দেশের সবচেয়ে বড় গ্রামের বড় জলাবন লক্ষ্মীবাঁওড়ে এক দিন

অনেক দিনের শখ ছিল, দেশের সবচেয়ে বড় গ্রাম হবিগঞ্জের বানিয়াচং থেকে ঘুরে আসি। সাধারণত যেখানে কয়েকটি পাড়া মিলে হয় একটি গ্রাম আর কয়েকটি গ্রাম মিলে হয় একটি ইউনিয়ন; সেখানে এই একটি গ্রামকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে চারটি ইউনিয়ন। এই গ্রামেই আছে আয়তনে সি‌লেটের বিখ্যাত রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্টের চেয়েও বড় লক্ষ্মীবাঁওড় জলাবন। খড়তি নদের দক্ষিণে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে অবস্থিত মিঠাপানির প্রাকৃতিক এই জলাবন লক্ষ্মীবাঁওড় নামে পরিচিত হলেও স্থানীয় লোকজনের কাছে তা ‘খড়তির জঙ্গল’ নামেও পরিচিত। এই গ্রামে আরও আছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কমলা রানির দিঘি, ধ্বংসপ্রায় রাজপ্রাসাদসহ আরও কত কী! তাই আর ভাবাভাবি নয়, বেরিয়ে পড়লাম মেঘমেদুর এক শুক্রবারে।

পানিতে ডোবা হিজল, করচের গাছ
জলাবন লক্ষ্মীবাঁওড়ে এক দিন

যাত্রা যেভাবে শুরু

আমার সঙ্গী ছিলেন দুজন—কায়সার আহমেদ ও সাজেদুর রহমান। হবিগঞ্জের আউশকান্দি থেকে প্রথমে যাই নবীগঞ্জ। সেখান থেকে জনপ্রতি ৬০ টাকা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চেপে দুই পাশের মুগ্ধ করা দৃশ্য দেখতে দেখতে গিয়ে নামি বানিয়াচং বড় বাজারে। স্থানীয় লোকজন অবশ্য ‘বাইন্নাচং’ নামেই ডাকে।

বড় বাজারে নেমে হালকা নাশতা সেরে আবারও অটোরিকশায় চেপে যাই আদর্শ বাজারে। বাজার–সংলগ্ন নৌঘাট। ঘাটে অনেক নৌকা বাঁধা। দর–কষাকষি করে নৌকাও ঠিক করে নিলাম।

নৌকা চলল লক্ষ্মীবাঁওড়ের দিকে

নৌকায় আমাদের সঙ্গে যুক্ত হলেন কয়েকজন যাত্রী। বর্ষার পানিতে ভাসমান এক দ্বীপের মতো গ্রামের বাসিন্দা তাঁরা। যাত্রীদের একজনের হাতে হাওরের টাটকা ছোট মাছ, কেজি মাত্র ৫০ টাকায় কেনা। মাছের প্রাচুর্য বলে দামটাও হাতের নাগালে।

নৌকায় উঠতেই নামল ঝুমবৃষ্টি। হাতের ছাতা মেলতেই হলো। ক্রমেই বৃষ্টির বেগ বাড়ছে। পানিতে পড়া বৃষ্টির শব্দ নৌকার ইঞ্জিনের শব্দকেও যেন হার মানাচ্ছে!

আমাদের নৌকার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভেসে চলছে একঝাঁক পাতিহাঁস। কিছুদূর যেতেই চোখে পড়ল থই থই পানি। কিছুদিন আগেও যেখানে ছিল ফসলের মাঠ, সেখানে এখন গলাসমান পানি। সেই পানিতে ভাসছে লাল ও সাদা শাপলার পাতা। কোথাও শাপলার কলি আবার কোথাও শাপলার ফল, যাকে আমরা বলি ঢ্যাপ।

পানিতে ডোবা লক্ষ্মীবাঁওড় জলাবনের গাছগাছালি

আমরা হাত বাড়িয়ে ঢ্যাপ ধরার প্রতিযোগিতায় নামলাম। আমাদের চেয়ে দক্ষ মাঝি ভাই এগিয়ে গেলেন এই যাত্রায়। চলতে চলতে শাপলা ফুলের একটি কলি তুলে নিই। কলি তুলতে গিয়ে দেখি, কলির কাণ্ড এমনই লম্বা যে উচ্চতায় আমাদেরও ছাড়িয়ে যায়। শাপলার সঙ্গে পানিতে ডুবে ডুবে ঢেউয়ের তালে নাচছে পাতাশ্যাওলা।

মাঝেমধ্যে কচুরিপানার প্রাচীর এতটাই বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে যে ইঞ্জিনচালিত নৌকার গতিও কমে যাচ্ছিল। মাঝি ভাই তখন বাঁশের লগি দিয়ে কচুরিপানা সরানোর চেষ্টা করে পথ বেছে নেন।

হাওরের রূপ

হাওরের বুক চিরে নৌকা ধীরে ধীরে লক্ষ্মীবাঁওড় জলাবনের গভীরে প্রবেশ করতে শুরু করল। জলাবনের দুই পাশে পানির ওপর দাঁড়িয়ে আছে হলুদ রঙের দুই ফটক। বছরের ছয় মাস পানি থাকে, বাকি ছয় মাস শুকনো। এই শুকনো মৌসুমে পর্যটকেরা এখানে আসে পানির নিচে ডুবে থাকা পিচঢালা পথ ধরে। মোটরসাইকেল কিংবা অটোরিকশায় চেপে।

ভেতরে প্রবেশ করতেই চারপাশের পরিবেশ একমুহূর্তেই বদলে গেল। পানির ওপর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা হিজল ও করচগাছের সারি, ভেসে থাকা গাছের অদ্ভুত সব ডালপালা আর শিকড়। আর বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কলকাকলিতে পুরো এলাকা যেন এক মায়াপুর।

হিজলের গাছে থোকা থোকা ফুল যেমন আছে, সঙ্গে আছে ফল। পানিতে ছেয়ে আছে লাল হিজলের ফুল। কিছু গাছে ধরেছে এমন ফল, দেখে মনে হয় যেন আতা ঝুলছে গাছে।

হাওড়ের শুরু

গাছের গোড়ায় নৌকা ভিড়িয়ে আমরা কিছু ছবি তুলে নিলাম। চারপাশ ঘুরেফিরে দেখে জলাবনে আসতে এবং ফিরতে প্রায় দুই ঘণ্টার মামলা। তাই এক জায়গায় বেশিক্ষণ না দাঁড়িয়ে আমরা আবার ভিন্ন এক পথে ফেরার পথ ধরলাম।

সদ্য তোলা ঢ্যাপ খাচ্ছি। দুই রকমের ঢ্যাপ—সাদা শাপলার ঢ্যাপের ভেতরের অংশ ধূসর আর লাল শাপলার লাল। তবে খেতে গিয়ে টের পেলাম, লাল শাপলার ঢ্যাপ কিছুটা তিতকুটে। আর এ কারণেই কিনা সবজি হিসেবে বাজারে লাল শাপলার চেয়ে সাদা শাপলার কদর বেশি।

ফিরতি পথে পানিতে ভাসা জেলেদের মাচাঘর, চারপাশের পানিঘেরা দ্বীপের মতো জেগে থাকা গ্রাম আর গ্রামের ফিরতি পথ ধরা স্থানীয় মানুষের নৌকায় ছুটে চলা চোখে পড়ে।

গোবিন্দ সিংহের রাজবাড়ি

লক্ষ্মীবাঁওড় থেকে ফিরেই পা বাড়াই রাজবাড়ির দিকে। রাজবাড়ির ফটক পেরিয়ে ঢুকতেই সবুজ মাঠ। মাঠের পাশে সারি সারি ফুল আর দেবদারুগাছ। মাঠের শেষ মাথায় রাজবাড়ির দাঁড়িয়ে থাকা দেয়ালগুলো।

রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ

দেওয়ান রাজ বংশের বহু স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই রাজবাড়ির প্রাঙ্গণে। চোখের সামনে রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ। ইটের গাঁথুনির পুরু দেয়াল আর সেই দেয়ালে ছোট ছোট খুপরি। দেয়াল আঁকড়ে ধরে আছে সবুজ বটবৃক্ষ। রাজবাড়ির এক অংশে ছনের ছাউনিতে ছাওয়া কুঁড়েঘর, যা একসময়ে ব্যবহৃত হতো রাজার সালিস ঘর হিসেবে। এখন অবশ্য ক্লাবঘরের নাম ঝুলছে দেয়ালে। সামনে শানবাঁধানো বিশাল পুকুর, যা দেওয়ানদিঘি নামে পরিচিত।

ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এই রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন তৎকালীন বানিয়াচং রাজা গোবিন্দ সিংহ ওরফে হাবিব খান। সম্রাট আওরঙ্গজেবের দিল্লি দরবারে ধর্মান্তরিত হয়ে গোবিন্দ সিংহের নতুন নাম রাখা হয় হাবিব খান। সেই হাবিব খানের বংশধর আনোয়ার খান বাংলার বারো ভূঁইয়াদের একজন হয়ে লড়েছিলেন মোগল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে।

কমলা রানির দিঘি

রাজবাড়ি দেখার মুগ্ধতা নিয়ে আমরা রওনা হলাম বানিয়াচংয়ের অন্যতম আকর্ষণ কমলা রানির দিঘির দিকে। সাগরের মতো বিশাল বলে স্থানীয় লোকজন একে ‘সাগর দিঘি’ নামেই বেশি ডাকে।

প্রায় ৬৬ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই বিশাল দিঘি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দিঘি। সামন্ত রাজা পদ্মনাভ প্রজাদের পানির কষ্ট দূর করতে এটি খনন করেছিলেন।

এই দিঘির পাড়ে বসেই পল্লী কবি জসীমউদ্‌দীন ‘রাণী কমলাবতীর দিঘি’ নামে কবিতা লিখেছিলেন। কবিতাটি তাঁর ‘সূচয়নী’ কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত। যার শুরুটা এমন—

‘কমলা রাণীর দীঘি ছিল এইখানে,

ছোট ঢেউগুলি গলাগলি ধরি ছুটিত তটের পানে।

আধেক কলসী জলেতে ডুবায়ে পল্লী-বধূর দল,

কমলা রাণীর কাহিনী স্মরিতে আঁখি হত ছল ছল।’

এই দিঘি ঘিরে জড়িয়ে আছে রানি কমলা দেবীর আত্মত্যাগের এক করুণ লোকগাথা। লোককাহিনিটি অনেকটা এমন—প্রজাদের পানির কষ্ট দূর করতে দিঘি তো খনন করলেন রাজা। কিন্তু দিঘিতে পানি উঠছে না দেখে রাজা দুশ্চিন্তায় পড়েন। রাজা স্বপ্নে দেখেন, দিঘিতে কমলাবতী আত্মদান করলেই কেবল তাতে পানি উঠবে।

এটা কেউ মেনে না নিলেও প্রজাদের পানির চাহিদার কথা চিন্তা করে রানি কমলাবতী নিজেই সিদ্ধান্ত নেন, তিনি আত্মাহুতি দেবেন এবং সত্যি সত্যিই একদিন সুসজ্জিত হয়ে রানি দিঘিতে নামতে পা বাড়ান।

রাজবাড়ির দেওয়ান দিঘি

রানি যত এগোন তত পানি বাড়তে থাকে। একসময় রানি কমলাবতীর পুরো শরীরই পানিতে তলিয়ে যায়। আত্মদানের এই লোককাহিনির কারণেই সাগর দিঘিকে অনেকে কমলা রানির দিঘি নামে জানেন।

দিঘির ঘাটে আছি আমরা, সন্ধ্যা নামছে আর তার সঙ্গে বৃষ্টি তো আছেই। দিঘির ঘাটের ওপরের টিনের ছাউনিতে বৃষ্টির শব্দ আর দিঘির পানিতে পড়া বৃষ্টির শব্দ মিলে একাকার। বৃষ্টির ছাঁটের সঙ্গে হিমেল বাতাস ধেয়ে এসে ভ্রমণের সব ক্লান্তি দূর করে দিল একনিমেষে।

কখন যাবেন

রাজবাড়ি দেখতে চাইলে শুক্র ও শনিবার সবচেয়ে ভালো। এই দুটি দিন বিনা টিকিটে রাজবাড়ি সবার জন্য উন্মুক্ত। বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা। আর লক্ষ্মীবাঁওড় যেতে চাইলে যান শীতে, পানি শুকিয়ে যাওয়ার আগেই।

যেভাবে যাবেন

ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে বাসযোগে প্রথমেই আসুন হবিগঞ্জ। ট্রে‌নে আসতে চাইলে শায়েস্তাগঞ্জ রেলস্টেশনে নেমে হবিগঞ্জ আসুন। হবিগঞ্জ থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চেপে আসতে পারেন যে কেউ। বানিয়াচংয়ে খাবারের দোকান থাকলেও থাকার জন্য আবাসিক হোটেল নেই। তাই থাকতে হলে সারা দিনের বানিয়াচং ভ্রমণ শেষে ফিরে আসুন হবিগঞ্জ শহরে।