দক্ষিণ কোরিয়ায় আমার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেডিআই স্কুলের রজতজয়ন্তী ছিল গত ডিসেম্বরে। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়েই প্রভাতশান্ত দেশটিতে যাওয়া। প্রথম দিনের কর্মসূচির শুরুতেই ছিল গিয়ংবোকগাং প্রাসাদ পরিদর্শন। কিন্তু আবহাওয়া বিট্রে করায় পরিকল্পনা বাতিল করতে হলো। দেশে থাকতেই শুনেছিলাম, নভেম্বরের শেষ থেকেই তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে ১০ ডিগ্রিতে চলে গেছে। ৩ ডিসেম্বর অনুভব করেছি সেটা মাইনাস ৫–এর আশপাশে ওঠানামা করছে। ডিসেম্বরের শুরুতে ঘন তুষারপাতও লক্ষ করলাম, যা আগে কখনো দেখিনি।
আবহাওয়ার খামখেয়ালির কারণে আমাদের পা বাড়াতে হলো ১২৩ তলার এক কংক্রিটচূড়ার দিকে। এটির নাম লটে টাওয়ার। ওখানে আগেও গিয়েছি। তখন ট্যুর গাইড জেনিফার জানিয়েছিল, লটে করপোরেশন কোরিয়ার শীর্ষস্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, যার নতুন কীর্তি এই টাওয়ার। ওই দিন কোরীয় বন্ধু কাং কিউ টেক ‘লটে’ নামের সূত্রটা ধরিয়ে দেয়। লটে নামটি নেওয়া হয়েছে জার্মান লেখক গ্যেটের উপন্যাস থেকে। জোহান উলফগ্যাং ভন গ্যেটের দ্য সরোস অব ইয়ং ওয়েরদার উপন্যাসের একটি চরিত্র এই লটে।
আজ যখন বৃষ্টি ও বরফভেজা পিচ্ছিল পথে হেঁটে হেঁটে ওই চূড়াটিকে নিশানা করে এগিয়ে যাচ্ছি, দেখি আমাদের তিন পথসঙ্গী সোইয়ং লিম, জাহিওন মুন, এমনকি ট্যুর গাইড মিস সুহিওন আন এই টাওয়ারের গোড়ার কথা কিছুই জানে না। ওরা ঘাঁটাঘাঁটি না করলেও নিজে ঘুঁটা দিয়ে দেখলাম, লটে করপোরেশনের প্রতিষ্ঠাতা শিন কিউক-হো ১৯৪০ সালে জাপানে পড়াশোনার সময় উপন্যাসটি পড়েন। সে সময় লটে নামটি কোম্পানির জন্য নির্বাচন করেন। তিনি উপন্যাসের চরিত্র শার্লট-এর অপভ্রংশ থেকে লট বা ‘লটে’ বেছে নিয়েছিলেন।
কোম্পানিটি শুরুতে যে চুইংগামের বাণিজ্য করত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকার সৈন্যরা তা পূর্ব এশিয়ায় চালু করে, যা মূলত জাপানি ভোক্তাদের মধ্যেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। কোম্পানিটি পরে বাজারে চকলেট আনে। তারপর প্রতিষ্ঠা করে লটে কনফেকশনারি, যাতে দেদার বিক্রি হতো মিষ্টিদ্রব্য। লটের পণ্য এখন বাংলাদেশেও সহজলভ্য।
২০১৭ সালে যখন লটে টাওয়ারে যাই, তার আট মাস আগে এটি চালু হয়েছে। কোরীয়রা আমাদের কাছে খুব বলাবলি করছিল, জানো, এটা পৃথিবীর ষষ্ঠতম উঁচু ভবন। তার মানে, আমাদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল সিউল টাওয়ার এর কাছে এখন নস্যি। যেমন নস্যি টোকিও টাওয়ার জাপানের স্কাই ট্রির তুলনায়। তবে স্কাই ট্রির চেয়ে লটে টাওয়ার ১৫৮ দশমিক ৮ মিটার বেশি উঁচু। এসব টাওয়ার সাধারণত বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত হয়। প্রচুর বিদেশির পদচারণেও যা মুখরিত হয়ে ওঠে। আমাদের দলে আট দেশের ১১ জন মানুষ।
লটে টাওয়ার তির্যক ও লম্বা লন্ঠন আকৃতির এক ভবন। এতে নানা সুবিধা আছে। যেমন ১১৮ তলায় স্কাই ফ্রেন্ডলি ক্যাফে, ১১৯ তলায় ফটো জোন, ১২২ তলায় সিউল স্কাই ক্যাফে, ১২৩ তলায় লাউঞ্জ ও প্রিমিয়াম বার। পৃথিবীর অন্যান্য টাওয়ারের মতোই এতে আছে টেলিস্কোপে শহর ও পার্শ্ববর্তী দেশ পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা। থাকা–খাওয়ার ব্যবস্থাও আছে। টাওয়ারের ৪২ এবং ৭১ তলায় রয়েছে আবাসিক সুবিধা। ৭৬ ও ১০১ তলায় হোটেল। কনসার্ট হলসহ শিশু ও যুবা-কিশোরদের বিনোদনের হাজারো ব্যবস্থা চোখে পড়ল। লটে টাওয়ার ও নিউইয়র্কের ওয়ান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের মধ্যে এক কারিগরি সেবা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তাই দুটি স্থাপনা কাছাকাছি সময়েই চালু হয়।
বর্তমান ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে একটি বিষয় উল্লেখ করলে অপ্রাসঙ্গিক হবে না। কারণ, একজন রুশ ও একজন ইউক্রেনীয়র একই অপরাধে একযোগে শাস্তি হয়েছিল। যাঁরা উঁচু ভবনের চূড়ায় উঠে শহরের আলোকচিত্র নেন, তাঁদের বলে আরবান এক্সপ্লোরার। ২০১৬ সালে বিনা অনুমতিতে রাশিয়ার ভাদিম মাখোরভ এবং ইউক্রেনের ভিটালি রাসকারভ নির্মাণাধীন টাওয়ার চূড়ায় উঠেছিল। ভাদিমের অবলম্বন ছিল সিঁড়ি আর ভিটালির একটি অত্যাধুনিক ক্রেন। ব্যাপক প্রচার পায় তাদের টাওয়ার আরোহণের ভিডিও, বিশ্বব্যাপী ভিউ হয় ৩ মিলিয়নের বেশি। টাওয়ার কর্তৃপক্ষ এই দুজনের ‘কীর্তি’–সংবলিত ছবিসহ পোস্টার প্রকাশ করে, দুজনকেই এ স্থাপনায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
লিফটে উঠে টাওয়ারটির ১১৮ তলার কাচের পাটাতনে দাঁড়িয়ে খাড়া নিচে তাকিয়ে আমরা যুগপৎ শিহরিত ও ভীত হয়েছিলাম। আর শহরের প্যানোরামা ও আকাশ পর্যবেক্ষণ করে হয়েছিলাম রোমাঞ্চিত, ব্যক্তিগতভাবে অনুধাবন করেছিলাম একটি উপন্যাসের চরিত্রের মাহাত্ম্য ও বিশালতা।