২৩ অক্টোবর কবি শামসুর রাহমানের জন্মদিন। তাঁকে নিয়ে অনুজ এক কবির মূল্যায়ন

শিল্প-সাহিত্য মাত্রই স্মৃতির শ্রমিকতাজাত উজ্জ্বল ও ধূলিপীড়িত দাসদাসী। আনন্দের বিষয় হচ্ছে, ওই দাসদাসী প্রভুত্ব করে, যাঁরা তাদের তৈরি করেন, তাঁদের ওপর। এবং যাঁরা শিল্প-সাহিত্যের সেবা নিতে বা পেতে চান, তাঁদের গ্রহণ ও বর্জনের মাত্রা নির্ভর করে অর্জিত শিক্ষার ভিত্তির শক্তির ওপর। সাহিত্যের যে অংশকে আমরা কবিতা বলে মনে করি, তার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট—সবার মান্য একটি সংজ্ঞা পাওয়া মুশকিল। এই বোঝাপড়া থেকেই হয়তো কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন, ‘কবিতা অনেক রকম’।
কী কী লক্ষণ থাকলে কবিতা ও কবি হন আধুনিক ও উৎকৃষ্ট? আর ওই কবিকে পাঠক কেন গ্রহণ করেন তাঁর জীবনচর্চা ও চর্যার পরিধিতে? এই দুটি প্রশ্ন কবি শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬)-এর কবিতা প্রসঙ্গে তুললে পক্ষে-বিপক্ষে—এখনকার তরুণ কবিদের মধ্যে শুরু হলে, নাকি হচ্ছে—বোঝা যাবে পক্ষপাত কোন দিকে যাবে। এখানে স্বল্প পরিসরে সেই আলোচনা সম্ভব নয়। এ লেখায় আমি শুধু চেষ্টা করব কয়েকটি বিষয়ের দরজায় কড়া নাড়তে। ধরে নিচ্ছি, লেখাটি যাঁরা পড়বেন, কবিতা, আধুনিকতা ও সমকালীনতা বিষয়ে সামান্য হলেও তাঁদের দীক্ষা আছে।
শামসুর রাহমান জীবন, প্রেম, স্বপ্ন, যুদ্ধ, হিংসা, বন্দীচেতনা এবং স্বদেশ ও রাজনীতির অনেক ভালো-মন্দ রূপ নিবিড় মনোযোগে দেখেছেন। এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিপুল শব্দের শীলিত সমবায়ে কবিতার ‘কলাপ্রকৌশল’ (কলাপ্রকৌশলে কী কী থাকে, তা নিশ্চয় তরুণ কবিরা জানেন) ব্যবহার করে আমাদের দেখানোর চেষ্টা করেছেন। তাঁর কবিতায় ওই সব বিষয় পূর্ণ মেজাজে থাকার পরেও আজকাল তরুণ কবিরা তাঁকে পড়তে আকৃষ্ট হচ্ছেন না, শুনলাম। রাহমানের কোনো কোনো কবিতায় অতিকথন আছে, তবে তার সংখ্যা বেশি নয়। অতি রচেন অমন কিছু বিচ্যুতি ঘটতেই পারে।
কার কর্মকৃতিত্বের চলাচল কত দিন টিকে থাকবে, তার হিসাব সমকালের অস্থির মানস সব সময় করতে পারে না। প্রায় সবাই জানেন, যুগের অনেকগুলো স্তর সফলভাবে পার হলেই একজন প্রয়াত কবি বা শিল্পীর সৃষ্টিকর্ম পাঠক/ দর্শক নিজের বোঝাপড়ার মান অনুযায়ী গ্রহণ বা বর্জন করেন। রাহমান আধুনিক ও সমকালীন—দুটোই। আমার অধ্যয়নবোধ বলে, আরও ৫০ বছর পর তিনি হবেন আমাদের একজন আধুনিক ধ্রুপদি কবি।
দুই.
এক তরুণ কবিবন্ধুকে—তিনি তাঁর নাম ব্যবহার করতে না করেছেন—প্রশ্ন করেছিলাম, ‘শামসুর রাহমানের কবিতা তরুণ কবিরা পড়তে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না, বিষয়টি কি সত্যি?’ তাঁর উত্তর ছিল হ্যাঁবাচক। কেন আগ্রহ কমে যাচ্ছে, তার কয়েকটি লক্ষণের কথাও বললেন তিনি। সেগুলো হচ্ছে, ‘তাঁর কবিতা ন্যারেটিভ, বক্তব্যপ্রধান ও রাজনৈতিক এবং এই সময়ের তরুণেরা যেসব কবিতা লিখছেন, তা এক বিচূর্ণ বিভাবঋদ্ধ, অনির্দিষ্টজ্ঞাপক ও ইঙ্গিতপ্রধান। রাহমানের রাজনৈতিক কবিতার বিরোধী নন তরুণেরা, কিন্তু রাজনীতিকে কবিতার বিষয় করা তাঁদের পছন্দ নয়। তা ছাড়া নন্দনরূপ বদলে যাওয়ার পার্থক্য তো আছেই।’ আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘অনলাইনে লেখালেখি, ওয়েব ম্যাগাজিন, ফেসবুক ইত্যাদিতে বেশি ব্যস্ত থাকার কারণে কি তরুণ কবিরা প্রায় সব রকম পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন?’ উত্তর: ‘হ্যাঁ, অনেকটা।’ আমার ওই কবিবন্ধুকে বলতে পারতাম, প্রতিটি শব্দই ন্যারেশন ধারণ করে। চিরকালের নান্দনিকতা ও ফ্যাশননির্ভর নান্দনিকতা এক নয়।
শামসুর রাহমানের কবিতা সম্পর্কে তরুণ কবি সোহেল হাসান গালিব ‘নির্জন দুর্গ থেকে বেরিয়ে’ নামে ছোট, অনেক অভিযোগে পূর্ণ একটি লেখা লিখেছিলেন। সেই লেখায় ‘নাগরিক মধ্যবিত্তের গোষ্ঠগানের কবি’, ‘দেখাটা নির্বিশেষ, সবার মতো দেখা’, ‘মনোলিথিক, যেন নিজের ঘরে নিজেই অবসন্ন’ প্রভৃতি মন্তব্য পড়ে আমার মনে হয়েছিল, এভাবে অতি সরলীকরণ না করে তাঁর কাছ থেকে আমরা রাহমানের কবিতার ওপর একটি গঠনমূলক পূর্ণ বই যদি পাই, তাহলে বোঝা যাবে তাঁর মন্তব্যগুলো কতটা ওজন ধারণ করে! কিছুদিন আগে কয়েকজন তরুণ কবির সঙ্গে আজিজ মার্কেটে আড্ডা দিচ্ছিলাম। কথায় কথায় বাংলাদেশের কবিতার প্রসঙ্গ এল। এক তরুণ বললেন, ‘শামসুর রাহমানের কবিতা পড়ে কিছু পাওয়া যায় না, পড়ি না।’ আমি বললাম, ‘আপনারা তাঁকে কীভাবে পড়েন জানি না, কিন্তু রাহমানের কবিতায় আছে মান্য আধুনিকতা, সমকালীনতা, চিরকালীনতা, রাজনীতি ও নিজস্ব একটি কাব্যভাষা। কোনো গবেষক যদি ১৯৪৭-পরবর্তী পূর্ব বাংলার, বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসকে কবিতার ভেতর দিয়ে দেখতে আগ্রহী হন, তাহলে শুধু তাঁর রাজনৈতিক কবিতা নিয়েই তিনি ইতিহাসটা লিখে ফেলতে পারবেন।’ আরও বললাম, ‘রাজনৈতিক কবিতাকে বিবেচনায় রেখে রাহমানের অন্যধারার কবিতা অর্থাৎ উৎকৃষ্ট কবিতাগুলোর কথা যদি বাদও দিই, দেখবেন এসব কবিতা আমাদের দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি জরুরি দিক ও স্বরূপ তুলে ধরে এবং এখানে প্রতিবছর ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত যেসব অনুষ্ঠান হয়, সেখানে নানাভাবে পড়া হয় এই কবিতাগুলো। বাংলাদেশের আর কোনো কবিকে এভাবে কি পড়া হয়? তবে এ কথাও বিবেচনায় নিতে হবে, সমকালীন রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে কেউ কবিতা লিখতেই পারেন, কিন্তু মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন হলে তার স্থায়িত্ব অনেক সময় লঘু হয়ে যেতে পারে।’ এবার আরেক তরুণ বললেন, ‘আপনার কথা সত্য, তবে এ প্রশ্নও তো আসে, একজন বড় কবি কি শুধু তিন-চার মাসের জন্য পঠিত হবেন?’ আমি বলি, ‘নিশ্চয়ই না।’ এ সময় নিজের পাঠস্মৃতি খুঁড়ে তাঁর কিছু কবিতা থেকে আবৃত্তি করি (কবিতাগুলোর নাম এই লেখার শেষ অংশে উল্লেখ করব)। এবং তরুণদের বলি, ‘শোনার পর কী মনে হচ্ছে?’ তাঁদের চোখমুখ দেখে বুঝতে পারি, রাহমানের কবিতা তাঁরা ভালো করে পড়েননি।
তরুণদের সঙ্গে কথা বলার পর আমার মনে হয়েছে, বিষয়টি কি এ রকম—যেহেতু উক্ত তিন-চার মাসে তাঁর কবিতা বিভিন্নভাবে মিডিয়া ও মঞ্চে পড়া হয়, ফলে তরুণেরা রাহমানের কবিতা সম্পর্কে মনে করেন, তিনি শুধু রাজনৈতিক কবিতাই লিখেছেন? মিডিয়ার বহু চিত্রিত প্রভাব কোথায় নেই?
তিন.
প্রাবন্ধিক হাসান ফেরদৌসের লেখা নাগরিক সময় ও প্রাসঙ্গিক চিন্তা শিরোনামে প্রবন্ধগ্রেন্থ ‘নাগরিক লেখক ও তাঁর সময়’ শিরোনামের একটি প্রবন্ধে আছে। হাসান জানাচ্ছেন, ‘কবি ক্যারোলিন ফরশ এগেইনস্ট ফরগেটিং নামের কবিতার একটি সংকলন যখন করতে যান এবং বিভিন্ন কবির (আনা আখমাতভা, ইনিস রিৎসস, লোরকা, নাজিম হিকমত প্রমুখ) কবিতা পড়তে পড়তে তখন তাঁর (ক্যারোলিনের) বেশ কিছু বিষয়ে অভিজ্ঞতা হয়। ক্যারোলিন উপলব্ধি করলেন: কবিতা ও রাজনীতির বিষয়টি প্রায়ই খুবই সংকীর্ণ অর্থে বোঝা হয়ে থাকে। বিষয়বস্তু যা-ই হোক না কেন, এসব কবির অধিকাংশ কবিতাতেই একধরনের চূড়ান্ত, প্রান্তবর্তী অভিজ্ঞতার কথা বলা হয়েছে। গভীরভাবে ব্যক্তিগত এবং সেহেতু অকৃত্রিম, এসব অভিজ্ঞতা তার সময়ের উৎকৃষ্ট ছবিও বটে। শুধু ভাষার জন্য শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত যেকোনো কবিতার সঙ্গেও এসব কবিতার ভাষা তুলনীয়। অন্য কথায় “শুদ্ধ কবিতা” হিসেবেও তাদের ফেলে দেওয়ার উপায় নেই। সংকলনভুক্ত কবিতাগুলোকে ক্যারোলিন নাম দিয়েছেন ‘পোয়েট্রি অব উইটনেস’—এই হিসেবে।’
চার.
হাসান আজিজুল হক নব্বই দশকের পরের কবিতা সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন: ‘কেউ আমাকে যদি বলে, আপনি কবিতা বোঝেন? আমি বলি, না আমি কবিতা বুঝি না, কবিতা পড়ি।...এবার সাম্প্রতিক কবিতা সম্পর্কে, বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকের পরের কবিতা সম্পর্কে বলি। যদি বলি, অনেকে আমার ওপর অসন্তুষ্ট হবেন।...আমার মনে হচ্ছে আর কবিতা লেখা হচ্ছে না। তার জায়গায় কুস্তি লড়তে গেলে যেমন হাজার রকম প্যাঁচ লাগে, সেই প্যাঁচ নিয়ে আবির্ভূত হচ্ছেন কবিরা। কবিতা লিখবেন, না ভাষার প্যাঁচ কষবেন!’ (‘কবিতাকে অধিকারী হিসেবে দাবি করি’ দৈনিক আমাদের সময়)। হাসান আজিজুল হকের সঙ্গে আমি একমত। তাঁর ওই মন্তব্য পড়ার সময় অনেকের মনে পড়তে পারে, অশোক মিত্রের বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘কবিতা থেকে মিছিলে’র একটি অংশ: ‘কবিতায় মাংস নেই, রক্ত নেই, সানুনাসিক শব্দের কুণ্ডয়ন; কখনো কখনো পেঁচিয়ে-পেঁচিয়ে-বলা কান্নার ভণিতা, যে কান্না এতই নিহিত প্রজ্ঞার ব্যাপার, এতই মাঞ্জা দেওয়া যে কান্নার মসলাই খুঁজে পাওয়া দুষ্কর; কখনো এমন এক প্রগল্ভ হর্ষোচ্ছলতা যা অরুণকুমার সরকার-বর্ণিত নাবালক ছাগলকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।’ অশোক মিত্রের এই প্রবন্ধের প্রথম বাক্যটি মনে রাখার মতো—‘অনেক কবিতা লিখে চলে যায় যুবকের দল।’
পাঁচ.
কারও কারও মনে হতে পারে, লেখার যে শিরোনামটি ব্যবহার করা হয়েছে, তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ না করে লেখক কি এই সময়ের তরুণ কবিদের কবিতা, নাকি তাঁদের পাঠের পরিধি, নাকি তাঁরা শামসুর রাহমানের কবিতা কেন পড়ছেন না, সেই বিষয়ে কথা বলছেন? কয়েকটি খণ্ডে বিন্যস্ত এ লেখার এক, দুই, তিন ও চার অংশে যা বলেছি, তার সমন্বিত রূপে একটি আয়না তো দাঁড়ায়, যা দেখায়, প্রশ্ন তোলা তরুণ কবিদের অবস্থা ও চিন্তামুখ এবং শামসুর রাহমানের কবিতা-কাজ সম্পর্কে আলাপ।
কেউ নিশ্চয়ই মনে করবেন না যে আমি বোঝানোর চেষ্টা করছি, তাঁর কবিতা পড়তেই হবে। এমনও হতে পারে, কয়েকজন তরুণ কবি, যাঁরা ঢাকার বিবিধ চালাকির মধ্যে বাস করেন না, রাহমানকে পাঠ করেন নিভৃতে, তাঁদের খোঁজ আমাদের জানা নেই; রাহমানের কবিতা পড়ে তাঁরা বোঝার চেষ্টা করেন, তিনি কোন উচ্চতার কবি।
অনেক রকম, অনেক বিষয়ে কবিতা লিখেছেন শামসুর রাহমান। গভীর পাঠমনোযোগের পরিধিতে রাহমানের সব কবিতাকে রাখলে বোঝা যাবে, তাঁর কবিতার শিল্পকৌশল, চির আবেদন বা চির-না-আবেদনটি কোথায়; এবং বাংলা কবিতায় তিনি কী কী নতুন কাজ করার চেষ্টা করেছেন, কীভাবে করেছেন। তাঁর পূর্ববর্তী বাংলা ভাষার প্রধান কবিদের থেকে তাঁর কাব্যভাষার নিজস্ব স্বর কতটা মৌলিক। আমার এই কথাগুলোর পক্ষে সাক্ষ্য দেবে হুমায়ুন আজাদ লিখিত শামসুর রাহমান: নিঃসঙ্গ শেরপা নামের প্রবন্ধগ্রন্থ। এতে ব্যাপক বিচার-বিশ্লেষণ করে হুমায়ুন আজাদ দেখিয়েছেন, রাহমান কেন আমাদের ভাষার একজন প্রধান কবি।
অবশ্য হুমায়ুনের বিচারের কারণে এখনকার তরুণ কবিরা রাহমানকে পড়বেন কি পড়বেন না, তা বলা যাবে না। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে, আড্ডা দিয়ে আমার যত দূর মনে হয়েছে, তাঁরা কেবল নিজেদের পরিধির মধ্যেই থাকেন।
আজাদের বই থেকে আমি কিছু মন্তব্য তুলে দিচ্ছি—১. ‘প্রধান কবি পরিস্রুত করেন গোত্র ও জাতির ভাষা-আবেগ-চৈতন্য-সংবেদনশীলা’, (পৃ. ১৯)। ২. ‘শামসুর রাহমানই “নতুন কবিতা” (১৯৫০-এ আশরাফ সিদ্দিকী ও আবদুর রশীদ খান সম্পাদিত কবিতা সংকলন) অন্তর্ভুক্ত একমাত্র কবি, যাঁর কবিতার স্বপ্নকল্পনাবোধ উজ্জ্বল’, (পৃ. ২৭)। ৩. ‘তাঁর কবিতায় আগের মতোই প্রতাপশালী থাকে প্রতিবেশ পৃথিবী ও সমকাল; তবে নিজ বাসভূমেতে (নিবাভূ) তিনি ঢাকাকে সম্প্রসারিত করেছিলেন স্বদেশে বা অন্যভাবে বলা যায়, নিবাভূ নামক উত্তেজনা ছাওয়া কাব্যটিতে তিনি প্রবেশ করেছিলেন স্বদেশে’, (পৃ. ৯৪)।
ছয়.
শামসুর রাহমানের রাজনৈতিক কবিতা থেকে আমি কোনো পঙ্ক্তি বা স্তবক তুলে দেব না। ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’—বহু পঠিত, বহু উচ্চারিত। তাঁর অন্যান্য কবিতা থেকে কিছু পঙ্ক্তি তুলে দিচ্ছি, যদিও দেওয়ার মতো আছে শত শত, যা থেকে বোঝা যাবে এখনকার তরুণেরা শামসুর রাহমানের কবিতা সম্পর্কে যা বলেন, বুঝে বলেন কি না। ১. ‘আমার হৃদয়ে নেই লোকাতীত একান্ত গোলাপ’, (‘একান্ত গোলাপ’: প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে), ২. ‘শহরে বাগান চাই লিরিকের প্রসন্নতা ছাওয়া’, (‘সম্পাদক সমীপেষু’: বিধ্বস্ত নীলিমা), ৩. ‘আমি শুধু মরালের মতো/ অন্তিম গানের ধ্যানে প্রজ্বলিত, গুঞ্জরিত খাদ’, (‘খাদ’: প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে), ৪. ‘দেখেছি সমুদ্রতীরে অস্তরাগে একদা হাওয়ায়/ নর্তকী-শিখার মতো সফেদ তরুণ ঘোড়া এক/ মেতেছে খেলায়’, (‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’: প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে), ৫. ‘তিনটি শাদা ঘোড়া সাহস হৃদয়ের/ ত্রিকাল কেশরের শিখায় জাগ্রত’, (‘তিনটি ঘোড়া’: বিধ্বস্ত নীলিমা), ৬. ‘আর্ত হরিণের চোখে/ জটিল লতার ছায়া, অথবা বাঘের থাবা কাঁপে’, (‘কোথাও পারি না যেতে’: বিধ্বস্ত নীলিমা), ৭. ‘নিঃসঙ্গতা তোমাকে করাচ্ছে তুর্কিস্নান’, (‘যে কেউ ডাক দিক’: এক ধরনের অহংকার), ৮. ‘গোধূলিস্বরে/ মৃত্যুকে আবৃত্তি করেছিলে তুমি কবিতার মতো’, (‘মহররমী প্রহর, স্মৃতির পুরাণ’: ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা), ৯. ‘করোটিতে জ্যোৎস্না দেখে ক্ষুধার্ত ইঁদুর কী আশ্বাসে/ চমকে ওঠে, কিছুতে বোঝে না ফণিমনসার ফুল’, (‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’: রৌদ্র করোটিতে)।
সাত.
কোনো কবিকে হয়তো তরুণ কবিরা পড়ছেন না বা গ্রহণের মাত্রায় রাখছেন না—এমন হতেই পারে। তবে তাতে তাঁদের না-পড়া কবির—তিনি যদি আসলেই কবি হয়ে থাকেন—কিছুই আসে যায় না। এই বাঁচা-মরার জগতে বিশেষ বিশেষ অবস্থা কত রকম মীমাংসার দাবি খোঁজে! তবে যাঁরা শামসুর রাহমানকে পড়বেন না, আমার মনে হয়, তাঁরা ‘শূন্যতায় তুমি শোকসভা’ হয়ে থাকবেন।
আরও পড়ুন: