কোনো কোনো মুহূর্তে আমার মধ্যে যদিবা নিরুদ্বেগ জীবন শ্রীবৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা আনচান করে ওঠে, আমি সস্নেহে ফিরে যাই কষ্ট ও দুশ্চিন্তার আশ্রয়ে, সংকটপূর্ণ জীবনের কাছে এবং ভাবতে থাকি: এটা বরং বেশি ভালো, এর থেকে আমি বেশি শিখি, এ আমাকে নিচে নামায় না, এটা সে—পথ নয় যেখানে একজন ধ্বংস হয়ে যায়।১
ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের আরদ্ধ দুরূহ শিল্পব্রত পালনকে ঘিরে যে অধরা মায়া বিচ্ছুরিত হয়েছে, তা অনেক বেশি আদরণীয় হলেও এসব ঘিরে আরোপিত কিংবদন্তি রহস্য মহিমা গঘের পপুলার শিল্পী ইমেজ বটে! তাঁর বিষণ্নতা, ছন্নছাড়া, উদ্ভট, পাগলা, কানকাটা, উপোসী, ব্যর্থ প্রেম, দুঃখবিলাসী, এবিসিনিথি নেশাগ্রস্ত, ছবি বিক্রি না হওয়া এ সবই এই শিল্প অধিকর্তার পপুলার পোর্ট্রেটের খোলনলচে! অথচ তাঁর সাথে নির্মমতর বিরোধাভাসেরই পরিহাস এসব। তাঁর জীবনরং সৃষ্ট কাজকে যেমন পড়তে হয় তেমনি বেশ্যাগমন, এবিসিনিথি পানবিষয়ক কানাঘুষাকে আলগোছতে সরিয়ে রাখতে হয়। সৃষ্টির অপার আনন্দে যিনি বেঁচেছেন, বাণিজ্য বুদ্ধির বেচা বিক্রির লাভের খতিয়ান দিয়ে তাঁর সৃষ্টির পার্থক্যকে মূল্যায়ন করতে যাওয়া বেদাত। বিশ্বাসে জীবন্ত, বিন্যাসে রংময় উষ্ণতায় মোড়া সৃজনাত্মক ভাবুকতার এক একটি গঘীয় শিল্প অভিজ্ঞতার মধ্যে পরস্পর বিভাজক কোনো রেখা নির্ণয় করে দেওয়া অসম্ভব।
ভিনসেন্ট ভ্যান গঘকে ঘিরে পাগলামির গল্প যেন তাঁর শিল্পকর্মের মতোই বিখ্যাত। কেউ বলেন, তিনি মৃগী রোগী, কেউ পাগল বা বলেন উন্মাদ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই ‘পাগল’ তকমা কী তাঁর সৃজনশীল একাগ্রতা ও নিবিষ্টতার প্রতি সুবিচার?
ভিনসেন্ট ভ্যান গঘকে ঘিরে পাগলামির গল্প যেন তাঁর শিল্পকর্মের মতোই বিখ্যাত। কেউ বলেন, তিনি মৃগী রোগী, কেউ পাগল বা বলেন উন্মাদ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই ‘পাগল’ তকমা কী তাঁর সৃজনশীল একাগ্রতা ও নিবিষ্টতার প্রতি সুবিচার? ভ্যান গঘ ছিলেন এমন এক শিল্পী, যিনি যাপন যন্ত্রণাকে নন্দনে রূপ দিতে পেরেছিলেন মানসিক রোগীরূপে নয়, একজন সৃষ্টি-পাগল হিসেবে কেবল। জীবৎকালে গঘের নন্দনচর্চাই হয়ে উঠেছিল তাঁর একমাত্র অনিবারণীয় রোগ বা রোগের নিদান। আজ অবধি নানা নিয়তিবিধায়ক সমালোচকদের বিচারধারা এমন যে গঘকে উন্মার্গগামী বলে, তাঁর উৎকেন্দ্রিকতার অপরূপ প্রতিন্যাস হিসাবে দেখানোর উৎসাহে এতটুকু ভাটা পরেনি। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত নেদারল্যান্ডের শিল্পী রিশার্ড এন রোলান্ড হলসটের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছিলেন, ‘...ভ্যান গঘের প্রণীত শিল্প তাঁর জীবনের বিষাদনাট্যের দৃষ্টান্ত বলে প্রতিপন্ন হয়েছে। এমনকি অ-বিশেষজ্ঞের কাছেও পুরো ব্যাপারটা হয়ে উঠেছে অপ্রকৃতস্থ একজন মানুষের রোগ নিদানের অভিজ্ঞান।’২
ভ্যান গঘের জীবন নিয়ে সকলেই মুগ্ধ। তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন এবং তাঁর ক্যারিয়ার শেষ করে দিয়েছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়, এই ঘটনাটি তাঁর জীবন সম্পর্কে উৎসাহী বেশির ভাগ মানুষই জানেন, অবশ্যই, কানের লতি কাটার ঘটনাসহ। মানুষ সব সময়ই এমন একজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে একটি বিকল্প বা অসচরাচর উপায় বা চমকপ্রদ নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আরোপে আগ্রহী। আমরা তাঁর ব্যক্তিগত জীবন দ্বারাও মুগ্ধ, এবং এটি ছিল একটি অসাধারণ জীবন, যা তিনি যাপন করেছিলেন। তিনি যখন থেকে শিল্পী হওয়ার জন্য যাত্রা করেছিলেন, মৃত্যুর আগপর্যন্ত তার ব্যাপ্তি ছিল মাত্র ১০ বছর।
তাঁর ‘পাগলামি’ ঘিরে থাকা ‘পৌরাণিক কাহিনি’ একজন ব্যক্তির ক্রমহ্রাসমান মানসিক স্বাস্থ্যের সাথে লড়াই করার একটি দুঃখজনক গল্প, অবশেষে, কখনো সুস্থ হওয়ার বা স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার হতাশায়, তিনি আত্মহত্যা (বিতর্ক থাকলেও বহুলগ্রাহ্য) বেছে নিয়েছিলেন। এর কোনোটি কি তাঁকে ‘পাগল’ সাব্যস্ত করে? তাঁর আত্মধ্বংসের ভয়াবহ ইচ্ছা বা তাঁর অসুস্থতা ঠিক কী ছিল: মৃগী রোগ থেকে সিফিলিস এবং সিজোফ্রেনিয়া পর্যন্ত সমস্ত প্রতিদ্বন্দ্বী তত্ত্ব অন্বেষণ করা হয়েছে। যেকোনো শিল্পীর সবচেয়ে টেকসই সাহিত্যিক উন্মোচনে তাঁরা এমন একজন মানুষকে হাজির করেন যে অতিরিক্ত উত্তেজিত, অত্যন্ত অবাস্তব, প্রায়শই বিচ্ছিন্ন এবং নারীদের সাথে সুখী সম্পর্ক বজায় না রাখতে পারার জন্য তাঁর নিজের দুঃখবোধের জন্যও অক্ষম। আবার এটি তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক জীবনজুড়ে অস্থির, অসুখী, কঠিন করে তুলেছিল।
ভ্যান গঘের জীবন নিয়ে সকলেই মুগ্ধ। তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন এবং তাঁর ক্যারিয়ার শেষ করে দিয়েছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়, এই ঘটনাটি তাঁর জীবন সম্পর্কে উৎসাহী বেশির ভাগ মানুষই জানেন, অবশ্যই, কানের লতি কাটার ঘটনাসহ।
...ইম্প্রেশনিস্টরা সকলেই প্রায় এক, প্রত্যেকের ওপর শৈল্পিক প্রভাবের ধরনও প্রায় এক, এবং আমরা সকলেই কমবেশি স্নায়ুপীড়িত, উন্মাদ। তার ফলে সমূহ রং আর তার ভাষা, পরিপূরক রঙের বিশেষ পরিণাম, আর তাদের বৈপরীত্য ও সমন্বয়ের প্রতি আমরা একটু বেশিই সংবেদনশীল।৩
১৮৮৮ সালের শেষের দিকে দুর্ভাগ্যবশত অসুস্থ হয়ে পড়া একজন বুদ্ধিমান পরিশ্রমী শিল্পী হিসেবে তাঁকে দেখার প্রচলনটি কোনো ভুল নয়। তিনি সর্বদা আবেগপ্রবণ এক শিল্পযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। সর্ব অর্থে প্রচলিত সমাজ বাস্তবতায় বসবাস করতে না পারা এই মানুষটির জন্য কোন অভিধা প্রযোজ্য? হতে পারেন তিনি একজন পাগল। অথবা অন্যদিকে হতে পারেন একজন বোহেমিয়ান।
ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিক অ্যালডাস লিখেছিলেন, ‘যদি কেউ আলাদা হয়, তবে সে জন একাকী হতে বাধ্য।’ ১৮৮৯ সালে, সেন্ট-রেমি-ডি-প্রোভিন্সে স্বেচ্ছায় রোগীবাসের আশ্রয়ে প্রবেশ করার পরে, ভ্যান গঘ তাঁর বোনকে লিখেছিলেন, ‘আমি দুই মাস ধরে আমার ঘর ছেড়ে যাইনি। কেন জানি না...একাকিত্বের অনুভূতি আমাকে মঠের মধ্যে এমন ভয়ংকরভাবে আঁকড়ে ধরে যে আমি বাইরে যেতে ইতস্তত করি। যদিও সময়ের সাথে সাথে সেটা বদলে যাবে। পেইন্টিং করার সময় কেবল ইজেলের সামনেই আমি জীবন অনুভব করি।’ তার দুঃখের মধ্যে ক্ষণিকের জন্য হলেও সুড়ঙ্গের শেষে একটি আলো তিনি দেখেছিলেন। এমনকি তার নির্জনতার মধ্যেও, তিনি তাঁর চিত্রকর্মে-রঙে ভেসে যাওয়া, আলোয় স্নান করা, মমতা, স্বপ্রাণ উপস্থিতি এবং জীবন দ্বারা পরিপূর্ণ স্বাচ্ছন্দ্যের বোধ জারিত করেছিলেন। ‘হয়তো এটা আনন্দ ক্রন্দনঅশ্রু, দুঃখের নয়।’ এ সম্পর্কে একটু চিন্তা করলে, এটি সহজেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে ইতিহাসের অনেক সৃজনশীল প্রতিভা গভীরভাবে একাকী ছিল। এর সুস্পষ্ট কারণ রয়েছে, কোনো শৈল্পিক সাধনায় নিজেকে উৎসর্গ করা মানে সামাজিক সংশ্লিষ্টতার জন্য একজনের খুব কম সময়ই বরাদ্দ থাকে। ভ্যান গঘের বন্ধুত্ব-একাকিত্ব যেন এক ধাঁধা, এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে একাকিত্ব কখনো কখনো শুধু সৃজনশীলতার জন্য যথেষ্টই নয়; এটা কারও কারও জন্য হয়তো জরুরিও।
ভালোবাসার ক্ষমতা মানুষের একটি অসাধারণ গুণ এবং এটি কি একাকিত্বের গভীরতা দ্বারা পরিমাপ করা যেতে পারে? একাকী বোধ করা এমন একটি অনুস্মারক যে তা ভালোবাসার গভীরতম প্রদেশে থাকে। ভ্যান গঘের চিকিৎসা বা মানসিক সমস্যা ঠিক কী ছিল? শত শত চিকিৎসা গবেষক এবং বিশেষজ্ঞদের দ্বারা বিচার বিশ্লেষিত হয়েছে; কিন্তু বলা বাহুল্য তার কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর ব্যতিরেকে। ভ্যান গঘ মিউজিয়ামে কয়েক বছর আগে তাঁর চিকিৎসার বিষয় নিয়ে একটি সিম্পোজিয়াম হয়েছিল এবং দিনের শেষে ফলাফল সত্যিই বেশ অস্পষ্ট ছিল! ভ্যান গঘ মাঝে মাঝে চিকিৎসাসংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে যে কথা বলেছেন, সেই চিঠিগুলোই আমাদের কাছে সত্যাসত্য প্রমাণ দাবি করতে পারে। অনেকে সত্যিই জানতে চাইবেন যে এটি তাঁর শিল্পের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পেরেছিল এবং আমরা কীভাবে তা অবলোকন করি।
ভ্যান গঘের উন্মাদনার রহস্যময়তার সময় আর্লসের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত সেন্ট-রেমি-ডি-প্রোভেন্স ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উৎপাদনশীল সময়, ৭০ দিনে তিনি ৭৫টি চিত্রকর্ম এবং ১০০টিরও বেশি ড্রইং ও স্কেচ তৈরি করেছিলেন।
তুমি বোধ হয় জানো, আমি এখন ঠিক সুস্থ নেই, বেশ কঠিন স্নায়ুপীড়ায় আক্রান্ত হয়েছিলাম, সাময়িক অপ্রকৃতিস্থতা বলা যায় তাকে, আর সেটা ফিরে ফিরে আসে। ওর আর আমার বিচ্ছেদের কারণ ছিল সেটাই, কেননা আমাকে উন্মাদাশ্রমেও যেতে হয় শেষ পর্যন্ত। কিন্তু, তার আগে, কতবার যে আমরা তোমাকে নিয়ে কথা বলেছি!৪
আর্লসে তাঁর দুর্ভাগ্যজনক অভিজ্ঞতার পর, ভ্যান গঘ স্বেচ্ছায় নিজেকে সেন্ট-রেমিতে আশ্রয়াধীন হতে বাধ্য করেছিলেন। ভর্তির সময় পরিচালক পেয়রন তাঁর সাক্ষাৎকার নেন এবং আশ্রয়কেন্দ্রের রেজিস্টারে নিম্নলিখিত নোটটি লিপিবদ্ধ করেন: ‘... দৃষ্টি ও শ্রবণের হ্যালুসিনেশনসহ তীব্র উন্মাদনায় ভুগছেন, যার ফলে তিনি তার কান কেটে ফেলে নিজেকে বিকৃত করেছেন। বর্তমানে তিনি তাঁর যুক্তি পুনরুদ্ধার করেছেন বলে মনে হচ্ছে, কিন্তু তিনি মনে করেন না যে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার শক্তি এবং সাহস তাঁর আছে... আমার মতামত হলো মি. ভ্যান গঘ খুব সম্প্রতি মৃগী রোগে আক্রান্ত হন।’
১৮৮৮ সালের ডিসেম্বরে আর্লসে ভ্যান গঘের বাঁ কানের কিছু অংশ নিজেই কেটে ফেলার পর তিনি সেন্ট-রেমি অ্যাসাইলাম বা আশ্রয়কেন্দ্রে ভর্তি হন। একটি সাবেক ধর্মীয় স্থাপনায় আশ্রয়কেন্দ্রটি অবস্থিত ছিল। ভ্যান গঘকে শয়নকক্ষ এবং স্টুডিও হিসেবে ব্যবহারের জন্য একটি পৃথক কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা সত্ত্বেও ভ্যান গঘ সেখানে অবস্থানকালে নিবিড় শিল্পচর্চায় নিমগ্ন ছিলেন। ভ্যান গঘের উন্মাদনার রহস্যময়তার সময় আর্লসের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত সেন্ট-রেমি-ডি-প্রোভেন্স ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উৎপাদনশীল সময়, ৭০ দিনে তিনি ৭৫টি চিত্রকর্ম এবং ১০০টিরও বেশি ড্রইং ও স্কেচ তৈরি করেছিলেন। আশ্রয়কেন্দ্রের ঘর থেকে তিনি বাগান, গমখেত এবং সাইপ্রেস গাছসহ দৃশ্যমান প্রকৃতিচিত্রগুলো এঁকেছিলেন। এই সময়ের মধ্যে আঁকা বিখ্যাত কিছু চিত্রকর্ম তৈরি হয়েছিল, যার মধ্যে রয়েছে দ্য স্টারি নাইট, আইরিসেস ও উইথ সাইপ্রেসেস। কোনো অসুস্থতার পরিপ্রেক্ষিত দ্বারা নির্মিত চিত্রকর্ম এসব নয়। ভ্যান গঘের অসুস্থতাই একজন শিল্পী হিসেবে তাঁর মহত্ত্বের কোনো কারণ হওয়ার জো নেই। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন যে তিনি কী করছেন। শেষ পর্যন্ত, ভ্যান গঘ তাঁর অস্থিরচিত্ততা সত্ত্বেও ছবি এঁকেছেন। এটি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
ভ্যান গঘের উন্মার্গগামিতার রহস্য সম্ভবত কখনো নিশ্চিতভাবে সমাধান করা যাবে না। কিন্তু যা টিকে আছে এবং যে বিরোধিতাকে প্রতিনিধিত্ব করে তা হলো, কষ্ট থেকে অসাধারণ আলো, রং এবং প্রাণশক্তিপূর্ণ একেকটি শিল্পের উদ্ভব হয়েছিল। তাঁর কষ্টকর মৃগী রোগ, মানসিক অসুস্থতা, অথবা উভয়ই হোক না কেন, তা সেই ব্যক্তির জীবন থেকে অবিচ্ছেদ্য ছিল, যিনি মাত্র এক দশকের মধ্যে আধুনিক শিল্পের সবচেয়ে গভীরতর সৃষ্টিশীল কাজগুলোর মাধ্যমে স্বাক্ষর রেখে গেছেন।
গঘের জীবনে তাঁর প্রতিভা এবং ব্যথা একটি কখনো অন্যটিকে সম্পূর্ণরূপে ব্যাখ্যা না করেই পাশাপাশি ছিল। ভ্যান গঘের সৃষ্টি উন্মাদনা একটি রহস্য হয়ে রয়ে গেছে, যা তাঁর শিল্পের জগতের অন্তর্গত, যেখানে কষ্ট সৌন্দর্যে পরিণত এবং যেখানে তাঁর অস্থির সৃষ্টি আত্মা হতাশা নয়, বরং উজ্জ্বলতা রেখে যায়। ভ্যান গঘের মানসিক স্বাস্থ্যসম্পর্কিত কোনো আনুষ্ঠানিক রোগ নির্ণয় করা না হলেও ডাচ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. জি ক্রাউস (যার মতামত ভ্যান গঘের চিঠির মার্কিন সংস্করণে সংযুক্ত) শিল্পীর কষ্টকে চিহ্নিত করতে অস্বীকার করে একটি স্পষ্ট অন্তর্দৃষ্টি দিয়েছিলেন এই বলে যে: অসুস্থতার পাশাপাশি তাঁর গোটা শিল্পযাপনেও তিনি ছিলেন একাকিত্বে আকীর্ণ।
এখানে আমি এখনো খুব বিষণ্ন বোধ করছি আর যে ঝড় তোমায় শঙ্কিত করছে, তা আমার ওপরও ক্রমেই ভার হয়ে চেপে বসছে।৫
ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ তাঁর সমস্ত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও প্রথম ও শেষ পর্যন্ত দৃষ্টি, শক্তি এবং নিষ্ঠার প্রতিরূপ একজন শিল্পী হিসেবে রয়ে গেছেন। যদি তাঁকে মানসিক অসুস্থতা, যন্ত্রণার একটি বিষাদ গল্পের নায়কে পরিণত করি, তখন আমরা তাঁর সৃষ্টিসত্তাকে হারাতে পারি। তিনি যে একাগ্রতার উজ্জ্বলতা, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ঝুঁকি, রং, রূপ, আবেগের যে স্পষ্টতা নিয়ে সৃজনপথ অনুসরণ করেছিলেন, তা আমরা বিস্মরিত হতে পারি। হয়তো তাঁকে সৃজন–উন্মুখ পাগলাটে বলা মানে তাঁর জীবনের উত্তেজনাকে সম্মান করা। তবে এই উত্তেজনা দুঃখ এবং সৃষ্টির মধ্যে, অভ্যন্তরীণ অন্ধকার এবং বাহ্যিক আলোর মধ্যে, সংকট এবং ধারাবাহিকতার মধ্যে উত্তেজনা। তিনি তাঁর সৃষ্টিশীল আত্মা দিয়ে যন্ত্রণা, নিঃসঙ্গতা ও আলোকে একসূত্রে বুনে তুলেছিলেন ক্যানভাসে। তাঁর ‘উন্মাদনা’ ছিল সৃষ্টির উন্মাদনা, যেখানে কষ্ট, রূপ-সৌন্দর্য, আর যন্ত্রণা ছাপিয়ে নির্মিত তাঁর একান্ত রংছবির ভাষা।
শিল্পই গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয় এবং যিনি তাঁর এবং বিধতার মধ্য দিয়ে কেবল ছবি আঁকতেন। আসলে এ ধরনের সাহসের জন্য পাগলামির মতো কোনো মিথের প্রয়োজন হয় না; বরং এর জন্য সৃজনশীল সততার স্বীকৃতিই যথার্থ।
যত দূর আমি জানি, আমি একজন শিল্পী—কথাটার অর্থ: আমি খুঁজছি, আমি কঠোরভাবে চেষ্টা করছি, আমি আমার সমগ্র হৃদয় দিয়ে এর মাঝে আছি।৬
ভ্যান গঘকে ট্র্যাজেডির চেয়েও অধিকতর কিছু ভাবা মানে তাঁর মানবতার সম্পূর্ণ জটিলতাকে আলিঙ্গন করা। যে মানুষটি খুব ভোরে উঠত, দিন শেষে দেরিতেও ছবি আঁকত, চিঠি লিখে তাঁর নানা পরিকল্পনা ভাবনা লিপিবদ্ধ করেছিল, যুক্তি দিয়েছিল, স্বপ্ন দেখেছিল, যিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করেছিলেন যে শিল্পই গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয় এবং যিনি তাঁর এবং বিধতার মধ্য দিয়ে কেবল ছবি আঁকতেন। আসলে এ ধরনের সাহসের জন্য পাগলামির মতো কোনো মিথের প্রয়োজন হয় না; বরং এর জন্য সৃজনশীল সততার স্বীকৃতিই যথার্থ। এ ক্ষেত্রে আমাদের কাছে তাঁর বাঁচার ধরন ও শিল্প রচনাই কেবল প্রণিধানযোগ্য হতে পারে। কেননা, এ কথা অনস্বীকার্য যে শিল্পচর্চাই তাঁর বাঁচার একটি ধাঁচ হয়ে উঠেছিল, ফলে মানুষের শিল্পসংবেদনে এমন দৃষ্টিভঙ্গি পক্ষপাতমূলক ও অবিচার হবে না।
আঁকার প্রতিভা বা বীক্ষা কোনো দিনই তাঁর অনবরত মকশো করা থেকে নিষ্ক্রান্ত করেনি। ফলে আশ্রয়কেন্দ্রে নিরাময়ের মধ্যেও তাঁর অবিরাম অনুশীলন বা রেওয়াজ তাঁকে নিয়ে গেছে অর্জিত চরিতার্থতার দিকে। গঘের তখনকার চিত্রণের মধ্য দিয়ে বা সেসব ঘিরে দর্শক মনে যে মায়া বিচ্ছুরিত হয়েছে, আরোপিত কিংবদন্তি ছাপিয়ে সেই রহস্য মহিমা আমাদের কাছে ঢের আদরণীয় হয়ে ওঠেছে। গঘের এই ‘বাতুল মর্মকথা’ই প্রকারান্তরে তাঁর নিঃসঙ্গতার আলেখ্য ছবি, যা তাঁর জীবনজুড়ে আঁকা হয়ে আছে।
উদ্ধৃতিসূত্র
১. হেগ, মধ্য মে, ১৮৮২ (থিওকে লেখা গঘের চিঠি)।
২. শিল্পের অন্তর্বলয় বিপজ্জনক দুই শিখর, ব্যক্তি ও রচয়িতা, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, প্রমা, ১৯৯৫।
৩. সা রেমি থেকে লেখা চিঠি ২০ ফেব্রুয়ারি ১৮৯০, ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ এভাবেই চলে যেতে চাই, পৃষ্ঠা ৫১, সংকলন ও ভাষান্তর - সন্দীপন ভট্টাচার্য, মনফকিরা, কলকাতা ২০০৮।
৪. সা রেমি থেকে জন রাসেলকে লেখা চিঠি ৩১ জানুয়ারি ১৮৯০, ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ এভাবেই চলে যেতে চাই, পৃষ্ঠা ৩২, সংকলন ও ভাষান্তর -সন্দীপন ভট্টাচার্য, মনফকিরা, কলকাতা ২০০৮।
৫. সা রেমি থেকে লেখা চিঠি ১০ জুলাই ১৮৯০, ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ এ ভাবেই চলে যেতে চাই, পৃষ্ঠা ১১৪, সংকলন ও ভাষান্তর -সন্দীপন ভট্টাচার্য, মনফকিরা, কলকাতা ২০০৮।
৬. হেগ, প্রথমদিক, মে ১৮৮২ (থিওকে লেখা গঘের চিঠি)।