শ্রীলঙ্কার মানচিত্রের প্রান্তঘেঁষা উপকূলীয় সড়ক ধরে পুরো দেশটা একবার চক্কর দেবেন তহুরা সুলতানা
শ্রীলঙ্কার মানচিত্রের প্রান্তঘেঁষা উপকূলীয় সড়ক ধরে পুরো দেশটা একবার চক্কর দেবেন তহুরা সুলতানা

ঢাকার রাস্তা পার হতে ভয় পাওয়া মেয়েটা সাইকেলে ঘুরছেন পুরো শ্রীলঙ্কা

একসঙ্গেই শুরু হয়েছিল এপি তালুকদার আর তহুরা সুলতানার সাইকেলে শ্রীলঙ্কা অভিযান। কিন্তু মাঝপথে আলাদা হয়ে যায় এই দুই বাংলাদেশি তরুণীর যাত্রা। এক হাজার কিলোমিটারের বেশি সাইকেল চালিয়ে দেশে ফিরেছেন একজন। অন্যজন এখনো সাইকেলে প্রদক্ষিণ করছেন পুরো শ্রীলঙ্কা। দুজনের পথচলার গল্প শুনেছেন সজীব মিয়া। এখানে তহুরা সুলতানার অভিজ্ঞতা।

নাচ্চিকুদায় থাকার জায়গা বলতে মাত্র একটি ছোট্ট হোমস্টে। রাতটা সেখানেই কাটিয়েছি। ভোর হতেই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। দিনের শুরুটাকে সুন্দর করে তুলল প্রকৃতি।

চারপাশে পাহাড় আর বন। বনভূমির ফাঁক গলে ধীরে ধীরে উঁকি দিল সূর্য। ভোরের নরম আলো পুরো পথটাকে অন্য রকম এক আবহ এনে দিল। রাস্তাটাও ছিল একেবারে ফাঁকা। প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে এগিয়ে চললাম।

আজ ২৯ জুলাই, শ্রীলঙ্কা সাইকেল অভিযানের ১৪তম দিন। লক্ষ্য মুলানকাভিল প্রদেশ হয়ে মান্নার। তবে মাঝে কোথাও থেমেও যেতে পারি। কারণ, প্রতিদিন কত কিলোমিটার সাইকেল চালাব, এমন কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য আমার নেই। কোথায় নিরাপদে রাত কাটানো যাবে, সেটা দেখেই এগোই। অনেক সময় এমন হয়, পরবর্তী হোমস্টে ১০০ কিলোমিটার, তার আগে থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। তখন বাধ্য হয়েই পথটুকু পাড়ি দিতে হয়।

পথে একটি সেনা ক্যাম্প চোখে পড়ল। ক্যাম্পের চারপাশে ফুটে আছে বাগানবিলাস। সবুজের মধ্যে রঙিন ফুল, তার ওপর ভোরের সোনালি আলো। এই শান্ত সৌন্দর্য দিনের শুরুটাকে আমার এই অভিযানের অন্যতম সুন্দর একটি সকাল করে তুলল।

দুপুরের খাবারে প্রায় এক সপ্তাহ আগে কেনা আপেলই ভরসা!

শুরু থেকে এই পথের একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল খাবার। রাস্তায় খুব বেশি দোকানপাট নেই। আর যেগুলো আছে, সেখানেও প্রয়োজনীয় খাবার সব সময় পাওয়া যায় না। তাই প্রতিদিনের জন্য আগেভাগেই আপেল, বান, খেজুর, চকলেটসহ কিছু শুকনো খাবার ব্যাগে ভরে রাখি। আপেলও এখানে সব জায়গায় পাওয়া যায় না। প্রায় এক সপ্তাহ আগে কয়েকটি আপেল কিনে রেখেছিলাম। প্রতিদিন একটি করে খাই। মধ্য দুপুরে আজও শক্তির জোগান দিল সেই আপেল আর ব্যাগে রাখা খাবার।

একা চলছি

সঙ্গী থাকলে পথচলাটা অনেক সহজ হয়ে যায়। প্রথম চার দিন আমার সঙ্গে ছিলেন এপি (তালুকদার) আপু। কিন্তু তাঁর ছুটি কম থাকায় আমরা আলাদা হয়ে যাই। একা হয়ে যাওয়ার আরেকটি কারণ, আমার হারিয়ে যাওয়া লাগেজ। শ্রীলঙ্কায় আসার সময় ফ্লাইটে সেটি হারিয়ে যায়। তাই আমাকে আবার কলম্বো ফিরে গিয়ে লাগেজ সংগ্রহ করতে হয়। এরপর নতুন করে যাত্রা শুরু করি। আমার লক্ষ্য শ্রীলঙ্কার মানচিত্রের প্রান্তঘেঁষা উপকূলীয় সড়ক ধরে পুরো দেশটা একবার চক্কর দেওয়া। সব মিলিয়ে এই পথের দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটারের বেশি।

তহুরা সুলতানার সেলফিতে এপি তালুকদার

তার মধ্যে গত ১০ দিনে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়েছি। সত্যি কথা বলতে, আমি ঢাকার মতো বড় শহরে খুব ভয় পাই। এত বেশি যানজট আর মানুষের ভিড় আমাকে সব সময় অস্বস্তিতে ফেলে। এমনও হয়েছে, রাস্তা পার হওয়ার জন্য ৫–১০ মিনিট দাঁড়িয়ে থেকেছি। সব গাড়ি চলে গিয়ে রাস্তা একেবারে ফাঁকা না হওয়া পর্যন্ত পার হওয়ার সাহস পাইনি। কখনো কখনো কাছেই রাস্তা পার হওয়ার সুযোগ থাকলেও অনেকটা পথ হেঁটে পদচারী–সেতু খুঁজে তারপর রাস্তা পার হয়েছি। আমি আসলে শহরের ব্যস্ত ট্রাফিকের ব্যাপারে ভীষণ ভিতু একজন মানুষ।

সেই আমিই এখন একা সাইকেল চালিয়ে পুরো শ্রীলঙ্কা ঘুরছি। বিষয়টা এখনো আমার নিজের কাছেই অবিশ্বাস্য লাগে। হয়তো এটা সম্ভব হয়েছে এখানকার সড়কব্যবস্থা আর মানুষের কারণে। শ্রীলঙ্কার চালকেরা ধৈর্যশীল ও ভদ্র। অনেক সময় প্রবল বাতাসে সাইকেলের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলি। তখনো দেখি পেছনের গাড়িগুলো ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছে। কেউ অযথা হর্ন দেয় না, চাপও সৃষ্টি করে না।

একজন নারী হিসেবে এত দিনের যাত্রায় নিজেকে নিরাপদই মনে হয়েছে। আমি শুধু জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলো ঘুরছি না; বরং এমন অনেক প্রত্যন্ত এলাকায় যাচ্ছি, যেখানে সাধারণ পর্যটকদের খুব একটা দেখা মেলে না। বেশির ভাগ সময় স্থানীয় মানুষের পরিচালিত হোমস্টেতে থাকছি। আর সেখানেই সবচেয়ে বেশি অনুভব করেছি এই দেশের মানুষের আন্তরিকতা।

অনেক দিন পর যেন ঘরের খাবারের স্বাদ

লাল চালের ভাত

দুপুর গড়িয়ে এসেছে। মান্নার শহর প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে। গুগল ম্যাপে একটি অর্গানিক ফার্মের খোঁজ পেলাম। কয়েকজন সাইকেল ভ্রমণকারী দারুণ রিভিউ দিয়েছে দেখি। রিভিউ পড়ে আর লোভ সামলাতে পারলাম না। ফার্মের মালিকের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করলাম। কথা বলেই মনে হলো, মানুষটি ভীষণ আন্তরিক। সিদ্ধান্ত বদলে মান্নার শহরে না গিয়ে সেখানেই এক রাত থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম।

বিকেলে পৌঁছে বুঝলাম, সিদ্ধান্ত ভুল ছিল না। রুমে ওঠার আগেই ফার্মের মালিক পুরো জায়গাটা ঘুরিয়ে দেখালেন। কীভাবে গরুর গোবর থেকে বায়োগ্যাস তৈরি হয়, কীভাবে জৈব পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদন করা হয়, কীভাবে নিজেরাই সেই খাবার খান এবং উদ্বৃত্ত অংশ বাজারে সরবরাহ করেন—সবকিছুই আগ্রহ নিয়ে দেখালেন।

এরপর তাঁর সঙ্গে খাবার খাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন। অনেক দিন পর যেন ঘরের খাবারের স্বাদ পেলাম। ছিল লাল চালের ভাত, চিংড়ি মাছ, স্থানীয় একটি শাক দিয়ে রান্না করা পদ, দইসহ আরও কয়েকটি পদ। আগের দুই দিন জাফনা ও মুলানকাভিল এলাকায় শুধু পরোটা আর দোসা খেয়েই দিন কাটাতে হয়েছিল। দুই দিন পর ভাত খেয়ে মনে হলো, শরীরের সঙ্গে মনও যেন তৃপ্ত হলো।

এই অর্গানিক ফার্মেই সন্ধ্যা নামল।

কাল আবার শুরু হবে পথচলা।