অনলাইনে পড়ালেখার ধারণাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই মার্কিন শিক্ষকের বিশেষ ভূমিকা আছে
অনলাইনে পড়ালেখার ধারণাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই মার্কিন শিক্ষকের বিশেষ ভূমিকা আছে

তুমিই ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক অভিযানের প্রধান চরিত্র

গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন বক্তৃতা দিয়েছেন সালমান খান। স্যাল খান নামে পরিচিত এই মানুষটিই খান একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা। অনলাইনে পড়ালেখার ধারণাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই মার্কিন শিক্ষকের বিশেষ ভূমিকা আছে। পড়ুন তাঁর বক্তব্যের নির্বাচিত অংশ।

আমরা সবাই সুন্দর একটা মহাকাব্যিক গল্প পছন্দ করি, যেখানে সাধারণত একজন নায়ক বা নায়িকা থাকে, যার ভেতরে লুকিয়ে থাকে অগাধ সম্ভাবনা। সে বুঝতে পারে, তার জন্য বড় কিছু অপেক্ষা করছে। কিন্তু কোথা থেকে শুরু করবে, বুঝে উঠতে পারে না। এরপর একটা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, দেখা যায় পৃথিবীকে তারা কোনো না কোনো মহাবিপদ থেকে উদ্ধার করে।

অতঃপর সিনেমা শেষ হয়। আমরা আমাদের সাধারণ জীবনে ফিরে যাই। যেখানে কোনো জাদুশক্তি নেই, এলিয়েন নেই, নেই কোনো লাইটসেবার। আছে শুধু অ্যাসাইনমেন্ট, মিটিং আর কর পরিশোধের দুশ্চিন্তা। কিন্তু আজ আমি তোমাদের গ্যান্ডাল্ফ, ডাম্বলডোর, নিও বা ওবি-ওয়ান হতে চাই। আরামদায়ক চিন্তা থেকে বের করে এনে বোঝাতে চাই, তুমিই ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক অভিযানের প্রধান চরিত্র।

১৯৯৩ সালে গণিতবিদ ও কল্পবিজ্ঞান লেখক ভার্নর ভেঞ্জি ‘দ্য কামিং টেকনোলজিক্যাল সিঙ্গুলারিটি’ নামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। পদার্থবিজ্ঞানে ‘সিঙ্গুলারিটি’ বলতে এমন একটা পরিস্থিতি বোঝায়, যেখানে গণিত আর কাজ করে না। যেমন কৃষ্ণবিবরের কেন্দ্র। ভেঞ্জি এই শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন এমন একটা সময় বোঝাতে, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বায়োটেকনোলজি একে অপরকে এত দ্রুত উন্নত করবে যে মানবজাতির সংজ্ঞা নতুন করে লিখতে হবে। তিনি ধারণা করেছিলেন, এটা প্রায় ৩০ বছরের মধ্যে ঘটবে—অর্থাৎ এখনকার সময়ে। তিনি লিখেছিলেন, ‘আমরা এমন এক পরিবর্তনের প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি, যা পৃথিবীতে মানবজীবনের উদ্ভবের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।’

সেই সময়ে যেই ভবিষ্যদ্বাণী অতিরঞ্জিত মনে হয়েছিল, সেটাই আজ সত্যি হতে শুরু করেছে। অনেক বুদ্ধিবৃত্তিক কাজই এখন মানুষের চেয়ে ভালো করতে শুরু করেছে এআই। ২০২৪ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন এমন বিজ্ঞানীরা, যাঁরা এআই ব্যবহার করে ২০০ মিলিয়নের বেশি প্রোটিনের গঠন নির্ধারণ করেছেন। অনেকের ধারণা ছিল, এই কাজ করতে শত শত বছর লাগবে। এআই আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে, তোমাদের ওপরই সেটা নির্ভর করছে।

এই মহা অভিযানের নায়ক হিসেবে তোমাদের জন্য আমার তিনটি পরামর্শ—

প্রথমত, শুধু স্বপ্নকে অনুসরণ কোরো না। স্বপ্ন দেখো, এবং একে গুরুত্ব দাও। পৃথিবী তোমাকে স্বপ্ন বাস্তবায়নের ক্ষমতা বা অর্থ দেবে না, যদি না তুমি প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করো। ক্যারিয়ারের শুরুতে কঠোর পরিশ্রম করতে প্রস্তুত থাকো। সঞ্চয় শুরু করো, মানুষের বিশ্বাস অর্জন করো, ফিডব্যাককে (মতামত) উপহার হিসেবে নাও। অন্যরা যেন সহজে তোমাকে ফিডব্যাক দিতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করো। সহজ প্রশ্ন করতে লজ্জা পেয়ো না। কেউ যদি বলে ‘এটা সম্ভব না’, তাহলে ভদ্রভাবে জিজ্ঞেস করো—কেন? সবাইকে সম্মান করো। কিন্তু সব সময় অনুমতির অপেক্ষায় থেকো না। কখনো কখনো সামান্য বিদ্রোহও তোমাকে নিয়ে যেতে পারে অনেক দূর।

দ্বিতীয়ত, দুশ্চিন্তাগুলো বেছে নাও। জীবনে সত্যিকারের চ্যালেঞ্জ আসবেই। স্বাস্থ্য সমস্যা, আর্থিক চাপ, প্রিয় মানুষের কষ্ট। কিন্তু আমরা যেসব উদ্বেগ বয়ে বেড়াই, বেশির ভাগ সময়ই সেগুলো হয় তুচ্ছ—ও কেন আমার মনমতো আচরণ করছে না; আমি নিজেকে যেমনটা ভাবি, তেমনভাবে দেখছে না। যদি কিছু করার থাকে, করো। না হলে বাদ দাও। চর্চার মাধ্যমে মানসিক চাপকে শক্তিতে, এমনকি কৃতজ্ঞতায় রূপ দিতে পারো। সামনে এগোনোর পথে যে সমস্যাগুলো আসে, সেগুলো আদতে একধরনের সৌভাগ্য। ‘আমাকে এত কিছু সামলাতে হচ্ছে’ না বলে মনে মনে বলো, ‘আমি এটা করার সুযোগ পাচ্ছি।’ এটাই আমার যাত্রার অংশ, এর মধ্য দিয়েই আমি বড় হচ্ছি।

তৃতীয় পরামর্শ, তুমি আদতে কী হতে চাও—সেটা নিয়ে ভাবো। হ্যাঁ, আরামদায়ক জীবন ও স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জীবনের প্রয়োজন মেটাতে না পারলে বা সব সময় অবহেলিত হলে পরিপূর্ণতা অনুভব করা কঠিন। হ্যাঁ, টাকা ও বিশ্বাসযোগ্যতা তোমাকে প্রভাব তৈরি করতে সাহায্য করবে। কিন্তু একটা পর্যায়ের পর এই প্রভাব কমতে শুরু করবে।

পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী ৫০০ মানুষের কোনো তালিকা নেই। যদি থাকত, আমি মনে করি সেই তালিকার অধিকাংশ মানুষকেই আমরা চিনতাম না। কিন্তু তাদের মধ্যে কিছু মিল চোখে পড়ত। খেয়াল করলে দেখতে—তাদের খুব কাছের কিছু বন্ধু আছে, জীবনের একটা লক্ষ্য আছে, তাঁরা সৃজনশীলভাবে নিজেকে তুলে ধরতে জানেন। তাঁরা জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞ, তাঁরা হাসেন, গ্লাসটা অর্ধেক ভরা না খালি—এ নিয়ে তাঁরা খুব একটা ভাবেন না।

মনে রেখো, তোমরা এমন এক বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মধ্যে বাস করছ, যা বাস্তবেই ঘটছে, যার প্রভাব পুরো মানবজাতির ওপর পড়বে । কিন্তু এর শেষটা এখনো লেখা হয়নি। কলমটা এখন তোমার হাতে। লেখা চালিয়ে যাও।