
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাইবান্ধা-৩ (সাদুল্লাপুর-পলাশবাড়ী) আসনে মোট ১০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁদের মধ্যে দুজন স্বতন্ত্র প্রার্থী। এই দুজনের একজন আজিজার রহমান প্রচারণা চালাচ্ছেন নিজের বাইসাইকেলে চেপে। সেই সাইকেলে একটি ঢেঁকি বাঁধা, তাঁর হাতে মাইক। বিষয়টি নজর কেড়েছে সবার। অর্ধেক বেলা তাঁর সঙ্গে ঘুরে যা দেখলাম, তাই বলছি এখানে।
এই আসনে বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টিসহ অন্য প্রার্থীরা দলবল নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন, মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা করছেন। মঞ্চ সাজিয়ে শত শত কর্মী-সমর্থক নিয়ে নির্বাচনী সভা-সমাবেশ করছেন। কিন্তু স্বতন্ত্র প্রার্থী আজিজার রহমানের প্রচারণার কৌশলটা ভিন্নধর্মী।
আজ মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত আজিজার রহমান সাদুল্লাপুর উপজেলার বৈরাগীর বাজার, বদলাগাড়ী মোড়, ইদ্রাকপুর বাজার, শেরপুরসহ পলাশবাড়ী উপজেলার মাঠেরহাট, ঢোলভাঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রচারণা চালান। এ সময় তাঁকে অনুসরণ করলাম।
নিজের পুরোনো একটি বাইসাইকেলই আজিজারের বাহন। তাতে কাঠের ঢেঁকি বাঁধা। বাইসাইকেলের সামনে মাইক। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই বাইসাইকেলে করেই ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে মাইকে ভোট চাইছেন।
গ্রাম থেকে গ্রামে ছুটে বেড়াচ্ছেন। এক হাতে হ্যান্ডেল ধরে বাইসাইকেল চালাতে চালাতেই আরেক হাত দিয়ে হ্যান্ডমাইকে কথা বলছেন। মাইকে বলছেন, ‘ও চাচি, ও খালা, ও আপা, ও দাদি, ও আন্টি, ও চাচা, ও অটোচালক ভাই, কৃষক ভাই, ও ভাতিজা, আমার ঢেঁকি মার্কায় একটি করে ভোট দেন। নির্বাচিত হলে আমি বেকার সমস্যা সমাধান করব। সংসদে গিয়ে আপনাদের সমস্যার কথা বলব।’
আজিজার রহমান কখনো রাস্তার মোড়ে মোড়ে, কখনো হাটবাজারে বক্তব্য দিচ্ছেন। তাঁকে দেখতে পেয়ে লোকজন জড়ো হচ্ছে।
আজিজার রহমান পরিবর্তনের জন্য নিজের ঢেঁকি প্রতীকে ভোট চাইছেন। দোয়া করতে বলছেন। বক্তব্য শেষে নারী ও বৃদ্ধ ভোটাররা তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করছেন। সালাম দিয়ে অনেক ভোটারের সঙ্গে কোলাকুলি করছেন।
এসব জায়গায় লোক জমায়েত করে আজিজার রহমান বলছেন, ‘বাইসাইকেলে পেট্রল খরচ হয় না। তাই আমি একাই বাইসাইকেলে নিজের প্রচারণা চালাচ্ছি। আমার কোনো কর্মী বাহিনী নেই। যাঁরা আমাকে ভালোবাসেন, তাঁরাই আমাকে ভোট দেবেন। আমার নির্বাচনী খরচ নেই। তাই নির্বাচিত হলে টাকা তোলারও চাপ থাকবে না। অন্যরা যাঁরা টাকা দিয়ে ভোট কিনছেন, তাঁরা নির্বাচিত হলে তো অনিয়ম-দুর্নীতি করে নিজের টাকা আগে তুলবেন। আমার ক্ষেত্রে তা হবে না। বিদেশেও যাব না। আমি এখানকার সরল মানুষ, আমি এখানেই থাকব।’
নির্বাচন কমিশনের যাচাই–বাছাইয়ে আজিজার রহমানের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছিল। পরে আপিল করে প্রার্থিতা ফিরে পান। প্রার্থিতা ফিরে পেয়ে তিনি গত ১৬ জানুয়ারি রাতে ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। সেদিন ভোরে তাঁকে রংপুর মডার্ন মোড় থেকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে সংজ্ঞা হারিয়েছিলেন। সুস্থ হয়ে আজিজার জানান, বাসে এক যাত্রী তাঁকে ডিম খেতে দিয়েছিলেন; তার পর থেকে আর কিছু বলতে পারেন না।
ঘুরতে ঘুরতে আজিজার রহমানের সঙ্গে অনেক কথাই হলো। প্রচারণায় খরচপাতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, ‘আমি পরিবারের কাছে মাত্র ১০ হাজার টাকা নিয়ে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছি। এ পর্যন্ত ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। ভোটারদের কাছেও সাড়া পাচ্ছি, ভোটাররা পরিবর্তন চাইছেন। তাঁরা ঢেঁকি প্রতীকে ভোট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।’
আজিজার রহমান জানান, অন্যান্য আসনের তুলনায় রাস্তাঘাট, সেতু-কালভার্ট, উন্নয়নের দিক দিয়ে সাদুল্লাপুর ও পলাশবাড়ী উপজেলা অনেকটা পিছিয়ে আছে। তিনি নির্বাচিত হলে জনগণের মৌলিক চাহিদা চিহ্নিত করে তা সমাধানের চেষ্টা করবেন।
আজিজার রহমানকে হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এমপি হয়ে গেলে এভাবে কথা বলার সুযোগ থাকবে?’
আজিজার রহমান বললেন, ‘নির্বাচিত হলে আমার সঙ্গে দেখা করতে কাউকে কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে না।’
আজিজার রহমান ১৯৯৭ ও ২০০৩ সালে সাদুল্লাপুরের ভাতগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান। এরপর ২০১৯ সালে সাদুল্লাপুর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান। এরপর ২০২৪ সালেও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢেঁকি প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।
আজিজার রহমানের বাড়ি সাদুল্লাপুর উপজেলার ভাতগ্রাম ইউনিয়নের খোদা বক্স গ্রামে। নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামায় তাঁর বয়স ৫৭ বছর এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা বিএসসি পাস উল্লেখ করেছেন। পেশা শিক্ষকতা। ১৯৮৪ সালে আজিজার রহমান সাদুল্লাপুর উপজেলার ফরিদপুর দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি, ১৯৮৭ সালে সাদুল্লাপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি ও ১৯৯০ সালে পলাশবাড়ী সরকারি কলেজ থেকে বিএসসি (স্নাতক) পাস করেন।
১৯৯১ সালে যোগ দেন সাদুল্লাপুরের দড়ি জামালপুর রোকেয়া সামাদ দ্বিমুখী বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে। বর্তমানে সেখানেই কর্মরত।
আজিজার রহমানের স্ত্রী সালমা বেগম গৃহিণী। তাঁদের এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে আশিকুর রহমান বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজে আর মেয়ে আশামণি রংপুরের পীরগঞ্জ আবদুর রউফ সরকারি কলেজে পড়ছেন। সম্পদ বলতে বসতভিটাসহ তিন বিঘা জমির মালিক আজিজার রহমান।