‘মহানন্দা নদী’, শিল্পী আহম্মেদ শামসুদ্দোহা
‘মহানন্দা নদী’, শিল্পী আহম্মেদ শামসুদ্দোহা

‘ওয়ান স্কোয়ার স্টোরিজ’

সীমিত পরিসরে বহুমাত্রিক আখ্যান

শিল্পের ব্যাপ্তি যে ক্যানভাসের পরিমাপে নির্ধারিত নয়, বরং এক বর্গফুটের ক্ষুদ্র পরিসরেও যে অসংখ্য গল্প, অনুভব ও জীবনবোধ জন্ম নিতে পারে, এই উপলব্ধির নান্দনিক অনুসন্ধান থেকেই শিল্প প্রদর্শনী ‘ওয়ান স্কোয়ার স্টোরিজ’-এর সূচনা। ১৪ ফেব্রুয়ারি শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকার লালমাটিয়ায় অবস্থিত ভূমি গ্যালারিতে এই ব্যতিক্রমী প্রদর্শনীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়।

‘সুন্দরবন-১’, শিল্পী আজমল হোসেন

২০ জন বিশিষ্ট ও প্রসিদ্ধ শিল্পীর অংশগ্রহণে আয়োজিত ১০০টি শিল্পকর্ম নিয়ে এই প্রদর্শনী প্রমাণ করেছে, আকার কখনোই ভাবনার পরিসরকে সংকুচিত করে না; বরং সীমাবদ্ধতার মধ্যেই অনেক সময় শিল্পের গভীরতম প্রকাশ সম্ভব হয়।

‘অপেক্ষা’, শিল্পী জামাল আহমেদ

প্রদর্শনীর প্রতিটি শিল্পকর্ম এক বর্গফুটের ক্যানভাসে নির্মিত হলেও বিষয়বস্তু ও ভাবনা ছিল বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক। কোথাও ব্যক্তিগত স্মৃতি, কোথাও সামাজিক বাস্তবতা, আবার কোথাও বিমূর্ত ভাবনার সূক্ষ্ম প্রকাশ—সব মিলিয়ে ‘ওয়ান স্কোয়ার স্টোরিজ’ হয়ে ওঠে ছোট পরিসরে বড় গল্প বলার এক অনন্য উদাহরণ। শিল্পীরা নিজ নিজ ভাষায় রং, রেখা ও টেক্সচারের মাধ্যমে দর্শককে আমন্ত্রণ জানান নিবিড়ভাবে দেখার ও অনুভব করার।

‘অস্তিত্ব’, শিল্পী কামরুজ্জোহা

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দেশের প্রখ্যাত শিল্পী, সমালোচক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও বিপুলসংখ্যক শিল্পপ্রেমী। তাঁদের উপস্থিতিতে ভূমি গ্যালারির পরিসর পরিণত হয় এক প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়, যেখানে শিল্পকর্ম ঘিরে গড়ে ওঠে সংলাপ, ব্যাখ্যা ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গির আদান-প্রদান।

‘না বলা গল্প-১’, শিল্পী মাহমুদুর রাহমান দীপন

প্রদর্শনীর ভেতর প্রতিটি শিল্পকর্ম যেন একেকটি ক্ষুদ্র অথচ স্বতন্ত্র গল্পের জানালা খুলে দেয়। শিল্পী জামাল আহমেদ তাঁর নারীর জীবনবিষয়ক কাজে নারীর নীরব সংগ্রাম, সংবেদনশীলতা ও দৈনন্দিন অস্তিত্বকে গভীর মানবিক দৃষ্টিতে উপস্থাপন করেছেন। সীমিত ক্যানভাসে রং ও রেখার সংযত ব্যবহারে নারীর জীবনের অন্তর্লীন আবেগ ও শক্তি তাঁর কাজে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

‘মহানন্দা নদী’, শিল্পী আহম্মেদ শামসুদ্দোহা

শিল্পী কামরুজ্জোহার ‘জলাচর’ শিরোনামের শিল্পকর্মে পানিতে হাঁসের খেলাধুলার দৃশ্য এক প্রাণবন্ত ছন্দ সৃষ্টি করে। জলের গতিময়তা ও প্রাণের স্বতঃস্ফূর্ততা তাঁর কাজে গ্রামীণ প্রকৃতির সরল আনন্দকে মূর্ত করে তোলে।

‘পাহাড়ের দিক’, শিল্পী কনক চাঁপা চাকমা

শিল্পী রনজিৎ দাস তাঁর শিল্পকর্মে ছাগলছানার সঙ্গে এক বালকের খেলাধুলার দৃশ্য তুলে ধরে শৈশবের নিষ্পাপ আনন্দ ও গ্রামীণ জীবনের আন্তরিক সম্পর্ককে স্মরণ করিয়ে দেন। এই দৃশ্য দর্শকের মনে এক ধরনের নস্টালজিক উষ্ণতা জাগিয়ে তোলে।

‘কবুতরের সাথে মেয়ে’, শিল্পী রনজিৎ দাস

অন্যদিকে শিল্পী আহম্মেদ শামসুদ্দোহার ক্যানভাসে মহানন্দা নদীর পার হয়ে ওঠে সময়, প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানের নীরব দলিল। নদীতীরের প্রশান্ত আবহ ও প্রকৃতির বিস্তার তাঁর কাজে এক ধ্যানমগ্ন অনুভূতি সৃষ্টি করে।

‘জলাচর’, শিল্পী কামরুজ্জোহা

সমসাময়িক চিত্রশিল্পী আজমল হোসেন তাঁর শিল্পকর্মে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক দৃশ্য তুলে ধরে প্রকৃতির অপরিসীম সৌন্দর্য ও রহস্যময়তার ইঙ্গিত দেন। সীমিত পরিসরের মধ্যেও তাঁর কাজে বন, জল ও আলো-ছায়ার মেলবন্ধন এক গভীর পরিবেশগত অনুভব তৈরি করে।

‘ছেলের সাথে ছাগল’, শিল্পী রনজিৎ দাস

এই শিল্পকর্মগুলো একত্রে এ প্রদর্শনীকে পরিণত করেছে ছোট ক্যানভাসে বড় জীবনের বহুমাত্রিক আখ্যানের এক সংবেদনশীল শিল্পভাষায়। সীমিত পরিসরের মধ্যেও প্রদর্শনীটি সমসাময়িক শিল্পচর্চায় ভাবনা, অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতার এক সংবেদনশীল ও তাৎপর্যপূর্ণ উপসংহার টেনেছে। প্রদর্শনীটি চলবে ১৪ মার্চ পর্যন্ত।