
সভ্যতার অগ্রগতিতে শিক্ষার ভূমিকা অপরিসীম। শিক্ষার প্রকৃতি ও মান সরাসরি ব্যক্তি ও সমাজের উদ্দীপনা, সচেতনতা ও আত্মমর্যাদার সঙ্গে যুক্ত। এটি নৈতিকতা, নেতৃত্ব, রাজনীতি, প্রশাসন, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও পরিবেশের প্রতিফলন ঘটায়। স্বাধীনতার প্রায় ৫৫ বছর পরও বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা মূলগতভাবেই অপরিবর্তিত থেকে গেছে; ফলে এটি সমাজের দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেনি। শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোতে মৌলিক সংস্কারের প্রয়োজন ক্রমেই বেড়েছে। প্লেটোর দর্শন থেকে শুরু করে মধ্যযুগের শিক্ষাভাবনা, ঊনবিংশ শতাব্দীতে কার্ডিনাল নিউম্যানের দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিংশ শতাব্দীতে কার্ল ইয়াসপার্স ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিন্তাধারাকে একসূত্রে গাঁথলে শিক্ষার একটি সুসংহত দর্শন নির্মিত হয়। এই দর্শনের মূল ভিত্তি হলো মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানবিক মুক্তি, যা ‘শিক্ষার মুক্তিবাদী আদর্শ’ নামে পরিচিত। শিক্ষার এই লিবারেল দর্শন দ্বারা প্রভাবিত শিক্ষাবিদ তারিক মনজুর তাঁর গ্রন্থ বাংলাদেশের শিক্ষাচিন্তা: স্কুল ও কলেজ পর্যায়-এ প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার নানা সমস্যার দিকে আলোকপাত করেছেন এবং সম্ভাব্য সমাধানও প্রস্তাব করেছেন।
গ্রন্থটিতে সংকলিত হয়েছে ৪৬টি নিবন্ধ এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার। এগুলো ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে রচিত।
গ্রন্থটির বিষয়বস্তু সম্পর্কে লেখক জানিয়েছেন, ‘বইয়ের লেখাগুলো ২০২১-২৫ সময়পর্বের বাংলাদেশের স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষা সম্পর্কে ধারণা দেবে। প্রায় প্রতিটি লেখার বিষয়ই সাম্প্রতিক; তাই এগুলোকে তাৎক্ষণিক ফেনার বুদ্বুদও বলা যায়। খুঁজলে এই বুদ্বুদের ভেতর বাংলাদেশের শিক্ষার ঐতিহাসিক পরিক্রমাও পাওয়া সম্ভব।’
সাক্ষাৎকারসহ বইয়ের সব লেখাই দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশে প্রবর্তিত নতুন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের সঙ্গে লেখক প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। বিশেষত শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের পর্যায়ে বাংলা বিষয়ের সামগ্রিক দায়িত্ব তাঁর ওপর ন্যস্ত ছিল। ফলে এ গ্রন্থের আলোচনাগুলো কেবল তাত্ত্বিক নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও গভীর পর্যবেক্ষণেও সমৃদ্ধ। প্রতিটি নিবন্ধ রচনার ক্ষেত্রে লেখক নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন উৎস থেকে তা যাচাইয়ের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন; শিক্ষা ও শিক্ষানীতির নানা দিক নিয়ে তাঁর গভীর চিন্তা ও অভিজ্ঞতার প্রতিভাস স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। গ্রন্থটির বিষয়বস্তু সম্পর্কে লেখক জানিয়েছেন, ‘বইয়ের লেখাগুলো ২০২১-২৫ সময়পর্বের বাংলাদেশের স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষা সম্পর্কে ধারণা দেবে। প্রায় প্রতিটি লেখার বিষয়ই সাম্প্রতিক; তাই এগুলোকে তাৎক্ষণিক ফেনার বুদ্বুদও বলা যায়। খুঁজলে এই বুদ্বুদের ভেতর বাংলাদেশের শিক্ষার ঐতিহাসিক পরিক্রমাও পাওয়া সম্ভব।’
দীর্ঘদিন ধরে মুখস্থনির্ভর শিক্ষার প্রবণতা আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে আসছে, অথচ শিক্ষার্থীর জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও মৌলিক চিন্তাশক্তি মূল্যায়নের উপযোগী প্রশ্ন প্রণয়নে অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষকেরা সফল হতে পারছেন না।
গ্রন্থটিতে ২০২৩ সালে বাংলাদেশে প্রবর্তিত নতুন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক নিয়ে গভীর ও বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা স্থান পেয়েছে। পরীক্ষা ও মূল্যায়নপদ্ধতির সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করার পাশাপাশি লেখক যুগোপযোগী ও বাস্তবসম্মত কিছু প্রস্তাবও উপস্থাপন করেছেন। তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক সততা বিশেষভাবে প্রশংসার দাবিদার; কারণ তিনি বিতর্কিত ও ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়েও নির্ভীকভাবে মত প্রকাশ করেছেন।
পরীক্ষায় নকলের সংস্কৃতিও পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। অন্যদিকে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ভারসাম্যপূর্ণ অনুপাতের অভাব শিক্ষার মানকে ব্যাহত করছে। অনেক শিক্ষক নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি অর্থের বিনিময়ে ব্যক্তিগত কোচিং বা প্রাইভেট পাঠদানেও যুক্ত, যা শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলিত কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। লেখক আরও দেখিয়েছেন, শিক্ষাক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে যোগ্যতার পরিবর্তে অনেক সময় দলীয় পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়ার দরুন দক্ষ ও কর্মক্ষম নেতৃত্বের ঘাটতি তৈরি হয়। পাশাপাশি শিক্ষা বাজেট, শিক্ষক প্রশিক্ষণের মান, পাঠ্যপুস্তকের তথ্য ও বানানগত ত্রুটি, নিম্নমানের কাগজ ও মুদ্রণ—এসব বিষয় নিয়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। গ্রন্থের প্রতিটি নিবন্ধ ও শিরোনাম শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব চিত্র এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের বার্তা বহন করে।
গ্রন্থটিতে ২০২৩ সালে বাংলাদেশে প্রবর্তিত নতুন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক নিয়ে গভীর ও বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা স্থান পেয়েছে। পরীক্ষা ও মূল্যায়নপদ্ধতির সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করার পাশাপাশি লেখক যুগোপযোগী ও বাস্তবসম্মত কিছু প্রস্তাবও উপস্থাপন করেছেন। তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক সততা বিশেষভাবে প্রশংসার দাবিদার; কারণ তিনি বিতর্কিত ও ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়েও নির্ভীকভাবে মত প্রকাশ করেছেন। পরীক্ষার ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে শিক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ওপর তিনি গুরুত্ব আরোপ করেছেন এবং সে লক্ষ্যে সেগুলো সমাধানকল্পে কার্যকর উপায়ও নির্দেশ করেছেন।
গ্রন্থভুক্ত নিবন্ধগুলোর মূল শক্তি হলো জ্ঞানের এই বিকাশমানতার দর্শন। বাংলাদেশের শিক্ষাকাঠামো পুনর্বিন্যাস ও সময়োপযোগী সংস্কারের ক্ষেত্রে গ্রন্থটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করে। আমাদের বিশ্বাস, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক ও শিক্ষানুরাগী সব চিন্তাশীল পাঠকের কাছে এটি সমাদৃত হবে।
একটি স্বাধীন, প্রগতিশীল ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো শিক্ষা। শিক্ষা কেবল ব্যক্তির জ্ঞানার্জনের মাধ্যম নয়; এটি মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ ও জীবনদৃষ্টিকে রূপান্তরিত করে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এই বিশ্বাস থেকেই গ্রন্থটির নিবন্ধগুলো রচিত হয়েছে। এখানে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নকে জাতির অস্তিত্ব ও অগ্রগতির অন্যতম পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বর্তমান সময়ে শিক্ষাব্যবস্থার বহুমুখী বিভাজন জাতিকেও নানা স্তরে বিভক্ত করে তুলছে। তবে বৈচিত্র্য কখনোই বিভেদের কারণ নয়, যদি তা জ্ঞানচর্চা ও বিকাশের স্বাভাবিক শর্ত মেনে চলে। বিশ্বায়নের পরিবর্তনশীল বাস্তবতা এবং সময়ের অবিরাম প্রবাহের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক, গতিশীল ও সৃজনমুখর হতে হবে। শিক্ষা কোনো স্থবির নীতি বা পূর্বনির্ধারিত আদর্শের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে না; বরং জ্ঞানের ক্রমবিকাশমান ধারা থেকেই আমাদের নতুন নীতি, মূল্যবোধ ও আদর্শের জন্ম হবে। গ্রন্থভুক্ত নিবন্ধগুলোর মূল শক্তি হলো জ্ঞানের এই বিকাশমানতার দর্শন। বাংলাদেশের শিক্ষাকাঠামো পুনর্বিন্যাস ও সময়োপযোগী সংস্কারের ক্ষেত্রে গ্রন্থটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করে। আমাদের বিশ্বাস, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক ও শিক্ষানুরাগী সব চিন্তাশীল পাঠকের কাছে এটি সমাদৃত হবে।
বাংলাদেশের শিক্ষাচিন্তা: স্কুল ও কলেজ পর্যায়
তারিক মনজুর
প্রকাশক: সৌম্য প্রকাশনী
প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রচ্ছদ: নাজিব তারেক
পৃষ্ঠা: ১৫২; মূল্য: ৪৮০ টাকা