গ্রাফিকস: প্রথম আলো
গ্রাফিকস: প্রথম আলো

বইপত্র

ইতিহাসের অন্দরমহলে উঁকি

মাহবুব তালুকদারকে চিনতাম একজন নীতিমান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে। শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের সামনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যরা যখন ‘জি হুজুর জি হুজুরে’ ব্যস্ত, তখন একমাত্র তিনিই সত্য উচ্চারণ করেছিলেন। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে যিনি উল্লেখ করেছিলেন ‘ব্যর্থতার গ্লানি’ হিসেবে। তবে তিনি যে প্রথম জীবনে একজন সাংবাদিক, পরে মুজিবনগর সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ছিলেন, সে বিষয়ে আমার ধারণা ছিল না। ১৯৯৯ সালে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে অবসর নেওয়ার আগে তিনি এক বর্ণাঢ্য কর্মজীবন পার করেছেন। যার মধ্যে অন্যতম ছিল বঙ্গভবনে পাঁচ বছর চাকরির অনন্য অভিজ্ঞতা। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গভবনে চারজন রাষ্ট্রপতির অধীনে কাজ করেছেন। খুব কাছ থেকে দেখেছেন বাংলাদেশের উত্থান-পতন। মাহবুব তালুকদারের এই অমূল্য অভিজ্ঞতা নিয়েই ‘বঙ্গভবনে পাঁচ বছর’। 

মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব তালুকদার বঙ্গভবনে কাজ শুরু করেন রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর বিশেষ সহকারী হিসেবে। তখন দেশের নতুন শাসনতন্ত্র তৈরির কাজ চলছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, বাংলাদেশের সংবিধান হবে আইরিশ কাঠামোর। যাতে রাষ্ট্রপতি থাকবেন শুধুই কিছু আনুষ্ঠানিকতার জন্য। মাহবুব তালুকদারের ভাষায়, ‘আইরিশ শাসনতন্ত্রে রাষ্ট্রপ্রধানের কোনো ক্ষমতা নেই। কারণ, রাষ্ট্রপ্রধান বৃদ্ধ ও অথর্ব। তাঁকে কেবল সম্মান দিয়ে রাখা হয়েছে।’

সে সময় শুধু শাসনতন্ত্রই নয়, নানা বিষয়ে শেখ মুজিবের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদের মতবিরোধ ও তিক্ততা বাড়ছিল। যেগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল মাওলানা ভাসানীর অনশন। ১৯৭৩ সালের ১৫ মে তিন দফা দাবিতে আমরণ অনশনে বসেছিলেন ভাসানী। টানা আট দিনের অনশনে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। মাহবুব তালুকদারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অনশনে রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ খুবই বিচলিত ছিলেন। তিনি ভাসানীর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। পরামর্শের জন্য তিনি শেখ মুজিবকে ফোন করলে তিনি বলেছিলেন, ‘আপনি যাবেন না। এটা রাজনৈতিক বিষয়।’

রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদুল্লাহর সময়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর বাংলাদেশ সফরের বিস্তারিত বর্ণনা আছে বইটিতে। ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বিনা শর্তে বাংলাদেশকে স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল পাকিস্তান। এরপর ২৭ জুন ৯৩ জন সদস্য নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। ২৯ জুন ফিরে যাওয়ার সময় রাস্তার দুই পাশে প্রচুর মানুষ ভিড় করেছিলেন ভুট্টোকে দেখার জন্য। বিষয়টি লেখক মাহবুব তালুকদারকে বিস্মিত করেছিল। তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘এটা কি মানুষের নিতান্তই কৌতূহল, নাকি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর আবেগ প্রদর্শন, কিছুই বুঝতে পারলাম না। এত মানুষ ভুট্টোকে দেখার জন্য উদ্গ্রীব হবে, তার কারণ খুঁজে পাওয়া ভার।’

শেখ মুজিব রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর ১৯৭৫ সালের ৬ জুন বাকশালের সাংগঠনিক কাঠামো ও গঠনতন্ত্র ঘোষণা করা হয়েছিল। মাহবুব তালুকদারের মতে, এমন সরকার গঠনের উপযুক্ত সময় ছিল ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে। তবে যা-ই হোক না কেন, একশ্রেণির মানুষ বাকশালে যোগ দিতে পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করতে সেখানে (১১২ নম্বর সার্কিট হাউস রোড) সমবেত হলেন আবালবৃদ্ধবনিতা, রাজনীতিবিদ, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, ক্রীড়াবিদ, কৃষক, শ্রমিকসহ সব পেশাজীবী মানুষ। তাঁরা মিছিল করে, নৃত্য করে, বাদ্য বাজিয়ে, উল্লাস করে বঙ্গবন্ধুকে অভিনন্দন জানালেন প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও। মাঝেমধ্যে বৃষ্টি হচ্ছিল। তার মধ্যে অনেকে ভিজে চুপসে একাকার।’

রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবকে হত্যার পর নাটকীয় পালাবদলও খুব কাছ থেকে দেখেছেন মাহবুব তালুকদার। বইটিতে আছে ৩ নভেম্বর ও ৭ নভেম্বর নিয়ে অনন্য বিশ্লেষণ, কিছু শ্বাসরুদ্ধকর ঘটনাও পাঠক এতে পাবেন। বইটিতে কর্নেল তাহেরের ফাঁসি ও এর আগে তাঁর জীবনভিক্ষার আবেদন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে। এ ছাড়া বইটিতে ছোট্ট পরিসরে আলোচিত হয়েছে বিপ্লবী নেতা সিরাজ সিকদার ও হুমায়ুন কবির হত্যা প্রসঙ্গ। বারবার এসেছে কবি আবুল হাসানের কথা।

বঙ্গভবনে পাঁচ বছর
মাহবুব তালুকদার
প্রকাশক: ইউপিএল
প্রচ্ছদ: সৈয়দ লতিফ হোসাইন
মূল্য: ৫৪০
পৃষ্ঠা: ২১২
প্রকাশ: ২০১৭