শিক্ষায় অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত, কী বলছেন শিক্ষার্থীরা

নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এরই মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের কাছে অগ্রাধিকার পাবে তিনটি বিষয়—শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি, জাতীয় শিক্ষাক্রম পর্যালোচনা ও পরিমার্জন এবং কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়ন। এ ব্যাপারে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কী ভাবছেন? তাঁদের দৃষ্টিতে কোন কোন বিষয় অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত?

শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা বাড়ানো প্রয়োজন

ইমরুল কায়েস
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

ইমরুল কায়েস, ফার্মেসি বিভাগ, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

প্রথমত, আমাদের শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন ও প্রায়োগিক শিক্ষার প্রসার ঘটানো অপরিহার্য। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা অনেকাংশেই মুখস্থনির্ভর, যা একজন শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা ও দক্ষতা বিকাশের পথে প্রধান অন্তরায়। প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্বে মাথা তুলে দাঁড়ানোর জন্য মুখস্থ বিদ্যার উপযোগিতা নেই বললেই চলে। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রতিটি বিদ্যালয়ে এবং মাদ্রাসায় গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত শিক্ষাদানে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা যেন পড়াশোনার প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে, সেই অনুযায়ী শিক্ষা কারিকুলামে যুগোপযোগী পরিবর্তন আনা জরুরি।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা বাড়ানো প্রয়োজন। শিক্ষকই হলেন শিক্ষাব্যবস্থার মূল চালিকা শক্তি। তাই শিক্ষকদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ, আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধি করা জরুরি। শিক্ষার্থীদের কীভাবে নৈতিকভাবে গড়ে তোলা যায় এবং তাঁদের সঙ্গে কীভাবে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মাধ্যমে পাঠদান নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে শিক্ষকদের আরও সতর্ক ও দক্ষ হতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে তাঁরা আরও উৎসাহের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, যা শিক্ষার সামগ্রিক পরিবেশ বদলে দেবে।

তৃতীয়ত, বেকারত্ব দূরীকরণ ও দক্ষ জনশক্তি গড়তে কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটানো অত্যন্ত জরুরি। আমাদের বর্তমান গতানুগতিক উচ্চশিক্ষা অনেক ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। এ জন্য দেখা যায় যে বিশ্ববিদ্যালয় পাস করেও একজন শিক্ষার্থী চাকরি পাচ্ছেন না। এই সংকট কাটাতে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে মূলধারায় গুরুত্ব দিতে হবে। যদি প্রতিটি পর্যায়ে হাতে-কলমে কাজ শেখার সুযোগ এবং বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা বাড়ানো যায়, তবে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষ করেই স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পাবে।

অপ্রয়োজনীয় জটিলতা বাদ দিলে শিক্ষা হবে আনন্দদায়ক

সুবাইতা বিনতে বুলবুল

সুবাইতা বিনতে বুলবুল, তৃতীয় বর্ষ, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আমাদের শিক্ষা কি যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে? বর্তমান ও ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণ করতে পারছে? প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মনে হলো, নিচের তিনটি বিষয়ে এখন জোর দেওয়া প্রয়োজন—

প্রথমত, গুণগত ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা চাই। শিক্ষা শুধু পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং বাস্তব জীবনে জ্ঞান প্রয়োগের সক্ষমতা গড়ে তোলাই হওয়া উচিত শিক্ষার মূল লক্ষ্য। দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক ও সময়োপযোগী পাঠ্যক্রম এবং কার্যকর মূল্যায়ন পদ্ধতি নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার মান আরও উন্নত হবে। এতে শিক্ষার্থীরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের সক্ষমভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষাকে সহজবোধ্য ও আনন্দদায়ক করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থী যেন আগ্রহ ও আনন্দের সঙ্গে শেখে। অপ্রয়োজনীয় জটিলতা বাদ দিয়ে বয়স, মেধা ও রুচি বিবেচনায় পাঠ্যক্রম ও সিলেবাস প্রণয়ন করা উচিত। বিশেষ করে গণিত, বিজ্ঞান ও আইসিটি বিষয়গুলো সহজ ভাষায় উপস্থাপন করলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতি কমবে। বরং শেখার আগ্রহ বাড়বে।

তৃতীয়ত, যোগ্য ও অনুপ্রাণিত শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করা। আমাদের দেশের শিক্ষকদের বড় একটা অংশ এই পেশায় আসেন অন্য কোনো পেশায় যুক্ত হতে না পেরে, নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে। কিন্তু শিক্ষকতার প্রতি ‘প্যাশন’ না থাকলে কি ভালো পড়ানো সম্ভব? আবার অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও প্রেরণার অভাবেও শিক্ষাদান কার্যক্রম প্রত্যাশিত মানে পৌঁছায় না। একজন শিক্ষক শুধু দক্ষ হলেই যথেষ্ট নয়; তাঁকে হতে হবে অনুপ্রেরণাদায়ী, যেন তিনি শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল ও নৈতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।