
কোনো কোনো স্থানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ব্যক্তিগত গল্প। সেখানে প্রথম যাওয়ার দিনটা মনে থাকে আজীবন। বারবার জায়গাটায় ফিরে যেতে চায় মন। প্রথম আলোর শনিবারের ক্রোড়পত্র ‘ছুটির দিনে’র নতুন বিভাগ ‘ফিরে ফিরে যাই’-তে প্রিয় ভ্রমণস্থানের গল্প বলবেন নানা ক্ষেত্রের বিখ্যাত ব্যক্তিরা। এবার বলেছেন ১৮৪ দেশ ঘোরা পর্যটক নাজমুন নাহার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সজীব মিয়া
দেশে দেশে অনেক প্রিয় জায়গা। চিলির আতাকামা মরুভূমি, পেরুর মাচুপিচু যেমন প্রিয়, তেমনি প্রিয় আমার প্রথম বিদেশ ভারতের রাজস্থান, কলকাতা বা নামিবিয়ার সোয়াকপমুন্ড। ইউরোপের আইসল্যান্ড থেকে দক্ষিণ আমেরিকার কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলাও আমার প্রিয় দেশ। তবে গত বছর থেকে সব প্রিয় জায়গাকে পেছনে ফেলেছে সামোয়া। দেশটা একদম মনের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে। মনে হয়েছে, এই দেশ দেখব বলেই হয়তো এক দেশ থেকে আরেক দেশ অন্বেষণ করে বেড়িয়েছি।
২০২৫ সালের জুনে দেশটি ভ্রমণ করেছি। সামোয়ায় অন অ্যারাইভাল বা বিমানবন্দরে নামার পর ভিসার সুবিধা পান বাংলাদেশিরা। ভ্রমণে গিয়ে ১৭ দিন ছিলাম। প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে দ্বীপদেশটির রাজধানী আপিয়া। ওশেনিয়া মহাদেশের দেশটি ১৯৬২ সালে নিউজিল্যান্ডের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে। ২ হাজার ৮৩১ বর্গকিলোমিটারের ছোট্ট দেশটির জনসংখ্যা দুই লাখ। সমুদ্রসৈকত ও সবুজ পাহাড়ের জন্য পরিচিত এই দেশের অর্থনীতি মূলত কৃষি, পর্যটন ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল। দেশটির প্রকৃতি, মানুষ, সংস্কৃতি, ইতিহাস—সবকিছুই একে অপরের সঙ্গে মিশে আছে। শহরের ভিড় নেই, অতিরিক্ত পর্যটকের হইচই নেই। অতিথিপরায়ণ মানুষ সব সময় হেসে কথা বলেন। আন্তরিকতার সঙ্গে কুশল জানতে চান, যেচে কথা বলেন। সেখানে কাটানো প্রতিটি মুহূর্তে মনে হয়েছে, জীবন অনেক শান্তিময় ও সুন্দর। জীবনে যখন অবসর আসবে, সম্ভব হলে একটা ঘর বানিয়ে সামোয়ায় গিয়ে বাস করব।
সামোয়ার উপোলু দ্বীপের পূর্ব উপকূলের বিখ্যাত গ্রাম লালোমানুতে ছিলাম। অন্য গ্রামগুলোও ঘুরেছি। সরু পথ ধরে হেঁটেছি আর মুগ্ধ হয়ে শুনেছি সমুদ্রের গর্জন।
গ্রামের মেয়েরা কানে ফুল গুঁজে হাঁটেন। তাঁদের চোখের চাহনি ভরাট, শান্ত হাসিমুখ। গ্রামের একদল মেয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। তাঁদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আপনারা সারাক্ষণ কানে ফুল গুঁজে রাখেন কেন? তাঁরা জানালেন, সামোয়া সংস্কৃতিতে নারীরা সাধারণত ডান কানে ফুল গুঁজে রাখলে বোঝায় তাঁরা অবিবাহিত আর বাঁ কানে গুঁজলে বিবাহিত বা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ কাজে তাঁরা রেড জিঞ্জার ফুল ব্যবহার করেন, যাকে স্থানীয় লোকজন বলেন টেউইলা। এটা সামোয়ার জাতীয় ফুল।
আমি সিঙ্গেল শুনে আমার ডান কানে একটি ফুল গুঁজে দিয়েছিলেন তাঁরা। তারপর সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। চারদিকে পোকামাকড়ের ডাক, যেন গভীর জঙ্গলে আছি। নিবু নিবু আলোতে পালুসামি খেলাম। নারকেলপাতায় মোড়া খাবারটি সাধারণত নারকেল দুধ, পেঁয়াজ, শালগম, ইয়াম আর মাংস বা মাছ দিয়ে তৈরি করে। সামোয়ার জনপ্রিয় এই খাবারের স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে।
সামোয়ানরা ভীষণ পরিচ্ছন্ন। সব বাড়ির সামনে ময়লা ফেলার পাত্র থাকে। দেখেছি, প্রতি সপ্তাহে একবার দলবদ্ধ হয়ে মানুষ গ্রাম পরিষ্কার করেন। প্রতিটি গ্রাম ও শহর সবাই নিজ দায়িত্বে পরিচ্ছন্ন রাখেন। পরিচ্ছন্নতা তাঁদের জীবনের অংশ হয়ে আছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, সামোয়ার পরিচ্ছন্নতা বিশ্বের অন্য দেশের মানুষেরা শিখতে পারেন।
২০০৯ সালের সুনামির ক্ষত এখনো সামোয়ার কিছু মানুষের মনে থেকে গেছে। কিন্তু তাঁদের চোখে দৃঢ়তা ও পুনর্গঠনের শক্তি প্রমাণ করে, তাঁরা কতটা আত্মনির্ভর ও শক্তিশালী।