
শিল্পী নিতুন কুন্ডুর মৃত্যুর পরপরই ২০০৬ সালের ২২ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোর শুক্রবারের সাময়িকীতে মতিউর রহমানের এ নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়। পরে ২০১৪ সালে প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা: কবিতা-গান-শিল্পের ঝরনাধারায়’ বইয়ে লেখাটি স্থান পায়। এত দিন প্রথম আলোর ছাপা কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকা লেখাটি আজ নিতুন কুন্ডুর মৃত্যুদিনে অনলাইন পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।
একটা একক চিত্র প্রদর্শনী হওয়ার কথা ছিল শিল্পী নিতুন কুন্ডুর। একবার তারিখ ঠিক করা হলো ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে, তারপর ২০০৬ সালের মার্চে। পরে সেই তারিখ আরও পিছিয়ে দেওয়া হলো। তিনি ভাবছিলেন, ছবির সঙ্গে বইয়ের প্রচ্ছদ ও প্রকাশনা, বিভিন্ন সময়ে করা পোস্টার এবং বিশেষ করে তাঁর ভাস্কর্য—সব মিলিয়ে বিরাট হইচই করে ৩৮ বছর পর একক প্রদর্শনীটি করবেন। সদা মহাব্যস্ত মানুষ নিতুন কুন্ডু, আমাদের নিতুনদা। এত বড় প্রতিষ্ঠান, কারখানা, এত লোক, এত রকম চিন্তাভাবনা—তার মধ্যেও প্রদর্শনীর জন্য ছবি আঁকছিলেন। বেশ কিছু ছবি জমেও ছিল। প্রদর্শনীর লক্ষ্যে অনেক দূর এগিয়েও গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই একক বড় চিত্র প্রদর্শনী আর করা হলো না।
এক-দুই দশক ধরে কতবার যে তিনি বলেছেন, ‘আমি আবার শিল্পকলার জগতে পুরোপুরি ফিরে যেতে চাই। শেষ পর্যন্ত শিল্পকর্ম নিয়েই থাকতে চাই।’
নিতুনদা শিল্পী হিসেবেই আমৃত্যু থাকতে চেয়েছিলেন। সে জন্য নিজের পছন্দের নতুন ইজেল করেছেন, ছাপযন্ত্র (প্রেস) বসিয়েছেন, ছবি করতে কম্পিউটারের ব্যবহার শিখেছেন—এসব নিয়েই কাজ করছিলেন। শিল্পী নিতুন কুন্ডুর সে ইচ্ছা আর পূরণ হলো না। একক প্রদর্শনীর আগেই তাঁকে চলে যেতে হলো। নিতুনদার সঙ্গে কথা হয়েছিল, ওই প্রদর্শনী নিয়ে আমি লিখব। তাঁর শিল্পীজীবন, জীবনসংগ্রাম নিয়ে লিখতে হবে আমাকে। তারিখ পিছিয়ে যায়, সময় চলে যায়। এভাবে একসময় নিতুনদাও আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। একে কি আমরা বিদায় বলব?
যখন নিতুনদাকে নিয়ে লিখছি, তখন তিনি আর আমাদের মাঝে নেই। আমরা জানতাম, তাঁর হৃদ্রোগ ছিল। ১৯৯২ সালে দিনরাত সার্ক ফোয়ারা নির্মাণের কাজ করছিলেন। যখন কাজ প্রায় শেষ, তখন তিনি হৃদ্রোগে গুরুতরভাবে আক্রান্ত হয়েছিলেন। সে খবর পেয়েই হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলাম। আমার হাত ধরে রেখেছিলেন অনেকক্ষণ। তাঁর দুচোখে তখন জল। পরে নিতুনদার হৃৎপিণ্ডে অস্ত্রোপচারও করতে হয়েছিল। তারপর তিনি আবার আগের মতোই বিপুল উদ্যমে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। যত দিন বেঁচে থাকবেন, মনের আনন্দে কাজ করে যাবেন—এটা ছিল তাঁর জীবনমন্ত্র। তিনি বেঁচে থাকতে চেয়েছিলেন সব সময় কাজের মধ্যে, শিল্পের মধ্যে। বাস্তবেও তাঁর মৃত্যু হলো কাজের মধ্যেই, যেন লড়াইয়ের মাঠে বীরের মতোই তিনি বিদায় নিলেন।
কাজ নিয়ে চীনে গিয়েছিলেন নিতুনদা। আগের রাতে ফিরেছেন। পরদিনই সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কারখানা আর স্টুডিওতে কাজ করতে করতেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন নিত্য গোপাল কুন্ডু; নিতুন কুন্ডু হিসেবেই যিনি সর্বাধিক পরিচিত। সে সময় আমি ছিলাম ভারতের চেন্নাই শহরে। তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর মেয়ে—তাঁর ‘মামণি’ অমিতি কুন্ডু ফোনে আমাকে জানায়, বাবা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ফলে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। দেশের বাইরে চিকিত্সার জন্য নেওয়ার মতো হলেই এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হবে, এমন আশা ছিল অমিতির। ভেবেছিল, নিতুনদা আবার জেগে উঠবেন। এমন খবর শোনার পর অমিতিকে কোনো কিছুই বলার ছিল না আমার।
অমিতিকে দেখে আসছি ওর ছোটবেলা থেকে, তখন আজিমপুরের বাসায় থাকতেন নিতুনদা। ১৯৭৪ সালে ওর জন্ম। মাঝখানে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিল, পড়ালেখা করে এসেছে স্থাপত্যবিদ্যায়, গৃহসজ্জায়। নিতুনদার বুকপকেটে সব সময় থাকত অমিতির একটা ছবি। এর উল্টো পিঠে থাকত ছেলে বাবু অর্থাৎ অনিমেষের ছবি। নিতুনদা এ ছবি ছাড়া কোথাও যেতেন না। কত ঘরোয়া অনুষ্ঠানে মেয়ের কথা বলতে বলতে আবেগে আপ্লুত হয়ে সবাইকে দেখাতেন সেই ছবি। একবার জাপানে গেলেন, ভুল করে সেই ছবি নেওয়া হয়নি। পরে ঢাকা থেকে কুরিয়ারের মাধ্যমে তা পাঠাতে হয়েছিল। কী আশ্চর্য, যেদিন তিনি অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন, সেদিন তাঁর প্রিয় মামণি আর বাবুর ছবি বুকপকেটে ছিল না। রাতে পরা জামা গায়ে দিয়েই অফিসে চলে গিয়েছিলেন সকালে। এখন সে জন্য ফাল্গুনী বউদির দুঃখের শেষ নেই। অমিতির জিজ্ঞাসা, ‘কেন এমন হলো?’ হয়তো বুকের কাছে মামণির ছবিটি থাকলে তার জাদুস্পর্শে তিনি জেগে উঠতেন!
১৯৫৫ সালে বলতে গেলে প্রায় সহায়-সম্বলহীনভাবে নিতুন কুন্ডু ঢাকায় আসেন। প্রকৌশলী হবেন নাকি শিল্পী—এই নিয়ে তিনি তখন ছিলেন দ্বিধাগ্রস্ত। শেষ পর্যন্ত তিনি শিল্পী হওয়ারই সিদ্ধান্ত নেন। ঢাকায় তখন তাঁর থাকার কোনো জায়গা ছিল না। শহীদ মিনারের পেছনে হোস্টেলের ব্যারাকের বারান্দা অথবা মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলে বন্ধুর কক্ষে মাটিতে বিছানা পেতে থাকতেন। টাকার অভাবে বহুদিন কাটিয়েছেন প্রায় না খেয়ে। সামান্য রোজগারের জন্য গুলিস্তান সিনেমা হলের ব্যানার-পোস্টার তৈরি করে দিয়েছেন, এঁকেছেন সামান্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে। এ রকম ছোটখাটো নানা কাজ করে তাঁর ছাত্রজীবন চালিয়েছেন। আর্ট কলেজের ছাত্রজীবনে ক্লাসের সহপাঠীদের মধ্যে ছাত্রীদের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল বেশ। সে জন্য তাঁদের কমনরুমে তাঁর যাতায়াত ছিল অবারিত। তখন মাখন লাগানো পাউরুটির প্রতি তাঁর খুব লোভ ছিল। কিন্তু খাওয়ার সাধ্য ছিল না। ছাত্রী বন্ধুদের কেউ তা দিলে খুব খুশি হয়ে খেতেন। এ কথা তিনি অনেকবার বলেছেন আমাদের। এ রকম অর্থকষ্টের মধ্যেও অদম্য সাহসের জন্য সেরা ছাত্রের স্বীকৃতি পান তিনি। নিজেকে শিল্পী হিসেবে গড়ে তোলেন। নানা দুঃখ-কষ্টের মধ্যে থেকেও সামনে এগিয়ে গেছেন আমাদের নিতুনদা।
১৯৫৯ সালে সে সময়ের ঢাকা আর্ট কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান নিয়ে বিএফএ (ব্যাচেলর অব ফাইন আর্টস) পাস করেন নিতুনদা। জীবনের স্বপ্ন ছিল শিল্পী হয়ে বেঁচে থাকবেন, শিক্ষকতা করবেন। কিন্তু সে সময় কলেজের অধ্যক্ষ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন তাঁকে শিক্ষকতা করার সুযোগ দেননি। এ নিয়ে তাঁর ক্ষোভ ছিল, কষ্ট ছিল। স্বাধীনতার পরও যখন নিতুনদার কোনো চাকরি ছিল না, তখনো একান্তভাবে চেয়েছিলেন ঢাকা আর্ট কলেজে (চারুকলা) শিক্ষকতা করতে। সতীর্থদের কারণে তখনো তিনি সে সুযোগ পেলেন না। মাঝখানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন চারুকলা বিভাগ খোলা হয়, সেখানেও চেষ্টা করেছিলেন। তখনো তাঁকে শিক্ষকতা করতে দেওয়া হয়নি। তিনি শিক্ষক হতে পারেননি। সে জন্য শিল্পকলার জগতে বিচরণের স্থায়ী ভূমি তৈরি করতে পারেননি। সেই কারণে কখনো কখনো তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁর কষ্টের কথা বহুবার আমাদের কাছে বলেছেন। এই দুঃখ তাঁর কোনো দিনও যায়নি। প্রবল এক বেদনাবোধ নিয়েই এই বিপুল ব্যস্ত জীবন আর তাঁর বর্ণাঢ্য পৃথিবী থেকে চলে যেতে হলো।
ছাত্র অবস্থাতেই নিতুন কুন্ডু সুকুমার শিল্পকর্মের জন্য সুনাম অর্জন করেছেন। পুরস্কৃত হয়েছেন। বাস্তবধর্মী কাজ দিয়ে শিল্পীজীবন শুরু করলেও ধীরে ধীরে তিনি বিমূর্ত চিত্রকলার দিকে চলে যান। তবে এ কথা ঠিক, বাস্তবতাকে কখনো পুরোপুরি বিসর্জন দেননি। মনে পড়ে ১৯৬৮ সালে মার্কিন তথ্যকেন্দ্রে তাঁর শেষ একক প্রদর্শনীর ছবিগুলোর কথা। মূর্ত আর বিমূর্ত শিল্পকর্মের মিলিত সে প্রদর্শনীতে তেলচিত্রের সঙ্গে ঢাকায় তখন প্রায় নতুন মাধ্যম সেরিগ্রাফের কতগুলো ভালো প্রিন্ট ছিল। তার মধ্যে একটা ছিল ‘মিছিল’ (প্রসেশন)। এই ছবির একটা প্রিন্ট সেই সময় তিনি আমাকে দিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর ঢাকায় ফিরে ছবিটি আর খুঁজে পাইনি।
১৯৬৯ কি ’৭০ সালে গুলশান জনতা ব্যাংকের জন্য তিনি তেলচিত্রের একটা ম্যুরাল করেছিলেন। নিতুনদার আজিমপুরের বাসায় দীর্ঘ সময় বসে বসে তাঁর ম্যুরাল আঁকা দেখতাম। বসার ঘরটা তেমন বড় ছিল না। মনে পড়ে, বৃষ্টি ছিল, আবহাওয়া ছিল স্যাঁতসেঁতে, রং কিছুতেই শুকাচ্ছিল না। তার মধ্যেই কাজ করেছেন। যেদিন ম্যুরালটা জনতা ব্যাংকের দেয়ালে লাগাবেন, সেদিন ট্রাকে নিতুনদার সঙ্গে আমরাও গিয়েছিলাম। এ রকম অজস্র স্মৃতি এখন মনের মধ্যে মিছিল করে আসে।
স্বাধীনতার পর নিতুনদা তখন আর কোনো কাজ, চাকরি বা আয়ের সংস্থান করতে না পেরে প্রথমে তাঁর আজিমপুরের বাসাতেই ঘর সাজানোর জিনিস তৈরির কাজ শুরু করেন। তারপর ১৯৭৫ সালে শুক্রাবাদে দ্য ডিজাইনার্স নামে একটা ওয়ার্কশপ চালু করেন। তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল মাটির ছাইদানি আর কাঠের নানা ধরনের নিত্যব্যবহার্য সামগ্রী তৈরির মধ্য দিয়ে। তার আগে কিছুদিন বিজ্ঞাপন সংস্থা বিটপীতে কাজ করেছেন। এরপর সত্তরের দশকের প্রায় শেষে তোপখানা রোডে আর্ট ইন ক্র্যাফট নামে টিনশেডের একটা ওয়ার্কশপ স্থাপন করেন। এভাবেই নিতুন কুন্ডু বিটপীর কর্ণধার রেজা আলীর সঙ্গে মিলে সেখানে অটবির যাত্রা শুরু করেন। মাটি আর কাঠের নানা পণ্যের সঙ্গে তিনি কোটপিন, ক্রেস্ট, ট্রফি, ঘর সাজানোর নানা সরঞ্জাম, ধাতব আসবাবপত্র তৈরি করতে শুরু করেন। সেই সময়ে প্রচুর কাজ করেছেন, কাউকেই কোনো কাজে না করেননি। আশি আর নব্বইয়ের দশকে প্রায় প্রতিটি জাতীয় কিংবা রাষ্ট্রীয় পুরস্কারের ট্রফি বা কাপ তৈরি করেছেন নিজ হাতে, সব পরিকল্পনাও ছিল তাঁর।
এভাবে পোড়ামাটি, কাঠ, চামড়া, লোহা, তামা বা সোনা দিয়ে নানা কাজ করতে করতে ১৯৮৪ সালে অটবিকে মিরপুরে নিয়ে যান এবং এককভাবে গড়ে তোলেন প্রতিষ্ঠানটিকে। আর তাঁকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ক্রমাগত তিনি সামনে এগিয়ে গেছেন। এভাবেই অটবি বড় থেকে আরও বড় হতে থাকে। এর পেছনে ছিল নিতুনদার অক্লান্ত শ্রম, মেধা আর শিল্পবোধ। এমনও সময় গেছে, যখন একনাগাড়ে দিনরাত কাজ করেছেন। কাজের ব্যাপারে তাঁর এমন একটা মনোভাব ছিল যে ‘আমি বিশ্রাম নেব না’। বলতেন, ‘কাজকে আমি সন্তানের মতো ভালোবাসি।’
নিতুনদা নতুন নতুন নকশায় নতুন নতুন সামগ্রী তৈরি করেছেন। নিজেও উদ্ভাবন করেছেন অনেক সামগ্রী। উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছেন কাঠ, লোহা, স্টিল, অন্যান্য ধাতু, এমনকি পরে প্লাস্টিকও। বিদেশ থেকে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের যন্ত্রপাতি আমদানি করে মিরপুরের পর শ্যামপুরে স্থাপন করেন বিরাট শিল্পকারখানা। সে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। মিরপুর ও শ্যামপুরের কারখানা এবং মতিঝিল ও গুলশান অফিসের স্থাপত্যভাবনা, নকশা ও প্রকৌশলকর্ম—সব তাঁর নিজের পরিকল্পনায় তৈরি করা। কতক মেশিনের ছোট-বড় নাট-বল্টু নিজে তৈরি করেছেন। কতক মেশিনের যন্ত্রাংশ তৈরি করেছেন। নতুন নতুন মেশিন উদ্ভাবন করেছেন। এমনকি শ্যামপুরে পুরো একটা লিফট তৈরি করেছিলেন তিনি, শুধু মোটরটি ছাড়া। এ রকম কাজপাগল, পরিশ্রমী মানুষ আমরা আর দেখিনি। তিনি যা দেখতেন, যা ভাবতেন, তা-ই তৈরি করতে পারতেন। শুধু চিত্রকলা বা ভাস্কর্যই নয়, আসবাবপত্রসহ নানা পণ্যের সবকিছুতেই ছিল তাঁর শৈল্পিক ছোঁয়া।
সোনারগাঁও হোটেলের মোড়ে দৃষ্টিনন্দন সার্ক ফোয়ারা ছাড়াও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনের ফোয়ারা কদম ফুল ইত্যাদি তাঁর সৃষ্টিশীল আধুনিক ভাস্কর্যের নিদর্শন। এসব এখন রয়েছে অযত্নে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বিরাট ভাস্কর্য ‘শাবাশ বাংলাদেশ’ তাঁর অনন্য সৃষ্টি, যা সব সময় আমাদের অনুপ্রাণিত করবে। কোনো কাজ পছন্দ হলে সে কাজ তিনি করেই ছাড়তেন। অর্থ পেলেন কি না, সে পরোয়া করতেন না। ‘শাবাশ বাংলাদেশ’ করার জন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে যে অর্থ তিনি পেয়েছিলেন, ব্যয় করেছিলেন তার চেয়ে বেশি।
জীবনযাপনে ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে। ঘড়ি ছিল তাঁর খুব পছন্দের জিনিস। পরেছেন সব সময় সাধারণ প্যান্ট-শার্ট। খাবারের তালিকায় থাকত খুব সাধারণ কিছু আর খেতেন পরিমিত। বিদেশে গেলে সঙ্গে চাল-ডাল আর আলু নিয়ে যেতেন, সেদ্ধ করে খেয়ে নিতেন। শুধু তাঁর জুতায় একটু বিশেষত্ব ছিল, তিনি সাধারণত কালো রঙের চেইন লাগানো বুটজুতা পরতেন—কি শীতে, কি গ্রীষ্মে। এ ধরনের জুতা পরার ফলে শক্ত পায়ে দাঁড়িয়ে কাজ করতে সুবিধা হতো। আমার কাছে নিতুনদাকে সব সময়ই একজন দারুণ সুন্দর মানুষ বলে মনে হয়েছে!
নিতুনদার সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৬৬ সালে ছাত্র ইউনিয়নের দশম প্রাদেশিক সম্মেলনের পোস্টার আনতে গিয়ে। তখন আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ইউনিয়ন ও সংস্কৃতি সংসদের কর্মী। নীল রঙের ওপর সাদা পায়রার ছবি—ওই দুই রঙের পোস্টারটি এখনো আমার চোখে ভাসে। ওই সম্মেলনের দ্বিতীয় পোস্টারটি করে দিয়েছিলেন আমাদের আরেক শিল্পীবন্ধু প্রাণেশ কুমার মণ্ডল। সেই পরিচয় থেকে ধীরে ধীরে আমরা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ি, একটা আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তারপর বছরের পর বছর ধরে তিনি আমাদের জন্য ড্রয়িং, একুশের স্মরণিকার প্রচ্ছদ, পোস্টার, মঞ্চ, মঞ্চসজ্জা, বড় তোরণ ইত্যাদি নানা কাজ করে দিয়েছেন। সাপ্তাহিক একতা পত্রিকার নামলিপিও তিনি করে দিয়েছিলেন। তখন তিনি ঢাকায় মার্কিন তথ্যকেন্দ্রের প্রধান শিল্পী। তাতে কি, চাকরির জন্য কোনো মায়া ছিল না। যেকোনো কাজে সদা প্রস্তুত। কখনো-সখনো শেষ সময়ে এসেও দুর্দান্ত সব কাজ করে দিতেন। কত ছোট, সামান্য কাজ নিয়ে গেছি তাঁর আজিমপুরের বাসায়, সেগুনবাগিচার অফিসে! তাঁর অফিসে কত সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা কাটিয়েছি কাজে-অকাজে গল্প করে। সেসব সময়ের অনেক কিছু ধূসর হয়ে গেলেও আজও কিছু কিছু মনে পড়ে।
বাংলাদেশের স্বাধিকার, স্বাধীনতা আন্দোলন যত এগিয়েছে, নিতুনদার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ততই আমাদের বেড়েছে। আবুল হাসনাত, মফিদুল হক আর আমি বয়সের ব্যবধান সত্ত্বেও আমরা তাঁর বন্ধু হয়ে গিয়েছিলাম। গল্প আর আলোচনায় ষাটের দশকের সেই উত্তাল দিনগুলোতে আমরা ফিরে গেছি বারবার। কখনো কখনো রেগে গিয়ে তিনি বলতেন, ‘তোদের জন্য কত সময় দিলাম, কত কিছু করলাম, এখন দেশের এ হাল কেন, বল!’
সেই ষাটের দশকের সময় আমরা কমিউনিস্ট আন্দোলনের নানা ‘নিষিদ্ধ’ কাজে কখনো তাঁর বাড়ি, কখনো তাঁর গাড়ি ব্যবহার করেছি। এসবের মধ্য দিয়ে আমাদের মধ্যে যোগাযোগ আরও বেড়েছে, গড়ে উঠেছে গভীর আত্মিক সম্পর্ক। একাত্তরের সশস্ত্র সংগ্রামের সময়ে নিতুনদার সাদা ভক্সওয়াগন গাড়িটি আমাদের রাজনৈতিক বন্ধুদের দিয়ে গিয়েছিলেন কাজের জন্য।
শুধু শিল্পসংক্রান্ত কাজ নয়; জীবনের সমস্ত দুঃখ-কষ্ট আর আনন্দ-বেদনার কথা বলেছি, একই সঙ্গে শুনেছি সাফল্যের কথা, বলাবলি করেছি স্বপ্নের কথা। সবকিছু আমরা ভাগ করে নিয়েছিলাম। নিতুনদার কথা যখন মনে পড়ে, তখন তাঁর লড়াকু জীবনযুদ্ধের কথা মনে পড়ে যায়।
মনে পড়ে, ২৫ মার্চের রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যার পর ২৭ তারিখে কারফিউ প্রত্যাহার করা হলে আমরা শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীকে খুঁজে পেলেও আজিমপুরে একই পাড়ায় বসবাসকারী নিতুন কুন্ডুর দেখা পাইনি। তাঁর জন্য আমরা উদ্বিগ্ন ছিলাম। পরে এপ্রিলে একবার আমি গ্রাম থেকে ঢাকায় এলেও তাঁর কোনো খোঁজ পাইনি। সেই ভয়ংকর সময়েও তোপখানা রোডের মার্কিন তথ্যকেন্দ্র অফিসের দরজায় গিয়ে তাঁর খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম।
এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে আমরা আমাদের সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘ পথ পায়ে পায়ে হেঁটে নৌকায় করে, বাসে চড়ে ত্রিপুরার আগরতলায় পৌঁছাই। সেখানে গিয়েও আমাদের চেষ্টা ছিল বাংলাদেশে যারা আমাদের বন্ধু, তাদের খুঁজে বের করা। আমরা সব সময় ঢাকায় অবস্থানরত কমরেডদের অনুরোধ জানাতাম নিতুনদাকে খুঁজে বের করতে। তাঁদের সাহায্যে একদিন হঠাৎ করেই নিতুনদা আগরতলায় আমাদের ক্র্যাফট হোস্টেল ক্যাম্পে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেদিন তাঁকে পেয়ে কী যে আনন্দ হয়েছিল! তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। সেদিন সারা দুপুর আমরা একসঙ্গে গল্প আর খাওয়াদাওয়া করি। আমাদের গল্প যেন আর শেষ হতে চায় না। তারপর তিনি কলকাতায় চলে যান। সেখানে শিল্পী কামরুল হাসান, দেবদাস চক্রবর্তী প্রমুখের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের কাজে জড়িয়ে পড়েন।
স্বাধীনতার পর ঢাকায় ফিরে নিতুনদা আর মার্কিন তথ্যকেন্দ্রের চাকরিতে যোগ দেননি। তখন তাঁর জীবনে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। কিন্তু এটা ছিল তাঁর সচেতন সিদ্ধান্ত। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে সরাসরি।
এখনো মনে পড়ে, ১৯৭২ সালে নিতুনদার বিয়েতে শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী, মফিদুল হকসহ আমরা কয়েকজন বরযাত্রী হয়ে কলকাতায় গিয়েছিলাম। সেদিন ঢাকা থেকে বিমানের ফ্লাইট বেশ কয়েক ঘণ্টা বিলম্ব হওয়ায় বিয়ের লগ্ন পেরিয়ে যায় কি না, তা নিয়ে আমাদের উদ্বেগের শেষ ছিল না। বিমানে সন্ধ্যায় কলকাতায় পৌঁছে দেখি, বর ও কনে দুই বাড়ির আত্মীয়রাই ভীষণ দুশ্চিন্তা নিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন।
ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে নব্বইয়ের দশকের শেষ পর্যন্ত আমাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, লেখালেখি, সাংবাদিকতা জীবনের বিস্তৃত সময়ে বহু কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীর সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়েছে, যোগাযোগ হয়েছে। আমরা সবার সহযোগিতা পেয়েছি। বলা যায়, বাংলাদেশে সেই ষাটের দশক থেকে গণতন্ত্রের জন্য লড়াইয়ে আমরা পাশাপাশি একসঙ্গে পথ চলেছি। তাঁদের মধ্যে আমরা সামনে পেয়েছি কামরুল হাসান, রণেশ দাশগুপ্ত, শহীদুল্লা কায়সার, শামসুর রাহমান, আলতাফ মাহমুদ, ইমদাদ হোসেন, দেবদাস চক্রবর্তী, সন্জীদা খাতুন, আনিসুজ্জামান, কাইয়ুম চৌধুরী, গোলাম মুস্তাফা, নিতুন কুন্ডু, অজিত রায়, রফিকুন নবীসহ অনেককে। তাঁদের কেউ কেউ মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। কারও মৃত্যু হয়েছে পরে। এই শিল্পী-সাহিত্যিকদের সবাই আমাদের জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন, এখনো করে চলেছেন। তাঁরা সবাই আমাদের জন্য গভীর প্রেরণার উত্স ছিলেন, এখনো আছেন।
নিতুন কুন্ডুর মতো প্রতিভা এ দেশে খুব বিরল। আমরা তো আমাদের চোখের সামনেই তাঁর নেতৃত্বে অটবির অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি দেখেছি। এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি আধুনিক, শিল্পসম্মত ও রুচিশীল সামগ্রী তৈরি করেছেন। তাঁর অধীনে কাজ করেছে মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারসহ অন্যান্য পেশার অনেক মানুষ। অটবির কর্মিসংখ্যা এখন প্রায় দুই হাজার। এককথায় বলা চলে, সব সময় তিনি চলতেন সময়ের আগে আগে। এ রকম একজন সৎ, নিষ্ঠাবান ও পরিশ্রমী মানুষকে কাছ থেকে দেখা জীবনের এক বিরল অভিজ্ঞতা।
অত্যন্ত মা-ভক্ত ছিলেন নিতুনদা। মা বীণাপাণি কুন্ডু আর বাবা জ্ঞানেন্দ্রনাথ কুন্ডুকে ভীষণ মান্য করতেন। গভীর ভালোবাসতেন স্ত্রী ফাল্গুনী কুন্ডুকে। তাঁর দুটি সুন্দর ও যোগ্য ছেলেমেয়েকে ভালো ছাত্র ও মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সব সময় স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতার কথা বলতেন। মেয়ে অমিতি ও ছেলে অনিমেষ যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা শেষ করে দেশে ফিরে এসে অটবির বিশাল সাম্রাজ্যের হাল ধরেছে। আমরা আশা করব, বাবা নিতুন কুন্ডুর প্রচণ্ড ভালোবাসায় সিক্ত অমিতি-অনিমেষ অটবিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে। ওদের প্রতি রয়েছে আমাদের ভালোবাসা।
একটা কথা না বললেই নয়। বাংলাদেশে বিগত দশকগুলোতে একজন সংখ্যালঘু নাগরিকের জন্য সামগ্রিক পরিস্থিতি খুব সহায়ক ছিল না। নিতুনদার বন্ধুবান্ধব, ঘনিষ্ঠজনদের অনেকেই ভারতে চলে গেছেন। কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো দেশে গিয়ে স্থায়ী বসতি গড়েছেন। অনেকেই নিতুনদাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন ভারত বা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে বসবাস করতে। বলেছেন, ‘ছেলেমেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে থাকে, আপনারাও সেখানে গিয়ে স্থায়ীভাবে থাকুন।’ এ ব্যাপারে তাঁর সোজাসাপ্টা জবাব ছিল, ‘আমার এই জন্মভূমি, এই বাংলাদেশ ছেড়ে আমি কোথাও যাব না। যত বাধাবিপত্তি আসুক, আমি এ দেশেই থাকব, ঢাকাতেই থাকব। এ দেশ গড়ে তোলায় ভূমিকা রাখব।’
নিতুনদা তাঁর কথা রেখেছেন। তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা কখনো ভাবেননি। এ দেশেই থেকেছেন, এ দেশেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এ দেশের আলো-বাতাসেই মিশে গেছে তাঁর দেহভস্ম। নিত্য গোপাল কুন্ডু, আমাদের প্রিয় নিতুনদা, শুধু আমাদের কাছেই নন; দেশের মানুষের সামনে ভবিষ্যতেও উজ্জ্বল তারকা হিসেবেই দীপ্যমান থাকবেন।
আজও গভীর বেদনার সঙ্গে মনে পড়ে, আমার প্রতি, আমাদের প্রতি নিতুনদার ভালোবাসার কথাগুলো, স্মৃতিগুলো। প্রথম আলো প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রতি শীতে নভেম্বরে গুলশানের হোটেল স্যাফরনে স্বজন-বন্ধুদের জন্য বড় একটা প্রীতিসম্মিলনের আয়োজন করেছি। প্রতিটি অনুষ্ঠানে নিতুনদা আসতেন। পুরোটা সময় থেকে সবার শেষে আমাদের সঙ্গে খেয়েছেন, আমাদের সঙ্গে একই সময়ে গাড়িতে উঠে বিদায় নিয়েছেন। বিদায় নেওয়ার আগে প্রতিবার নিবিড় উষ্ণতায় হাতে হাত ধরে রাখতেন কিছুটা সময়। আমাদের সাফল্যে নিতুনদার আনন্দ ও উষ্ণতা অনুভব করতাম গভীরভাবে। আমাদের জন্য তাঁর মনের গভীরে একটা গর্বও ছিল। এই ছিলেন আমাদের নিতুনদা।
শেষের বছরগুলোতে কাজের ব্যস্ততায় দেখা হতো কম। দেখা হলেই সেই উষ্ণতা আর গভীর অন্তরঙ্গতায় মুগ্ধ হতাম—কখনো তাঁর বাসায়, কখনো আমাদের বাসায়। এ দুঃখ এখন আমার যায় না যে নিতুনদার সঙ্গে আরও বেশি বেশি দেখা হলো না কেন, কেন আরও কথা হলো না? এ দুঃখ কোনো দিনই যাবে না। যখনই নিতুনদার কথা মনে পড়ে, চোখে পানি চলে আসে, বুকের ভেতরটায় হাহাকার করে ওঠে।