পাঁচ মাসের জন্য গড়ে উঠেছে এই পল্লি, বাসিন্দাদের ঘিরেই বসেছে ‘নিউমার্কেট’

মাছ ধরতে দুবলার চরে এখন হাজারো জেলে। সাগরকোলের বিচ্ছিন্ন দ্বীপে তাঁরা গড়ে তুলেছেন শুঁটকিপল্লি। তাঁদের ঘিরে বসেছে বাজার, এসেছেন ডাক্তার আর নাপিত। এর মাঝেই রাস উৎসবে যোগ দিতে জড়ো হয়েছিলেন পুণ্যার্থীরা। সব মিলিয়ে বহু মানুষের পদচারণে মুখর এখন দুবলার চর। কিন্তু মাস পাঁচেক পরই ঘরে ফিরে যাবেন তাঁদের সবাই, দ্বীপটি হয়ে পড়বে জনশূন্য, নির্জন। রাসের মাঝেই দুবলার চর ঘুরে এলেন সজীব মিয়া

ভাটার সময় আলোরকোলে নোঙর করা পূণ্যার্থীদের নৌকা
ছবি: সজীব মিয়া

ভাটায় সৈকত প্রশস্ত হয়ে জেগে উঠেছে। দুবলার চরের আলোরকোলে নোঙর করে আমাদের ট্রলার। বছর তিনেক আগে রাস উৎসবে সবার অংশগ্রহণ ছিল। এখন বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে শুধু পুণ্যার্থীরা আসতে পারেন। আমি এসেছি পেশাগত পরিচয় দিয়ে একদল পুণ্যার্থীর ট্রলারে চেপে। তীর ধরে পুণ্যার্থীদের অনেক নৌকা এখানে আগেই নোঙর করছে। যাঁরা আগে এসেছেন, তাঁদের অনেকে মুঠোজাল হাতে সাগরে নেমে পড়েছেন। শখ করে মাছ ধরছেন। অনেকে সৈকতে ফুটবল খেলছেন। একটা নৌকা বালুর মধ্যে আটকে পড়ে আছে। সেই নৌকা থেকে দ্রুম দ্রুম করে গান বাজছে—হালকা মেরেছি হায় লাল পান...

মাছ শুকাতে দিচ্ছেন দুজন

নির্জন সৈকতেও শব্দ বোমা! কান ঝালাপালা হওয়ার আগেই ট্রলার থেকে নেমে পড়ি। দ্বীপের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে হাঁটার বিকল্প নেই। আমরাও হাঁটতে থাকি। সামনে এগিয়ে যেতেই শুঁটকিপল্লির শুরু। বাঁশ দিয়ে জেলে মহাজনদের (স্থানীয় লোকজন বলেন বহরদার) সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে হোগলার চাটাইয়ের চালে খড় বিছিয়ে তোলা হয়েছে অস্থায়ী ঘর। সীমানার এক কোণে এসব ঘরকে কেন্দ্র করে শ্রমিকেরা ব্যস্ত মাছ কাটায়, মাছ শুকানোয়। কয়েক দিন আগে ঘূর্ণিঝড় মিধিলির কারণে দুবলার চরের অনেক মাছ পচে নষ্ট হয়ে গেছে। এখন এসব মাছ থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। কাঁচা শুঁটকির সেই উৎকট গন্ধে গা গুলিয়ে আসে। নাক চেপে এ-গলি, ও-গলি ঘুরতে ঘুরতে থাকি। এক কিশোর শ্রমিক কুয়া থেকে পানি তুলছিল। চারপাশের লবণাক্ত পানির মধ্যে এটাই তাদের খাবার উপযোগী পানি।

পল্লির বাসিন্দারা কুয়া থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করেন

বটতলা নামের একটি জায়গায় গিয়ে দাঁড়াই। ততক্ষণে শুঁটকির উৎকট গন্ধ সহনীয় হয়ে গেছে। বটতলার ঘরটি সুবল বিশ্বাসের। আমাদের দলের একজনের তিনি পূর্বপরিচিত। ২৩ বছর আগে অন্য মহাজনের সঙ্গে দুবলার চরে প্রথম মাছ ধরতে আসেন। তখন ছিলেন শ্রমিক। এখন নিজেই মহাজন। এ বছর তাঁর ঘরে কাজ করছেন ২৫ জন শ্রমিক। আছে বেশ কয়েকটি মাছ ধরা ট্রলার। সুবলের ঘরের পাশেই হোগলার চাটাই দিয়ে ঠাকুরঘর। দেখতে অনেকটা মঠের মতো। এর পাশেই সুবলের লাগানো একটা বটগাছ।

সুবলের সঙ্গে গল্প করতে করতে শুঁটকিপল্লির মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নিত্যপণ্যের বাজারে এসে থামি। বাজার বলতে একটা গলির দুই পাশে ছোট ছোট দোকান। মুদিখানা, খাবার হোটেল, চা-স্টল, সেলুন, কাপড়ের দোকান, ফার্মেসি, নৌযানের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, জেনারেটর চালিত লেদ মেশিন—কী নেই। জেলেদের কাছে জায়গাটি ‘নিউমার্কেট’ নামে পরিচিত।

অস্থায়ী দোকানে পল্লিচিকিৎসক মিজানুর রহমান

স্টেথোস্কোপ গলায় দোকানে বসে ছিলেন মোংলার পল্লিচিকিৎসক মিজানুর রহমান সিকদার। তাঁর ওষুধের দোকানের নাম খান ফার্মেসি। দুই বছর ধরে দুবলার চরে আসেন। বছরের অন্য সময় নিজ এলাকায় চিকিৎসা দেন। তিনি জানালেন, পেটের পীড়া, গ্যাসট্রিক, জ্বরজারিতেই বেশি ভোগেন শুঁটকিশ্রমিকেরা।

মসজিদ থেকে মাইকে জোহরের আজান ভেসে আসে। বাজার থেকে বের হয়ে দুবলার চরের আরেক এলাকা জামতলার দিকে পা বাড়াই। সেখানেই বসেছে রাসমেলা। সৈকত ধরে রাসমেলায় যেতে যেতে চোখে পড়ল পুণ্যার্থীদের ঢল। যাঁদের বেশির ভাগই সুন্দরবনঘেঁষা বিভিন্ন এলাকার সনাতন ধর্মের মানুষ।

পূন্যস্নানের সময় কয়েকজন পূণ্যার্থী

দুবলার চরের রাস উৎসব ঠিক কবে শুরু হয়েছিল, তা অজানা। তবে ধারণা করা হয়, ১৯২৩ সালে শিষ্যদের নিয়ে এই মেলা বা পূজার প্রচলন করেন হরিভজন নামের এক সাধু। সেই হিসেবে উৎসবটি এ বছর শত বছর পূর্ণ করল। শত বছরের আয়োজনের জৌলুশ অবশ্য রাসমেলা ঘুরে পাওয়া গেল না। জৌলুশ না থাকলেও পুণ্যার্থীদের আনন্দের অবশ্য কমতি ছিল না। তাঁরা কেউ ছোট শিশুর জন্য পুতুল কিনছেন, কেউ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন মুড়ি–মুড়কি।

মেলা ঘুরে আলোরকোলের পথ ধরি। জোয়ারের প্রভাবে ঢেউ আছড়ে পড়ছে সৈকতে। একটু আগে যে পথ ধরে এসেছি, সেই পথে এখন হাঁটুপানি। ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর পানির উচ্চতা গিয়ে ঠেকল ঊরুর কাছে। নোঙর করা ট্রলারগুলো ধীরে ধীরে সরে গেছে অনেকটা দূরে। আমরা উঁচুমতো জায়গায় ভাটার অপেক্ষা করি।