প্রদর্শনীর একটি চিত্রকর্ম অবলম্বনে
প্রদর্শনীর একটি চিত্রকর্ম অবলম্বনে

চিত্র প্রদর্শনী

শিল্পভাষায় আত্মপরিচয় নির্মাণ

প্রতিটি ছবির সামনে দাঁড়ালে চোখ কিছুক্ষণ থমকে থাকে। একবার দেখে চলে যাওয়ার মতো নয়; ছবিগুলো ধীরে ধীরে পাঠ করতে হয়। লাবণ্যময় রং-রেখা, সংযত বিন্যাস ও সূক্ষ্ম বিবরণ মিলে তৈরি করে এক মায়াবী আবেশ। বাংলার লোকশিল্পের দীর্ঘ ঐতিহ্য, প্রাচ্যচিত্রের উত্তরাধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষার ভাববৈশিষ্ট্যের উত্তরাধিকার এই চিত্রমালার দৃশ্যভাষায় প্রবহমান। কিন্তু বিষয়ের বয়ানে কেবল অতীত নেই; আছে সমকালীন জীবন, সংস্কৃতি ও মানুষের অন্তর্গত অভিজ্ঞতা। অর্থাৎ আমাদের জীবন ও সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে প্রোথিত অভিজ্ঞতার কথাই নানা রূপ ও প্রতীকে ফিরে এসেছে এসব ছবিতে।

এই শিল্পভাবনার ঐতিহাসিক শিকড় খুঁজতে গেলে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের কথা অনিবার্যভাবেই সামনে আসে। তাঁর শিল্পচেতনার গভীরে ছিল দেশ, মাটি, মানুষ ও প্রাচ্য সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ। পঞ্চাশের দশকে ইউরোপ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তাঁর শিল্পদৃষ্টিতে নতুন মাত্রা যোগ করলেও তিনি দেশীয় শিল্প–ঐতিহ্যের শিকড়ের সন্ধান থেকে বিচ্যুত হননি। বরং আধুনিক শিল্প-অভিজ্ঞতাকে দেশীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়াসে তাঁর আগ্রহ ও উদ্যোগে তৎকালীন গভর্নমেন্ট আর্ট ইনস্টিটিউটে প্রাচ্যকলা বিভাগের সূচনা হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন চিত্র–ঐতিহ্য, বেঙ্গল স্কুল, মিনিয়েচার ও লোকশিল্পের চর্চার মধ্য দিয়ে দেশীয় শিল্পভাষার বিকাশের যে ভিত্তি তিনি নির্মাণ করেছিলেন, তারই একটি ধারাবাহিক প্রতিফলন আজকের এই চিত্রচর্চায় দেখা যায়।

এই ধারার গুরুত্ব কেবল একটি নির্দিষ্ট শিল্পরীতির অনুশীলনে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলার আত্মপরিচয় নির্মাণের ক্ষেত্রেও এর রয়েছে গভীর সম্ভাবনা। পাশ্চাত্য শিল্পতত্ত্বের আলোকে বেঙ্গল স্কুলকে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা থাকলেও এর অন্তর্নিহিত স্বদেশচেতনা, দেশীয় শিল্প–ঐতিহ্যের সন্ধান এবং নিজস্ব শিল্পভাষা নির্মাণের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করলে এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়। পৃথিবীর নানা প্রান্তে প্রাচ্যের দর্শন, নন্দনতত্ত্ব ও করণ-কৌশলের অনুষঙ্গ গ্রহণের যে দীর্ঘ ইতিহাস, তা প্রাচ্যশিল্পের এই উত্তরাধিকারের সম্ভাবনাকেই নির্দেশ করে।

''নিভৃত আচার'', জলরং, পল্লবী বিশ্বাস

শিক্ষানবিশ শিল্পীদের বিকাশ যেন একটি উদীয়মান চারা গাছের বেড়ে ওঠা। শিল্পের প্রতি গভীর অনুরাগ ও সৃষ্টির তীব্র তাগিদ যাঁদের ভেতরে থাকে, তাঁদের কাজেই সম্ভাবনার প্রস্ফুটন ঘটে। এই প্রজন্মের শিল্পীরা সহজাত ও লোকজ ভাবধারাকে আধুনিক ও সমকালীন বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে নিজস্ব শিল্পভাষা নির্মাণের চেষ্টা করছেন। ফলে তাঁদের কাজ নিছক ঐতিহ্যের পুনরাবৃত্তি হয়ে থাকেনি; বরং শিকড়ের সঙ্গে সমকালীনতার এক সৃজনশীল সংলাপ তৈরি করেছে।

শিক্ষার্থী শিল্পীদের হাত ধরে মিনিয়েচারধর্মী ল্যান্ডস্কেপেও যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। সুষমা সাদাফ মিথীর ‘জয়নুল উৎসব’ চিত্রকর্মটির কথাই ধরা যাক। পাখির চোখে দেখা চারুকলার উৎসবকে তিনি ক্যানভাসে এমনভাবে বিন্যস্ত করেছেন, যা যান্ত্রিক আলোকচিত্রের পুনর্নির্মাণ নয়; বরং শিল্পীর নিজস্ব কল্পনা ও দৃষ্টির মধ্য দিয়ে গাছপালা, স্থাপত্য ও মানুষের সমাবেশ নতুন এক দৃশ্যভাষা পেয়েছে। চারুকলার চিরপরিচিত আবহ সেখানে আরও গভীর ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে জাহিন রাঈদা মাইশার ল্যান্ডস্কেপে মানুষ ও প্রকৃতির চিরন্তন সহাবস্থান এক দরদি অনুভব নিয়ে ধরা দিয়েছে।

সাধারণ ল্যান্ডস্কেপের গণ্ডি পেরিয়ে এই শিল্পীরা ঐতিহ্যবাহী মিনিয়েচার রীতির সঙ্গে সমকালীন জীবনবোধের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। ফলে প্রাচ্যধারায় নির্মিত ল্যান্ডস্কেপ কেবল প্রকৃতির দৃশ্য হয়ে থাকেনি; তা হয়ে উঠেছে বাংলার মাটি, মানুষ ও সাংস্কৃতিক সত্তার এক নান্দনিক পাঠ।

''আত্মনির্মাণ'', জলরং, রাহেলী রুবাইয়াৎ

প্রাচ্যকলা বিভাগের চিত্রচর্চায় জলরঙের ধৌত পদ্ধতির একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সেজুতি মেরেলিন পেরেরা, শুভজিৎ পাল, বাপ্পী পাল, মীর মুজনাবিন আহমেদ আপন, প্রগতি চাকমা প্রমুখ শিল্পীর ধৌত পদ্ধতির কাজে রঙের লাবণ্য, স্বচ্ছতা ও স্তরবিন্যাসের সঙ্গে প্রাচ্য ষড়ঙ্গের (রূপভেদ, প্রমাণ, ভাব, লাবণ্যযোজন, সাদৃশ্য ও বর্ণিকাভঙ্গ) গুণাবলি মিলিত হয়ে চিত্রমালায় স্বতন্ত্র আবহ তৈরি করেছে। পাশাপাশি গোয়াশ, টেম্পারাসহ নানা মাধ্যমে উদীয়মান শিল্পীদের অনুশীলনধর্মী কাজও রয়েছে। এসব কাজের মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, এখানে পঠনপাঠন কেবল কোনো নির্দিষ্ট রীতির অনুকরণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রীতি, কৌশল ও নিজস্ব সৃজনশীলতার মধ্যে একটি ক্রমাগত অনুসন্ধান চলছে।

পরম্পরা ও ঐতিহ্যের সূত্র যেমন এসব শিল্পীর কাজে প্রবহমান, তেমনি তার সঙ্গে মিশে আছে আধুনিক সৃজনশীলতার নিজস্ব ভঙ্গি। অনন্যা হালদার, নকীব জাহাঙ্গীর, বসুন্ধরা সরকার, বাদশা হারুন নুর রশীদ, সুদীপ্ত বসাক অর্ণব প্রমুখের কাজে ঐতিহ্য নিছক অতীতের পুনরাবৃত্তি হয়ে থাকেনি; সমকালীন সংবেদন ও ব্যক্তিসত্তার স্পর্শে তা পেয়েছে নতুন ব্যঞ্জনা। আর সেই সূত্র ধরেই শিল্পের অন্তর্জগতে প্রবেশ করেছে মনস্তত্ত্বের অনুষঙ্গ।

''একাকীত্ব'', জলরং (ধৌত পদ্ধতি), সেজুতি মেরেলিন পেরেরা

রাহেলী রুবাইয়াতের সূক্ষ্ম মিনিয়েচারধর্মী কম্পোজিশনে রঙের দ্যোতনা ও প্রতীকের অর্থবহ ব্যবহার দর্শককে দৃশ্যমান বাস্তবতার আড়ালের এক অন্তর্লোকে নিয়ে যায়। তাঁর ছবিতে অবচেতন মনস্তত্ত্ব, স্মৃতি ও সাম্প্রতিক ভাবনার নানা স্তর যেন পরস্পরের সঙ্গে নিঃশব্দে সংলাপ করে। অন্যদিকে প্রাচ্যরীতির সহজাত সারল্য যেখানে রূপচেতনার অন্যতম ভিত্তি, সেখানে পল্লবী বিশ্বাসের কাজ যোগ করেছে এক অনন্য মাত্রা। তাঁর ক্যানভাসে হলুদের দীপ্ত পরিসরে সোনালি ফুল ও নারীর অবয়বের মেলবন্ধন রচনা করে এক রূপাতীত সৌন্দর্য, যেখানে লৌকিকতা ধীরে ধীরে আধ্যাত্মিকতার দিকে উন্মোচিত হয়।

এই চিত্রমালায় বাংলার এবং ভারতীয় উপমহাদেশের লোকশিল্প, ঐতিহ্য ও পৌরাণিক অনুষঙ্গও নানা রূপে ফিরে এসেছে। গ্রামীণ জীবনযাত্রার সহজ-সরল রূপ, তাঁতশিল্পের মতো প্রথাগত পেশা, উৎসব-অনুষ্ঠানের আনন্দঘন মুহূর্তের পাশাপাশি রাসলীলা, শাস্ত্রীয় চিত্রায়ণ ও পদ্মাসনে দেবীরূপের উপস্থিতি ছবিগুলোকে দিয়েছে পৌরাণিক ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির গভীরতা। বেঙ্গল স্কুল ও ঐতিহ্যবাহী মিনিয়েচার পেইন্টিংয়ের প্রভাবের সঙ্গে ওয়াশের নরম শেড, জলরঙের মোলায়েম ব্যবহার এবং লাল, নীল ও হলুদের সুষম বৈপরীত্য মিলে তৈরি করেছে স্বপ্নীল ও আবেগময় এক চিত্রভাষা।

''শিরোনামহীন'', কাগজের উপর অ্যাক্রেলিক, নাফিসা আনজুম নিঝু

সব মিলিয়ে এই চিত্রমালা ঐতিহ্যের কাছে ফিরে যাওয়ার নিছক নস্টালজিয়া নয়; বরং ঐতিহ্যকে বর্তমানের চোখে পুনরায় পাঠ করার একটি সৃজনশীল প্রয়াস। এখানে প্রাচ্যরীতি অতীতের অনুকরণ নয়, শিকড় থেকে সমকালীন আত্মপরিচয় নির্মাণের একটি সক্রিয় শিল্পভাষা। দৃশ্যমান সৌন্দর্যের আড়ালে তাই এসব ছবি আমাদের নিয়ে যায় ইতিহাস, লোকস্মৃতি, পৌরাণিক কল্পনা, মনস্তত্ত্ব ও সমকালীন জীবনের বহুমাত্রিক জগতে। এ কারণেই প্রদর্শনীটি কেবল কিছু শিল্পকর্মের সমাবেশ নয়; বরং শিকড়ের সঙ্গে বর্তমানের এক নান্দনিক সংলাপ।

জয়নুল গ্যালারিতে শিল্পী কান্তিদেব অধিকারীর তত্ত্বাবধানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের প্রাচ্যকলা বিভাগের ‘বার্ষিক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী’ ২ সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছে এবং আজ প্রদর্শনীর সমাপনী দিন।