
রোমাঞ্চের খোঁজে গত বর্ষায় দুর্গম পাহাড়ে গিয়েছিলেন ছয় বন্ধু। টানা ১২ দিন বৃষ্টি, পাহাড়, ঝিরি আর বিচ্ছিন্ন পাহাড়ি পাড়ায় কাটানো সেই অভিযানের গল্পই শুনিয়েছেন অভিযাত্রী তারেক ইবনে আলম
সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা ছিল না, শুধু একটি ইচ্ছা ছিল—বর্ষার পাহাড়ে টানা কয়েকটা দিন কাটাব। বুনো ট্রেইল, পাহাড়ি ঝিরি, দুর্গম ঝরনা আর প্রত্যন্ত পাহাড়ি পাড়ার জীবন কাছ থেকে দেখব।
সকালে আলীকদমে পৌঁছাই। নাশতা সেরে চান্দের গাড়িতে আলীকদম-থানচি সড়কের ২১ কিলোমিটার পয়েন্টে নেমে শুরু হয় ট্রেকিং। পাহাড়ি চড়াই-উতরাই আর পিচ্ছিল ঝিরিপথে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা হাঁটার পর পৌঁছাই খুমি জনগোষ্ঠীর মাংলুং হেডম্যানপাড়ায়। আরও সামনে গিয়ে রাত কাটানোর ইচ্ছা ছিল। কিন্তু অতিবৃষ্টিতে হঠাৎ পাহাড়ি ঢল নামায় বাধ্য হয়ে পাড়ার স্কুলেই আশ্রয় নিতে হয়।
পরদিন ভোরে পাড়ার কার্বারির ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে আবার হাঁটা শুরু করি। খোলে ঝিরি ধরে এগোতে এগোতেই চোখে পড়ে ছোট্ট বুনো খোলে ঝরনা। ঝরনার পাশে বসেই মুড়ি-চানাচুর মেখে দুপুরের খাবার সারি। একটু চা খেয়ে আবার পথচলা। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে ভেজা ট্রেইল জোঁকে ভরা। খোলে ঝিরি, তিন্দু ঝিরি আর সেংসাং ঝিরি পেরিয়ে বিকেল চারটার দিকে পৌঁছাই পারিং পাড়া।
পারিং পাড়ার এক পাশে চিম্বুক পর্বতশ্রেণির কির্সতংয়ের সবুজ বিস্তার, অন্য পাশে বয়ে চলেছে মেনও ঝিরি। বর্ষার স্রোতে ঝিরির জল যেন অবিরাম গান গেয়ে ছুটে চলেছে। চারদিকে মেঘ, কুয়াশা আর বিরামহীন বৃষ্টি।
সাতটি পরিবারের ছোট্ট এই পাড়ায় গিয়ে জানতে চাইলাম, রাতটা থাকা যাবে কি না। এক দিদি হাসিমুখে তাঁর ঘরে জায়গা করে দিলেন। তাঁর স্বামীও আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করলেন।
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী মাচাংঘরের একটি বড় কক্ষে অতিথিদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। ভেতরের ছোট কক্ষগুলো পরিবারের ব্যক্তিগত জায়গা। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, সেখানে বাইরের মানুষের প্রবেশে ঘর অপবিত্র হয়ে যায়। তাই পর্যটকদের প্রবেশ নিষেধ। থাকার জন্য আমরা জনপ্রতি দৈনিক ২০০ টাকা করে দিয়েছিলাম।
বৃষ্টি তখনো থামেনি। বিশ্রাম নিয়ে রান্নার প্রস্তুতি শুরু করলাম। পেঁয়াজ, রসুন, লবণ, হলুদ, মরিচ, মসলাসহ প্রায় সব উপকরণই সঙ্গে ছিল। স্থানীয় পাড়া থেকে কিনলাম চাল আর একটি দেশি মোরগ। চাল ১০০ টাকা কেজি, আর প্রায় পৌনে তিন কেজি ওজনের মোরগটির দাম এক হাজার টাকা। বাড়তি চমক ছিল দিদির দেওয়া তাজা বাঁশকোঁড়ল। সেই বাঁশকোঁড়ল, মোরগের মাংস আর ডাল দিয়েই তৈরি হলো রাতের ভোজ।
বর্ষাকাল বলে তাঁবু নেওয়া হয়নি। ছিল শুধু স্লিপিং ব্যাগ আর ছোট্ট পোর্টেবল বালিশ। মাচাংঘরের কাঠের মেঝেতে রাত কাটালাম। স্থানীয়দের ঘরে তোশক-বালিশের ব্যবহার প্রায় নেই। অনেকেই কাঠের গুঁড়িকেই বালিশ হিসেবে ব্যবহার করে।
পরদিন সকালে স্থানীয় তিনজনকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম কাছের ওইসাও ও তেমথুমু ঝরনা দেখতে। শুকনো মৌসুমে দেড় ঘণ্টার পথ হলেও বর্ষায় সেই পথ অনেক বেশি কঠিন। ঝিরির পানি তখন ভয়ংকর স্রোতস্বিনী। তাই কখনো পাহাড়ের গা ঘেঁষে, কখনো নিজেরাই পথ তৈরি করে এগোতে হয়েছে। বিকেলে আবার ফিরে এলাম পারিং পাড়ায়।
টানা বৃষ্টিতে আশপাশের সব পথ পানিতে তলিয়ে গেল। শুরু হলো অপেক্ষার দিন। তৃতীয় দিন পাড়া ছাড়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলাম। স্থানীয় গাইড জানালেন, এ অবস্থায় নদী-ঝিরি পার হওয়া বিপজ্জনক। ফলে টানা চার দিন আটকে থাকতে হলো পারিং পাড়ায়।
তবে আটকে পড়াও অনন্য অভিজ্ঞতা। কখনো ঝুম বৃষ্টি, কখনো টিপটিপ। বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। সময় কাটতে থাকল পাড়ার মানুষের সঙ্গে গল্প করে, জুমখেতে বসে কিংবা মাচাংঘরের বারান্দায় বৃষ্টির শব্দ শুনে।
গল্প করতে করতেই তাঁদের কাছ থেকে আশপাশের পাহাড়, ঝরনা আর দুর্গম পথের নানা তথ্য জেনেছি। কির্সতং হয়ে বের হওয়ার পথ, শীতকালের ট্রেকিং রুট—এসব নিয়েই চলত আলোচনা।
পঞ্চম দিনের সকালে অবশেষে বৃষ্টি কিছুটা কমল। এবার গন্তব্য বাংলাদেশের অন্যতম উঁচু জলপ্রপাত—লাংলোক ঝরনা।