যুক্তরাজ্যের বেস্টসেলার ৯টি বইয়ের প্রচ্ছদ অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো
যুক্তরাজ্যের বেস্টসেলার ৯টি বইয়ের প্রচ্ছদ অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

দেশে–বিদেশে

বেস্টসেলার ১০ উপন্যাসের ৯টিতেই নারী চরিত্র খুন

একটি বইয়ের দোকানে ঢুকলেন। চোখ বোলালেন বেস্টসেলার তালিকায়। একটি, দুটি নয়, প্রায় সব বইয়ের গল্পেই একজন নারী খুন হয়েছেন। এটি কি নিছক কাকতালীয়? নাকি পাঠকের চাহিদা পূরণে লেখকেরা একই গল্প বারবার লিখে চলেছেন?

সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের বেস্টসেলার উপন্যাসের তালিকা ঘিরে এমনই একটি প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দেখা গেছে, সপ্তাহের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া ১০টি কথাসাহিত্যের পেপারব্যাক বইয়ের মধ্যে ৯টিতেই অন্তত একজন নারীকে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনাটি শুধু সাহিত্যপ্রেমীদের নয়, লেখক ও সমালোচকদের মধ্যেও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

ফ্রিডা ম্যাকফ্যাডেনের ‘দ্য ডিভোর্স’ বইয়ের প্রচ্ছদ

বেস্টসেলার তালিকার ১০টির মধ্যে ৯টি বইয়ে একজন নারীর হত্যাকাণ্ডের এ পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে ভাবনার। তবে এর কারণ একরৈখিক নয়।

কেউ বলছেন, এটি নারীর প্রতি সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তুলছে। আবার কারও মতে, এই গল্পগুলো মানুষের ভয়, উদ্বেগ ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষাকেই তুলে ধরে।

সানডে টাইমস–এ প্রকাশিত বেস্টসেলার তালিকায় ছিল ড্যান ব্রাউনের দ্য সিক্রেট অব সিক্রেটস, ফ্রিডা ম্যাকফ্যাডেনের দ্য ডিভোর্স, ফ্লরেন্স ন্যাপের দ্য নেমস, ক্লেয়ার ডগলাসের দ্য ফ্যামিলি ফ্রেন্ড, জন গ্রিশামের দ্য উইডো, রিচার্ড ওসমানের দ্য ইমপসিবল ফরচুন, রবার্ট গ্যালব্রেইথের দ্য হলমার্কড ম্যান, অ্যালিস ফিনির মাই হাজব্যান্ডস ওয়াইফ ও ফিলিপা গ্রেগরির বোলিন ট্রেইটর

ক্লেয়ার ডগলাসের ‘দ্য ফ্যামিলি ফ্রেন্ড’ বইয়ের প্রচ্ছদ

ঐতিহাসিক উপন্যাস, মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার, গার্হস্থ্য রহস্য কিংবা পুলিশি তদন্ত—ধরন ভিন্ন হলেও একটি জায়গায় সব বই এক। প্রতিটি গল্পের কেন্দ্রেই রয়েছে অন্তত একজন নারীর মৃত্যু।

কেবল দ্য করেসপনডেন্ট নামে একটি উপন্যাস এ ধারার বাইরে। চিঠি লেখার শিল্পকে ঘিরে লেখা বইটিতে এমন কোনো হত্যাকাণ্ড নেই।

জন গ্রিশামের ‘দ্য উইডো’ বইয়ের প্রচ্ছদ

বিষয়টি প্রথম প্রকাশ্যে আনেন ব্রিটিশ লেখক ওয়েন্ডি জোনস। ইনস্টাগ্রামে তিনি লেখেন, ‘এ সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের মানুষ যে বইগুলো সবচেয়ে বেশি কিনেছে ও পড়েছে, তার ৯০ শতাংশ বিনোদনের জন্য একজন নারীকে হত্যা করা হয়েছে। আসলে কী ঘটছে?’

জোনসের এ মন্তব্য দ্রুতই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। অবশ্য যুক্তরাজ্যে নারী হত্যাকে কেন্দ্র করে গল্প লেখা নতুন কোনো বিষয় নয়।

অ্যালিস ফিনির ‘মাই হাজব্যান্ডস ওয়াইফ’ বইয়ের প্রচ্ছদ

ড্যাফনি ডু মরিয়েরের গথিক রহস্য থেকে শুরু করে গিলিয়ান ফ্লিনের মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারে দীর্ঘদিন ধরেই খুন হওয়া নারী একটি বহুল ব্যবহৃত কাহিনির উপাদান।

বিশেষ করে ২০১২ সালে গিলিয়ান ফ্লিনের গন গার্ল প্রকাশের পর নারীকে কেন্দ্র করে থ্রিলার লেখার প্রবণতা আরও বেড়ে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় প্রকাশনা সংস্থাগুলো পরবর্তী সফল ‘গার্ল থ্রিলার’ খুঁজতে থাকে।

রবার্ট গ্যালব্রেইথের ‘দ্য হলমার্কড ম্যান’ বইয়ের প্রচ্ছদ

সমালোচকদের একাংশের মতে, সাহিত্যে বারবার নারীকে হত্যার শিকার হিসেবে দেখানো সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতাকে একধরনের স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

তবে বিষয়টির আরেকটি দিকও রয়েছে। অপরাধভিত্তিক গল্পের সবচেয়ে বড় পাঠকগোষ্ঠী কিন্তু নারীরাই।

অনেক গবেষকের মতে, বাস্তব জীবনের ভয়, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতাকে বোঝার এবং মানসিকভাবে মোকাবিলা করার একটি উপায় হিসেবেই অনেক নারী এ ধরনের বই পড়েন।

ফিলিপা গ্রেগরির ‘বোলিন ট্রেইটর’ বইয়ের প্রচ্ছদ

অপরাধভিত্তিক সাহিত্যিক লরা উইলসন মনে করেন, বর্তমানে গার্হস্থ্য থ্রিলার বা ডমেস্টিক নোয়ার জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম কারণ বাস্তব জীবনের আশঙ্কা।

উইলসনের ভাষায়, বাস্তবে নারী হত্যার ঘটনায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হত্যাকারী কোনো অচেনা ব্যক্তি নন; বরং স্বামী, সঙ্গী বা পরিবারের পরিচিত কেউই অনেক সময় হত্যাকারী হন। এ কারণেই এসব গল্প অনেক পাঠকের কাছে বাস্তবতার প্রতিফলন বলে মনে হয়।

ফ্লরেন্স ন্যাপের ‘দ্য নেমস’ বইয়ের প্রচ্ছদ

উইলসন আরও বলেন, শিল্পসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জরিপেই দেখা গেছে, অপরাধভিত্তিক উপন্যাসের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ও পাঠক নারীরাই।

ঔপন্যাসিক ডেনিস মিনা মনে করেন, নারী হত্যার গল্প জনপ্রিয় হওয়ার অর্থ এই নয় যে পাঠকেরা সহিংসতা উপভোগ করেন; বরং তাঁরা জানতে চান, কী ঘটেছিল এবং অপরাধী শেষ পর্যন্ত শাস্তি পেল কি না।

মিনার মতে, গল্প তখনই এগিয়ে যায়, যখন পাঠক নিহত মানুষটির জন্য সত্যিই উদ্বিগ্ন হন।

যুক্তরাষ্ট্রের অপরাধবিজ্ঞানী ও হোয়াই উই লাভ সিরিয়াল কিলারস বইয়ের লেখক স্কট বন বলেন, অনেক নারী তাঁকে জানিয়েছেন, তাঁরা ‘ট্রু-ক্রাইম’ পডকাস্ট ও তথ্যচিত্র দেখেন আত্মরক্ষার কৌশল শেখার জন্য।

ড্যান ব্রাউনের ‘দ্য সিক্রেট অব সিক্রেটস’ বইয়ের প্রচ্ছদ

অপরাধভিত্তিক লেখক লরি রাডার-ডে মনে করেন, অপরাধভিত্তিক উপন্যাস মানুষের উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করে। বর্তমান সময়ের সামাজিক উপন্যাসই হলো ক্রাইম নভেল। বাস্তব পৃথিবী যত অনিশ্চিত হয়ে উঠছে, এসব গল্প মানুষের উদ্বেগকে নিরাপদ একটি জায়গা দেয়।

লরি রাডার-ডে বলেন, বাস্তব জীবনের মৃত্যুর মতো নয়, অধিকাংশ অপরাধভিত্তিক উপন্যাসে শেষ পর্যন্ত রহস্যের সমাধান হয় এবং শৃঙ্খলা ফিরে আসে। আর এ পরিণতিই পাঠককে একধরনের মানসিক স্বস্তি দেয়।

তবে লরি রাডার-ডের মতে, অধিকাংশ অপরাধভিত্তিক উপন্যাসে নিহত নারীকে প্রায় একইভাবে উপস্থাপন করা হয়। যেমন তরুণী, সুন্দরী, রোগা, শ্বেতাঙ্গ, স্বর্ণকেশী বা লাল চুলের।

রিচার্ড ওসমানের ‘দ্য ইমপসিবল ফরচুন’ বইয়ের প্রচ্ছদ
অপরাধভিত্তিক সাহিত্যিক সোফি হান্না মনে করেন, গল্পে সহিংসতা দেখানো আর সহিংসতাকে সমর্থন করা এক বিষয় নয়।

লরি রাডার-ডের মতে, এটি একধরনের সাহিত্যিক শর্টকাট। এতে নিহত মানুষটিকে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে তুলে ধরার বদলে কেবল একটি প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এর পেছনে এখনো সমাজে টিকে থাকা বর্ণবাদ ও নারীবিদ্বেষের প্রভাবও রয়েছে।

খ্যাতিমান অপরাধভিত্তিক সাহিত্যিক ভ্যাল ম্যাকডারমিড বলেন, সব লেখককে এক কাতারে ফেলা ঠিক নয়।

অপরাধভিত্তিক সাহিত্যিক সোফি হান্না মনে করেন, গল্পে সহিংসতা দেখানো আর সহিংসতাকে সমর্থন করা এক বিষয় নয়। তাঁর মতে, বাস্তব পৃথিবীতে মানুষ মানুষকে আঘাত করবেই। তাই সাহিত্যের কাজ সেই সহিংসতাকে নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিশ্লেষণ করা এবং শেষ পর্যন্ত অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করা।