
পাবলো নেরুদার সেই বিখ্যাত পাইপ, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের চশমা, দালাইলামার কলম—কী নেই! সুইডেনের স্টকহোমের পুরোনো শহর গ্যামলা স্তানের একেবারে মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে নোবেল জাদুঘর। প্রবেশপথের শুরুতেই দেয়ালে সাঁটানো নোবেল পুরস্কারের একটি বড় রেপ্লিকা। এই রেপ্লিকার সঙ্গে ছবি তোলার ভিড় লেগেই আছে সারাক্ষণ।
প্রথম ঘরে সাজানো রয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে নোবেল পুরস্কার পাওয়া ব্যক্তিদের স্মারক। এর মধ্যে ২০২৫ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে পুরস্কার পাওয়া ফ্রেড র্যামসডেলের স্মারক দেখে বেশ মজা পেলাম। ভদ্রলোক যে নোবেল পুরস্কার পেতে যাচ্ছেন, তা জানানোর জন্য তাঁকে খুঁজে পেতে নাকি নাজেহাল হয়ে গিয়েছিল নোবেল কমিটি। কারণ, স্ত্রী ও পোষা কুকুরকে নিয়ে তিনি তখন এমন এক জায়গায় হাইকিংয়ে চলে গিয়েছিলেন, যেখানে কোনো নেটওয়ার্ক ছিল না। কয়েক দিন পর সমতলে নেমে তাঁর স্ত্রীর মুঠোফোনে শত শত পেন্ডিং টেক্সট ঢুকতে শুরু করলে তাঁরা অবাক হয়ে জানতে পারেন, ফ্রেড নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন এবং নোবেল কমিটি থেকে শুরু করে সাংবাদিক, বন্ধুবান্ধব ও স্বজনেরা হন্যে হয়ে তাঁকে খুঁজছেন।
এ বিশেষ ঘটনাটিকে স্মরণীয় করে রাখতে জাদুঘরে রাখা হয়েছে সেই বিখ্যাত হাইকিংয়ের বুট জোড়া! নোবেল পুরস্কার জাদুঘরে রয়েছে এমন আরও মজার মজার স্মারক।
সর্বকালের সেরা বিজ্ঞানীদের একজন আলবার্ট আইনস্টাইনের নিজের হাতে লেখা দুই পৃষ্ঠার আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সমীকরণ দেখে সত্যি রোমাঞ্চিত হতে হয়। ১৯২২ সালে লেখা এই মহামূল্যবান নথির পাশেই রয়েছে জার্মান পদার্থবিদ ম্যাক্স ভন লাউয়ের লেখা সম্পাদকীয় নোট। আইনস্টাইনের আবিষ্কার নিয়ে বিতর্কের অবসানে তাঁর নোটটি অনেকটাই কাজে এসেছিল তখন।
জানা যায়, ২০১৯ সালে এক নিলামে আইনস্টাইনের এই নথি চড়া দামে কিনে জাদুঘরকে দান করেছেন সুইডিশ ধনকুবের পার তুবে।
আইনস্টাইনের পরই যাঁকে খুঁজছিলাম, তিনি মেরি কুরি। মেরি কুরির ব্যক্তিগত পরীক্ষামূলক নোটবুকের আদলে একটি রেপ্লিকা পাওয়া গেল। রেপ্লিকা কেন? কারণ, তাঁর ব্যক্তিগত নোটবুকসহ সব ব্যবহার্য বস্তুই উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয়তায় দূষিত হওয়ার কারণে ভারী ধাতু দিয়ে সিল করে তাঁর মরদেহের সঙ্গে সমাধিস্থ করা হয়েছে।
বাঙালি হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই খুঁজছিলাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মারক। খানিকটা হতাশই হতে হলো। জাদুঘরে রবীন্দ্রনাথের মাত্র একটি স্মারকবস্তু রয়েছে। তাঁর নিজের হাতে লেখা গদ্য, কবিতাসহ ছোট্ট একটি ব্যক্তিগত নোটবুক। ১৯২৩ সালে তাঁর ফরাসি বন্ধু, চিত্রকর ও অনুবাদক আন্দ্রে কার্পেলিসকে নোটবুকটি উপহার দেন কবি। কার্পেলিস কিছুদিন শান্তিনিকেতনে শিক্ষকতা করেছিলেন। উপহারটি সম্ভবত তখনই পেয়েছিলেন।
কার্পেলিস মারা যাওয়ার পর তাঁর পালিত কন্যা ফ্লোরা হগম্যান ২০০৭ সালে পারিবারিক এই অমূল্য সম্পদটি জাদুঘরে দান করেন। এর আগে জাদুঘরে রবীন্দ্রনাথের কোনো স্মারকবস্তু ছিল না। এখনো বিশ্বভারতী বা বাংলা থেকে কোনো স্মারক সেখানে দান করা হয়নি। রবীন্দ্রনাথের শত শত চিঠি, গানের খাতা, ব্যক্তিগত ব্যবহার্য বস্তুর মধ্য থেকে কোনো কিছু কি এত দিনেও দেওয়া গেল না!
বরং চমৎকৃত হয়েছি দেয়ালে আস্ত একটি সাইকেল ঝুলতে দেখে। এটাই অমর্ত্য সেনের সেই সাইকেল, যেটিতে চড়ে তিনি দিনের পর দিন পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে গ্রামে ঘুরেছেন দারিদ্র্য ও বৈষম্যকে বুঝতে।
আরেক বাঙালি নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ ব্যানার্জি দিয়েছেন ঘানার নারীদের হাতে তৈরি দুটি ব্যাগ। তাঁর স্ত্রী এস্থার ডুফলো দিয়েছেন ভারতে তাঁদের প্রকল্প ‘প্রথম’ থেকে প্রকাশিত শিশুদের পাঠ্যবই। আছে মালালা ইউসুফজাইয়ের একটি গোলাপি শাল। এই শাল পরেই মালালা তাঁর ১৬তম জন্মদিনে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে বক্তৃতা দিয়েছিলেন।
মজার বিষয় হলো, অনেক নোবেলজয়ী তাঁদের স্মারক হিসেবে এমন কিছু জাদুঘরকে দিয়েছেন, যা একেবারেই তাঁদের নিজের কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। যেমন রজার মায়ারসন। ২০০৭ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। কিন্তু তাঁর স্মারক হিসেবে রয়েছে আইজাক আসিমভের ফাউন্ডেশন। বইটি তাঁকে শৈশবে ভীষণভাবে আলোড়িত করেছিল।
তেমনি ২০১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়া অ্যালিস মানরো দিয়েছেন আন্তন চেখভের সংকলন পোর্টেবল চেখভ। হান কাং দিয়েছেন তাঁর ছোট্ট সিরামিকের চায়ের কাপ। মার্কেস, হোসে সারামাগো ও সিমাস হিনির চশমা রয়েছে একই টেবিলে। মারিও ভার্গাস ইয়োসার একটি কাঠের জলহস্তী আছে। আছে ওলগা তকারচুকের বিস্তর কাটাকুটি করা একটি নোটবুক।
জাদুঘরে এমন কিছু অদ্ভুত জিনিসও আছে, যেগুলো দেখে মনে হবে—এগুলো এখানে কেন? প্রতিটি কাচঘেরা স্মারকবস্তুর সামনে একটি ডিজিটাল স্ক্রিন রাখা আছে। আগ্রহী হলে তাতে সুইচ টিপে জানা যাবে এর পেছনের গল্প।
যেমন একটি মামুলি ওয়াশিং ডিটারজেন্টের বোতল। প্রথম দেখায় চমকে গেলেও এর ইতিহাস সত্যিই চমকপ্রদ। নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ গুইডো ইমবেনস ও জশুয়া অ্যাংগ্রিস্ট নিজেদের বাড়িতে ওয়াশিং মেশিন না থাকায় প্রতি শনিবার সকালে একই পাবলিক লন্ড্রিতে কাপড় ধুতে যেতেন। ওয়াশিং মেশিনে কাপড় দিয়ে দুই বন্ধু বসে নিজেদের কাজ নিয়ে আলাপ করতেন। এই সাপ্তাহিক লন্ড্রি-সময়ই তাঁদের বিখ্যাত গবেষণাকে সাফল্যের মুখ দেখতে সাহায্য করে।
পরে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ তাঁদের কাছে একটি স্মারক চাইলে দুই বন্ধু মজা করে এই ডিটারজেন্টের বোতলটি উপহার দেন।
একটি মামুলি নখ কাটার কাঁচিও এক জায়গায় আগ্রহ জাগাল। কাঁচিটি জার্মান লেখক হার্টা মুলারের। লেখালেখির এক অদ্ভুত পদ্ধতি ছিল তাঁর। হাতে না লিখে পত্রপত্রিকা ও বইপত্র থেকে শব্দ বা অক্ষর কেটে কেটে কোলাজ করে একেকটি কবিতা বানাতেন তিনি। আর এ কাজে ব্যবহার করতেন এই নখ কাটার কাঁচি।
২০০২ সালে নোবেল বক্তৃতার সময় প্রোটিনের পলিপেপটাইড চেইনের সর্পিল গঠন বোঝাতে কোমর থেকে বেল্ট খুলে কাঠিতে পেঁচিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেন রসায়নবিদ কার্ট ভুথরিশ। সেই স্মরণীয় বেল্টটিও একটি কাঠিতে পেঁচিয়ে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেছে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ।
বিজ্ঞান, সাহিত্য, অর্থনীতি—যেকোনো বিষয়ে সামান্য আগ্রহ থাকলেই নোবেল পুরস্কার জাদুঘরটি আপনার ভালো লাগবে। সুইডেনের স্টকহোমে গেলে এই জাদুঘরটি ঘুরে দেখতে পারেন। সোমবার বাদে প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাদুঘর খোলা থাকে। তবে শনি ও রোববার খোলে আরও আগে—সকাল ১০টায়। প্রবেশমুখে টিকিট করতে হবে। প্রাপ্তবয়স্কদের টিকিটের মূল্য ১৬০ সুইডিশ ক্রোনার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ হাজার টাকা। ১৮ বছরের নিচে যে কেউ বিনা টিকিটে প্রবেশ করতে পারবেন।
জাদুঘরের ভেতরে একটি সুভেনির শপও আছে। সেখানে নোবেল পুরস্কার ও নোবেলজয়ীদের স্মারকচিহ্নিত নানা জিনিস কেনা যায়। পাওয়া যায় শিশুদের নানা খেলনাও। নোবেল পুরস্কারের আদলে তৈরি একটি ডার্ক চকলেট সেখানে বেশ বিক্রি হচ্ছে। আলফ্রেড নোবেলের ডিনামাইট আকৃতির ক্যান্ডিটিও বেশ জনপ্রিয়।
সুভেনির শপ ছাড়াও আছে একটি বিস্ত্রো ক্যাফে। সেখানে অর্ডার করলেই পাওয়া যাবে নোবেল চকলেট, নোবেল আইসক্রিম আর সুইডিশ কেক।