লংকাউইতে ডাব ছিনতাই

মালয়েশিয়ায় বেড়াতে যাওয়া অনেকের গন্তব্যেই থাকে লংকাউই। সবুজ পাহাড়, ঘন জঙ্গল, নীল সমুদ্র আর সাদা বালুর সৈকতে ঘেরা অনিন্দ্যসুন্দর এক দ্বীপমালা। এরই দুটি দ্বীপ ঘোরার গল্প শোনালেন মাসরুর-উর-রহমান

খাবারের টুকরা ছুড়ে মারতেই ইগল এসে ছোঁ মেরে নিয়ে যায়
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

সিংহের দ্বীপে

আমরা যাচ্ছি ‘পোলাও সিঙ্গা বেসার’ দ্বীপ। ভ্রমণসঙ্গী এক মালয় দম্পতি আর তাদের ছোট তিন সন্তান। আরও আছে ইউরোপীয় দুই জুটি। স্পিডবোটে কিনারা ঘেঁষে যে যার আসনে শক্ত করে বসে আছি।

প্রথমে কিছুক্ষণ ঢিমেতালে চলল স্পিডবোট। দ্বীপ থেকে একটু দূরে পৌঁছেই হঠাৎ গতি বেড়ে যায় অনেকখানি। এভাবে কিছুদূর যেতেই ‘পোলাও সিঙ্গা বেসার’ নামের দ্বীপটির দেখা মেলে। যার অর্থ ‘বড় সিংহের দ্বীপ’। দ্বীপটার দিকে তাকিয়ে কোনো সৈকত চোখে পড়ে না। দেখা যায়, শুধু অজস্র বৃক্ষরাজিতে ঠাসা ঘন গভীর জঙ্গল। মনে হয়, এখানে সিংহ বা বাঘজাতীয় হিংস্র প্রাণী থাকা অস্বাভাবিক নয়। তবে আমরা জেনেই এসেছি, তেমন হিংস্র প্রাণীর আনাগোনা এখানে নেই। আছে কিছু বন্য শূকর, মাউস ডিয়ার, বানর, নানা জাতের সরীসৃপ আর অসংখ্য ইগল। পুরো দ্বীপটাকেই প্রাণীদের অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। কোনো ঘরবাড়ি, হোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকানপাট নেই। তবে যাঁরা অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করেন, কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে তাঁরা ক্যাম্পিং করতে পারেন। আমরা ক্যাম্পিং করতে আসিনি, এসেছি শুধু ইগলদের পেট ভরে খাওয়াতে!

পোলাও সিঙ্গা বেসার দ্বীপ

দ্বীপের খুব কাছে এসে স্পিডবোটের ইঞ্জিন বন্ধ করে দিলেন মাঝিরা। তারপর বোটের সামনের দিকে দাঁড়িয়ে মুরগির মাংসের ছোট ছোট টুকরা ছুড়ে দিতে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে কোথা থেকে যেন উড়ে আসে শিকারি পাখি। অদ্ভুত ভঙ্গিতে মাংসের টুকরা ঠোঁটের ফাঁকে আটকে নেয়। খাবারটা নিয়েই আবার আকাশে উড়ে যায়। পরের টুকরা ছোঁ মেরে ধরতে ছুটে আসে অন্য একটা ইগল। আর ঝাঁক বেঁধে সবাই স্থির ডানা মেলে আকাশের অনেক ওপরে বিমানের মতো চক্রাকারে উড়তে থাকে। মাঝেমধ্যে শোনা যায় তীক্ষ্ণ চিৎকার। লালচে-বাদামি আর সোনালি ছাড়াও এখানে আছে সাদা রঙের একরকমের দুর্লভ ইগলও।

‘পোলাও ডায়াং বান্টিং’ দ্বীপটি নিয়ে উপকথা চালু আছে

ভালোবাসার উপাখ্যান

দুই পাশে ছোট বেশ কিছু দ্বীপকে ফেলে নীল সাগর কেটে এগিয়ে যাই। এলাকার বড়সড় দ্বীপটার নাম ‘পোলাও ডায়াং বান্টিং’। ইংরেজিতে ‘আইল্যান্ড অব দ্য প্রেগন্যান্ট মেইডেন’ বা ‘অন্তঃসত্ত্বা কুমারীর দ্বীপ’। দ্বীপের পাথুরে পাহাড়ের আকৃতি থেকে এই অদ্ভুত নামের উৎপত্তি। দূরে সাগর থেকে দ্বীপের দিকে তাকালে মনে হয়, লম্বা হয়ে শুয়ে আছে অন্তঃসত্ত্বা কোনো নারী। দ্বীপটি নিয়ে উপকথাও চালু আছে। এই দ্বীপে থাকতো মাত তেজা নামের এক তরুণ। লেকের পাড়ে মামবাং সারি নামের তরুণীকে দেখে সে মুগ্ধ হয়। অনেক চেষ্টায় সারির হৃদয় জয় করে তেজা। বিয়ে করে এখানেই বাস করতে থাকে তারা। এই দম্পতির একটা সন্তানও হয়। কিন্তু খুব অল্প বয়সেই মারা যায় তাদের সন্তান। মনঃকষ্ট নিয়ে বাকি জীবন পার করে মামবাং-তেজা। এখনো নাকি লেকের পাড়ে ঘুরে বেড়ায় তারা। মা হতে চাওয়া কেউ এই দ্বীপে বেড়াতে এলে তাকে আশীর্বাদ করে মামবাং সারি।

ডাব খেতে খেতেই বেধেছিল বিপত্তি!

ভূ–প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে দ্বীপটি ভরপুর। নানা জাতের গাছ আছে, মার্বেল পাথর আর চুনাপাথরে তৈরি নানা গঠনের পাহাড় আছে, বেশ কিছু প্রাকৃতিক গুহা আছে, আর আছে স্বাদু পানির পরিষ্কার টলটলে একটি হ্রদ। ঘন জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে কংক্রিটের পথ ধরে হাঁটতে থাকি আমরা। কখনো কয়েক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠি, আবার কখনো নিচে নামি। এভাবে ১০-১৫ মিনিট ধরে পাহাড়ি জংলা পথে চড়াই-উতরাই পার হয়ে পৌঁছে যাই চারদিক পাহাড়ে ঘেরা চমৎকার সেই লেকের পাড়ে।

লেকে প্যাডেল বোট চালানোর ব্যবস্থা আছে। সাঁতরানো যায় ইচ্ছেমতো, আছে লাইফ জ্যাকেট পরে সাঁতরানোর ব্যবস্থা। লেকের পাড়ে শুয়ে সূর্যস্নান করাও যায়। পানিতে বেশ কিছুক্ষণ দাপাদাপি করে তীরে আসি আমরা।

পোলাও ডায়াং বান্টিং দ্বীপের বাসিন্দারা

এবারে ফেরার পালা। কংক্রিটের পথ ধরে ফিরে আসি জেটির কাছে। বেশ তেষ্টা পেয়েছে। দেখি, বিশাল আকারের ডাব নিয়ে বসে আছে এক দোকানি। একটা ডাব কিনি। সিনেমার প্রেমিক-প্রেমিকার মতো আমরা স্বামী-স্ত্রী দুটো স্ট্র দিয়ে তন্ময় হয়ে সুমিষ্ট জল পান করছি, হঠাৎ এক ঝটকায় ডাবটা হাতছাড়া হয়ে যায়। আকস্মিক আঘাতে স্ট্র দুটোও মুখ থেকে ছিটকে পড়ে। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকিয়ে দেখি, ডাবটা নিয়ে লাফাতে লাফাতে চলে যাচ্ছে বড় একটা বানর। একটু দূরে গিয়ে বানরটা থামে, এদিকে ঘুরে সন্দেহের দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকায়। আমি পাশে রাখা মানিব্যাগ আর সানগ্লাসটা শক্ত করে ধরে রাখি!