আজকের দিনে ব্যস্ততার ভিড়ে বই পড়া যেন ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। অথচ বই–ই সেই নীরব বন্ধু, যে মানুষের বন্ধ দরজাগুলো খুলে দেয়, মেলে ধরে চিন্তা, কল্পনা আর জ্ঞানের জানালা। নতুন বছরে আমাদের ব্যস্ত জীবনের ফাঁকে বাসে, মেট্রোতে, কিংবা ছুটির দিনে—যখনই একটু সময় পাবেন, একটি বই তুলে নিন।
শারীরিকভাবে ফিট থাকতে এখন অতিরিক্ত টাকা খরচ করে জিমে ভর্তি হওয়ার কোনো দরকার নেই। এখন অনেক দক্ষ প্রশিক্ষকের বিনা মূল্যের ওয়ার্কআউট ভিডিও পাওয়া যায়। সেগুলো দেখে বাড়িতেই অনুসরণ করতে পারেন। জুম্বা ক্লাস থেকে শুরু করে ১৫ মিনিটের হালকা ফিটনেস ওয়ার্কআউট—সবই মিলবে ইউটিউবে।
অনেক চ্যানেলে এমনভাবে সাজানো প্রোগ্রাম থাকে, যা কয়েক সপ্তাহ ধরে খুব সহজেই অনুসরণ করা যায়। সেখান থেকে আপনার সময় ও সামর্থ্যের সঙ্গে মানানসই ওয়ার্কআউট ক্লাস বেছে নিতে পারেন। তবে যে ওয়ার্কআউটই করুন না কেন, নিয়মিত করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন বছরে নতুন কোনো স্কিল শেখার সুযোগ নিন। হতে পারে এটি আপনার একাডেমিক শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো দক্ষতা, আবার সম্পূর্ণ নতুন কোনো বিষয়ও হতে পারে। ধরুন, আপনি যদি অ্যাকাউন্টিংয়ের ছাত্র হন, তবু গ্রাফিক ডিজাইন বা এআই-সংক্রান্ত কোনো প্রিমিয়াম কোর্স শিখতে পারেন। কারণ, বর্তমান সময়ে ফ্রিল্যান্স ও মাল্টি স্কিলের গুরুত্ব বাংলাদেশেও দ্রুত বাড়ছে।
চাইলে নতুন কোনো ভাষা শিখতে পারেন, কিংবা আর্ট ও সৃজনশীল কোনো দক্ষতা রপ্ত করতে পারেন। কীভাবে ভালো কনটেন্ট তৈরি করা যায়, সেটিও এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অযথা সময় নষ্ট না করে ঘরে বসে শেখা এসব স্কিল ভবিষ্যতের জন্য আপনাকে আরও প্রস্তুত করে তুলবে।
সামাজিক মাধ্যম স্ক্রল, অপ্রয়োজনীয় ভিডিও দেখা বা বারবার নোটিফিকেশন চেক করাটা যেন আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এসবই নীরবে কেড়ে নিচ্ছে আমাদের মনোযোগ, ধৈর্য ও মানসিক প্রশান্তি। ফলে বাস্তব জীবনের সম্পর্কগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে, কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যায় এবং নিজের সঙ্গে নিজের যোগাযোগও হারিয়ে যেতে বসে।
ফোনকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব নয়, আর প্রয়োজনও নেই। তাই নতুন বছরে ফোন ব্যবহারে সচেতন হওয়া জরুরি। দিনের নির্দিষ্ট সময় ঠিক করে ফোন ব্যবহার করুন, অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন। ঘুমানোর আগে স্ক্রিন থেকে দূরে থাকার অভ্যাস গড়ে তুলুন। ফোনে সময় কমালে বই পড়া, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, শরীরচর্চা বা নতুন কোনো দক্ষতা শেখার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোযোগ দেওয়া অনেক সহজ হয়ে ওঠে।
নতুন বছরে নিজের মানসিক শান্তিকে অগ্রাধিকার দিন। জীবনে এমন কিছু সম্পর্ক থাকে, যা বাইরে থেকে বন্ধুতাপূর্ণ মনে হলেও ভেতরে-ভেতরে আপনাকে দুর্বল করে। যেসব বন্ধু সব সময় আপনাকে ছোট করে দেখে, আপনার সাফল্যে অস্বস্তি বোধ করে, নেতিবাচক কথা বলে মন ভেঙে দেয় বা বারবার অপরাধবোধে ভোগায়—সেসব সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসুন।
বিষাক্ত বন্ধুত্বের সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর দিক হলো, এটি আপনার আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে। আপনি নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করেন, নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিতে ভুলে যান। অনেক সময় শুধু ‘পুরোনো বন্ধুত্ব’ বা ‘লোক কী বলবে’ এসব ভেবে আমরা এমন সম্পর্ক আঁকড়ে ধরে থাকি, যা আমাদের মানসিকভাবে ক্লান্ত করে।
মনে রাখবেন, দূরত্ব তৈরি করাই অতিকেন্দ্রিকতা নয়, বরং আত্মরক্ষা। নতুন বছরে সাহস করে নিজের জন্য জায়গা তৈরি করুন। প্রয়োজনে সীমারেখা টানুন, যোগাযোগ কমিয়ে দিন, কিংবা ধীরে ধীরে সম্পর্ক থেকে সরে আসুন।
সূত্র: গুড হাউসকিপিং