শিল্পী অরূপ বড়ুয়ার একক প্রদর্শনী ‘অঙ্কুরোদ্‌গম’
শিল্পী অরূপ বড়ুয়ার একক প্রদর্শনী ‘অঙ্কুরোদ্‌গম’

প্রদর্শনী

মনন ও সবুজতার শিল্পভাষ্যে অঙ্কুরোদ্গম

‘যুদ্ধ থেমে যাক, মানুষ বাঁচুক, তাদের সবুজ বাগান যেন রক্ষা পায়’—এই আকুতিই যেন ছড়িয়ে ছিল রাজধানীর সফিউদ্দীন শিল্পালয়ের চারদিকে; শিল্পী অরূপ বড়ুয়ার ‘অঙ্কুরোদ্‌গম’ শীর্ষক একক প্রদর্শনীতে। ৬ আগস্ট শুরু হয়ে ৯ আগস্ট শেষ হয়েছে ভাস্কর ও পুতুলশিল্পী অরূপ বড়ুয়ার একক শিল্প প্রদর্শনী ‘অঙ্কুরোদ্‌গম’। 

প্রদর্শনীর তারিখ নির্ধারণেও ছিল ইতিহাসের এক গভীর অনুরণন—১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট পারমাণবিক বোমায় বিধ্বস্ত হয়েছিল জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি। এই স্মৃতির গর্ভেই জন্ম নিয়েছে প্রদর্শনীর মূল ভাবনা। এই ইতিহাসের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে অরূপ বড়ুয়া তাঁর শিল্পকর্মের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন যুদ্ধবিধ্বস্ত জাতির মনস্তাত্ত্বিক উত্তরণ, অন্তর্গত প্রাণশক্তি ও সবুজের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিপ্রায়।

শিল্পী অরূপ বড়ুয়ার একক প্রদর্শনী ‘অঙ্কুরোদ্‌গম’

অঙ্কুরোদ্‌গম শিল্পীর দ্বিতীয় একক প্রদর্শনী। প্রদর্শিত শিল্পকর্মগুলো সবুজের সঙ্গে সম্পৃক্ত; একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহৃত হয়েছে। মস্তিষ্কের দিকে চিন্তার বিকাশ অব্যাহত দেখাতে অঙ্কুরোদ্‌গমের চলমানতা তুলে ধরা এই শিল্পী জাপানি মনস্তত্ত্বের সঙ্গে এর মিল খুঁজে পেয়েছেন। 

শিল্পী অরূপ বড়ুয়ার একক প্রদর্শনী ‘অঙ্কুরোদ্‌গম’

প্রদর্শনীতে মোট ১০টি শিল্পকর্মে গঠিত একটি সিরিজ ছিল, যেখানে সবুজ প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তুলে ধরতে ব্যবহৃত হয়েছে কাঠ, মাটি, পাতা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক উপকরণ। যুদ্ধের পর ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানো জাপানিদের মানসিক বলিষ্ঠতা এবং প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল মনোভাব শিল্পীর বিবেচনায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

শিল্পী অরূপ বড়ুয়ার একক প্রদর্শনী ‘অঙ্কুরোদ্‌গম’

শুধু ইতিহাস নয়, এই প্রদর্শনী হয়ে উঠেছে বর্তমান বিশ্বের প্রতি এক সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়াও। চলমান যুদ্ধ, অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও পরিবেশ বিপর্যয়ের যুগে শিল্পীর আহ্বান, মানুষ যেন বাঁচে, প্রকৃতি যেন বাঁচে। অরূপ বড়ুয়ার কাজের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে জাপান। যে দেশ বারবার বিপর্যয়ের মুখে পড়েও আত্মপ্রতিষ্ঠায় বিশ্বে একটি ‘চলমান পাঠশালা’ হয়ে উঠেছে। শিল্পীর দৃষ্টিতে, ‘প্রকৃতিকে বন্ধু হিসেবে দেখার জাপানি মনোভাব তাদের জাতীয় চরিত্রের অংশ। সেই মানসিকতার মধ্যেই নিহিত রয়েছে চিন্তার অঙ্কুরোদ্‌গম।’

শিল্পী অরূপ বড়ুয়ার একক প্রদর্শনী ‘অঙ্কুরোদ্‌গম’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাস্কর্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা অরূপ বড়ুয়া বর্তমানে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যতত্ত্ব বিভাগে পুতুলনাট্যের অতিথি শিক্ষক। তাঁর শৈল্পিক অনুশীলনে পুতুলনাচের আখ্যানধর্মী গতি ও ত্রিমাত্রিক ভাস্কর্যশিল্পের সংমিশ্রণ তৈরি করেছে একটি স্বতন্ত্র শিল্পভাষা—যেখানে বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং আধুনিক ভাবনার একটি সেতুবন্ধ স্থাপিত হয়েছে।

শিল্পী অরূপ বড়ুয়ার একক প্রদর্শনী ‘অঙ্কুরোদ্‌গম’

‘অঙ্কুরোদ্‌গম’ তাই শুধুই একটি শিল্প প্রদর্শনী নয়—এটি একধরনের মৌন ভাষ্য, যেখানে যুদ্ধ ও ধ্বংসের বিপরীতে উচ্চারিত হয়েছে সবুজ, শান্তি ও মানবিকতার সংহত কণ্ঠস্বর। শিল্পী অরূপ বড়ুয়ার এই আয়োজন হয়ে উঠেছে শান্তির পক্ষে দাঁড়ানো এক শৈল্পিক বিবৃতি।