
মূল বুকার পুরস্কার সাধারণত ইংরেজিতে লেখা ও যুক্তরাজ্য বা আয়ারল্যান্ডে প্রকাশিত উপন্যাসের জন্য প্রদান করা হয়। অন্যদিকে, ‘ইন্টারন্যাশনাল বুকার প্রাইজ’ দেওয়া হয় এমন বইকে, যা অন্য ভাষা থেকে ইংরেজিতে অনূদিত।
বুকার পুরস্কারের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৬৯ সালে, তখন এর নাম ছিল ‘বুকার-ম্যাককনেল প্রাইজ’। পরে স্পনসর বদলে তা হয় ‘ম্যান বুকার প্রাইজ’, আর এখন কেবল ‘দ্য বুকার প্রাইজ’। সময়ের সঙ্গে নাম বদলেছে, নিয়ম বদলেছে, কিন্তু এই পুরস্কারের মূল উদ্দেশ্য অপরিবর্তিত—ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত সেরা উপন্যাসগুলো পাঠকের সামনে তুলে আনা। প্রায়ই দেখা যায়, নোবেলজয়ী লেখকেরাও আগে থেকেই বুকার পুরস্কারের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। এ বছর সাহিত্যে নোবেলজয়ী লাসলো ক্রাসনাহোরকাই যেমন ২০১৫ সালে পেয়েছিলেন ‘ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ’।
মূল বুকার পুরস্কার সাধারণত ইংরেজিতে লেখা ও যুক্তরাজ্য বা আয়ারল্যান্ডে প্রকাশিত উপন্যাসের জন্য প্রদান করা হয়। ২০১৪ সাল থেকে লেখকের জাতীয়তা–নির্বিশেষে, ইংরেজি ভাষায় লেখা যেকোনো লেখকের জন্য এই পুরস্কারকে উন্মুক্ত করা হয়েছে, তবে এর আগে জাতীয়তাও বিবেচিত হতো। অন্যদিকে, ‘ইন্টারন্যাশনাল বুকার প্রাইজ’ দেওয়া হয় এমন বইকে, যা অন্য ভাষা থেকে ইংরেজিতে অনূদিত। ২০১৫ সালে ক্রাসনাহোরকাই যে পুরস্কার পেয়েছিলেন, সেটি ছিল সেই অনুবাদ সাহিত্য শাখায়। অর্থাৎ, ‘বুকার’ ও ‘ইন্টারন্যাশনাল বুকার’ দুটি ভিন্ন ধারা। প্রথমটি মূলত ইংরেজি ভাষার মৌলিক সাহিত্য, দ্বিতীয়টি বিশ্বের নানা ভাষা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করা সাহিত্যের জন্য। একসময় এটি ‘ম্যান বুকার’ নামে পরিচিত ছিল, কারণ স্পনসর ছিল ‘ম্যান গ্রুপ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। পরে স্পনসর বদলে গেলে নাম থেকেও ‘ম্যান’ উঠে যায়।
বুকার পুরস্কারের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৬৯ সালে, তখন এর নাম ছিল ‘বুকার-ম্যাককনেল প্রাইজ’। পরে স্পনসর বদলে তা হয় ‘ম্যান বুকার প্রাইজ’, আর এখন কেবল ‘দ্য বুকার প্রাইজ’। সময়ের সঙ্গে নাম বদলেছে, নিয়ম বদলেছে, কিন্তু এই পুরস্কারের মূল উদ্দেশ্য অপরিবর্তিত।
এ বছরের আন্তর্জাতিক বুকার ইতিমধ্যে ঘোষিত হয়ে গেছে। ভারতের কর্ণাটকের লেখিকা বানু মুস্তাকের লেখা ‘হার্ট ল্যাম্প’ পেয়েছে এ বছরের আন্তর্জাতিক বুকার প্রাইজ। দীপা ভাস্তির অনুবাদে কন্নড়া থেকে ইংরেজিতে অনূদিত এই ‘বারোটি গল্পের সংকলন’ দক্ষিণ ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়ের নারী ও কন্যাদের জীবনের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে। বিশ্বাস, ধর্ম, জাতিগত বিভেদ ও ক্ষমতার সীমানায় দাঁড়িয়ে থাকা একদল নারীর অভ্যন্তরীণ জীবনচিত্র এই বইয়ের প্রাণ।
অন্যদিকে, এ বছরের মূল বুকার প্রাইজের লংলিস্টে ছিল ১৩টি বই। সেখান থেকে শর্টলিস্টে স্থান পেয়েছে ছয়টি। এই ছয়টি বই আন্তর্জাতিক সাহিত্য অঙ্গনের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ছিল গত বেশ কিছু দিন। অবশেষে ১০ নভেম্বর ২০২৫ লন্ডনের এক অনুষ্ঠানে ঘোষিত হলো বিজয়ী বইটির নাম।
এ বছরের শর্টলিস্টে ছিল ‘ফ্লেশ’ (ডেভিড স্যালাই), ‘দ্য ল্যান্ড ইন উইন্টার’ (অ্যান্ড্রু মিলার), ‘দ্য রেস্ট অব আওয়ার লাইভস’ (বেন মার্কোভিটস), ‘অডিশন’ (কেটি কিতামুরা), ‘দ্য লোনলিনেস অব সোনিয়া অ্যান্ড সানি’ (কিরণ দেসাই) এবং ‘ফ্ল্যাশলাইট’ (সুসান চোই)। প্রতিটি বইয়ের মধ্যেই উঠে এসেছে সময়, সম্পর্ক, পরিচয়, মানবমনের অনিশ্চয়তা আর বর্তমান পৃথিবীর পরিবর্তিত বাস্তবতা।
শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের বুকার প্রাইজ জিতে নিলেন ডেভিড স্যালাই, তাঁর উপন্যাস ‘ফ্লেশ’–এর জন্য। মানুষের শরীর, সময় আর অস্তিত্বের টানাপোড়েনকে কেন্দ্র করে লেখা এই বইতে স্যালাই দেখিয়েছেন—বেঁচে থাকা আসলে ক্রমাগত পরিবর্তনকে গ্রহণ করার শিল্প।
ডেভিড স্যালাইয়ের ‘ফ্লেশ’ এমন এক উপন্যাস যেখানে মানুষের দেহ, সময় ও অস্তিত্বের টানাপোড়েন এক আশ্চর্য সংযত গদ্যে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। হাঙ্গেরিতে বেড়ে ওঠা এক সাধারণ তরুণ ইস্তভানের জীবনের মধ্য দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন, বেঁচে থাকা মানে কীভাবে ক্রমাগত পরিবর্তনের সঙ্গে লড়াই করা। ভালোবাসা ও একাকিত্বের ভেতর পৃথিবীকে অনুভব করার এক গল্প এই বই। জীবনের ভেতর দাগ কাটা ছোট ছোট মুহূর্তগুলো এখানে মাংসের মতোই স্পর্শযোগ্য হয়ে ওঠে।
অ্যান্ড্রু মিলারের ‘দ্য ল্যান্ড ইন উইন্টার’ প্রকৃতি ও মানুষের পারস্পরিক নির্ভরতার গল্প। কঠিন এক শীতকালীন প্রেক্ষাপটে দুই দম্পতির ভ্রমণ, যাত্রাপথে জীবনের অর্থ খোঁজার কাহিনি। মানুষের নিঃসঙ্গতা ও বেঁচে থাকার তাগিদ অনুসন্ধান করার কাহিনি। বরফে ঢাকা প্রকৃতি এখানে যেন মানবজীবনের প্রতীক। এক অনন্ত শীতের মধ্য দিয়ে মানুষের উষ্ণতা খোঁজার গল্প এটি। মিলারের ভাষা কবিতার মতো, যেখানে নিঃসঙ্গতা ও প্রকৃতির নির্মম সৌন্দর্য একে অপরের প্রতিচ্ছবি।
বেন মার্কোভিটসের ‘দ্য রেস্ট অব আওয়ার লাইভস’ একই সঙ্গে পরিবার, সময় ও প্রজন্মের গল্প। এটি বয়স, সম্পর্ক ও আত্মপরিচয়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলা এক দীর্ঘ যাত্রা। মার্কোভিটস পাঠককে এমন এক আয়নায় দাঁড় করান যেখানে প্রত্যেক মানুষ নিজের জীবনচক্রকে চিনে ফেলতে পারে।
কেটি কিতামুরার ‘অডিশন’ উপন্যাসে তুলে তিনি তুলে এনেছেন পারফরম্যান্সের ভেতরের এক গভীর টানাপোড়েন। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যেন একেকটি অডিশন, যেখানে আমরা ক্রমাগত অন্যদের চোখে নিজেদের চরিত্র হিসেবে সাজাই। সম্পর্কের টানাপোড়েন, ব্যক্তিগত সংকট আর আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান—সবকিছু মিশে এখানে তৈরি হয়েছে এক শান্ত অথচ তীব্র নাটকীয় উপাখ্যান।
কিরণ দেসাইয়ের ‘দ্য লোনলিনেস অব সোনিয়া অ্যান্ড সানি’ মানুষের একাকিত্ব ও প্রবাসী জীবনের গভীর অনুধাবন নিয়ে লেখা। দীর্ঘ বিরতির পর এই বই নিয়ে ফিরে এসেছেন লেখক। দুই চরিত্র সোনিয়া ও সানির মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, দূরদেশে থেকেও মানুষ কীভাবে শিকড় ও স্মৃতির টান অনুভব করে। ভাষা, ভালোবাসা ও পরিচয়ের জটিলতাকে দেসাই এমন সংবেদনশীল গদ্যে ফুটিয়েছেন, যা একই সঙ্গে বিষণ্ন ও উষ্ণ।
সুসান চোইয়ের ‘ফ্ল্যাশলাইট’ স্মৃতি, অপরাধবোধ আর পুনরুদ্ধারের গল্প। সুসান চোই মানুষের মনের অন্ধকার কোণে আলো ফেলেছেন এমন এক দৃষ্টিতে, যা একই সঙ্গে নির্মম ও মমতাময়। অতীতের ভারে নুয়ে পড়া চরিত্রগুলো এখানে নিজেদের আলো খুঁজে ফেরে। তার সংযত গদ্যে জীবনের প্রতিটি ফ্ল্যাশব্যাক হয়ে ওঠে এক ঝলক আলো, যা মুহূর্তের মধ্যেই অন্ধকারে মিশে যায়।
শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের বুকার প্রাইজ জিতে নিলেন ডেভিড স্যালাই, তাঁর উপন্যাস ‘ফ্লেশ’–এর জন্য। মানুষের শরীর, সময় আর অস্তিত্বের টানাপোড়েনকে কেন্দ্র করে লেখা এই বইতে স্যালাই দেখিয়েছেন—বেঁচে থাকা আসলে ক্রমাগত পরিবর্তনকে গ্রহণ করার শিল্প। বিচারকদের মতে, ‘ফ্লেশ একাধারে গভীর দার্শনিক আর নির্মোহ মানবিক উপন্যাস, যা আধুনিক জীবনের অনিশ্চয়তাকে নতুনভাবে অনুভব করায়।