গ্রাফিকস: প্রথম আলো
গ্রাফিকস: প্রথম আলো

দ্য এপিক অব গিলগামেশ

অমরত্বের খোঁজে

দ্য এপিক অব গিলগামেশ বা গিলগামেশের মহাকাব্য চার হাজার বছর আগে রচিত। এতে বর্ণনা করা হয়েছে দেবতা ও মানুষের গল্প। উনিশ শতকের প্রত্নতত্ত্ববিদেরা মধ্যপ্রাচ্যে এই কাহিনি–কাব্য খুঁজে পান। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এটিকে প্রথম লিখিত সাহিত্যকর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর চিরায়ত বিষয়বস্তু ও চরিত্রগুলো আধুনিক কালেও প্রাসঙ্গিক।

আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ২৭০০ সালে গিলগামেশ ছিলেন সুমেরীয় নগররাষ্ট্র উরুকের রাজা। এই প্রাচীন নগরের ধ্বংসাবশেষ আজকের ইরাক ভূখণ্ডে অবস্থিত। এখানেই আবিষ্কৃত হয়েছে মানব ইতিহাসের প্রাচীনতম লিপির নমুনা। এখানে প্রাপ্ত লিখিত নথিপত্র আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩০০ সালের।

মৃত্যু–পরবর্তী কয়েক শ বছরে গিলগামেশ জনমনে এক দেবতুল্য মহাপুরুষে পরিণত হয়েছিলেন। তাঁর সম্পর্কে প্রচলিত প্রাচীনতম কাহিনিগুলো অজ্ঞাতনামা লেখকেরা মৃৎফলকে খোদাই করে লিখে রাখেন। ধারণা করা হয়, আনুমানিক ২১০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে এসব মৃৎফলক লেখা হয়েছিল। অবশ্য পরবর্তী সময়েও গিলগামেশকে নিয়ে নতুন নতুন উপাখ্যান রচিত হতে থাকে। এসব কাহিনির সমন্বয়েই সৃষ্টি হয় দ্য এপিক অব গিলগামেশ।

এই ঐতিহাসিক সংকলনের খণ্ডাংশ পাওয়া যায় খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ সালের দিককার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে। এগুলোর আধুনিক অনুবাদ রচিত হয় আনুমানিক ১২০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের ১২টি মৃৎফলকে লিপিবদ্ধ প্রায়-সম্পূর্ণ কাহিনির আলোকে। ফলকগুলো লেখা হয়েছিল গিলগামেশের মৃত্যুর প্রায় দেড় হাজার বছর পর, যা প্রত্নতত্ত্ববিদেরা ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে আবিষ্কার করেন।

গিলগামেশের মহাকাব্য দুই খণ্ডে বিভক্ত। প্রথম অংশে আছে দুজন মানুষের দৈব গল্প। গিলমামেশ ছিলেন নিষ্ঠুর ও স্বেচ্ছাচারী রাজা। দেবতারা বিচলিত হয়ে তাঁকে সংযত করার জন্য সৃষ্টি করেন তাঁর বিপরীত এক চরিত্র—নৈতিকতায় দৃঢ়, স্বভাবে শান্ত এক মানুষ, যার নাম এনকিডু। প্রথমে দুজনের মধ্যে তীব্র লড়াই হয়। কিন্তু শত্রুতা দ্রুতই রূপ নেয় ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বে। এরপর তাঁরা এমন কিছু কার্যক্রমে লিপ্ত হন, যা দেবতাদের রুষ্ট করে। ক্রুদ্ধ দেবতারা এনকিডুকে মৃত্যুদণ্ড দেন। প্রিয় বন্ধুর মৃত্যুতে শোকবিহ্বল গিলগামেশ নিজের মৃত্যুচিন্তায় আক্রান্ত হন।

‘দ্য এপিক অব গিলগামেশ’ বইয়ের প্রচ্ছদ
দ্য এপিক অব গিলগামেশ এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত মানবজাতির প্রাচীনতম লিখিত কাহিনি। এর মূল্য গভীরতর হয়ে ওঠে, যখন দেখা যায় যে প্রায় ৯০০ বছরব্যাপী বিভিন্ন সময়ে এই কাহিনির অসংখ্য সংস্করণ রচিত হয়েছে। এই মহাকাব্যে বারবার ব্যবহৃত কিছু শব্দবন্ধ ইঙ্গিত দেয়, এটি হয়তো আরও পুরোনো মৌখিক গল্প বলার ঐতিহ্য থেকে উৎসারিত। এ ধরনের গল্প বলার রীতি গিলগামেশের জীবদ্দশাতেই প্রচলিত ছিল।

মহাকাব্যের দ্বিতীয় অংশটি যেন এক ক্ল্যাসিক ‘রোড মুভি’র (আধুনিক কালের অ্যাডভেঞ্চার চলচ্চিত্র) গল্প। গিলগামেশ অমর জীবনের রহস্য অনুসন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। তিনি পৌঁছাতে চান উতনাপিশটিমের কাছে, যে উতনাপিশটিম মহাপ্লাবন থেকে বেঁচে যাওয়া একমাত্র ব্যক্তি, এবং যিনি দেবতাদের বরে অমরত্ব লাভ করেছিলেন। পথে পথে নানা বিপদ মোকাবিলা করতে হয় গিলগামেশকে, বিচিত্র মানুষের সাক্ষাৎলাভ করেন তিনি। এসবের ভেতর দিয়ে তিনি এই দার্শনিক উপলব্ধি অর্জন করেন যে মৃত্যু প্রত্যেক মানুষের অনিবার্য পরিণতি। তবে টিকে থাকে মানবতা, অমরত্বলাভ করে মানুষের কর্ম। এই উপলব্ধি নিয়ে গিলগামেশ ফিরে আসেন উরুকে—এক বদলে যাওয়া পরিণত মানুষ হিসেবে। এবার আর তিনি নিপীড়ক নন, হয়ে ওঠেন প্রজ্ঞাবান ও বিচক্ষণ এক শাসক, যাঁকে তাঁর প্রজারা এবং আমরাও, স্মরণ করি তাঁর মৃত্যুর বহুযুগ পরেও।

এই মহাকাব্যের থিম—বন্ধুত্ব, মরণশীলতা, আত্ম-অনুসন্ধানের অভিযাত্রা—চিরন্তন। এসব প্রতিপাদ্য কেবল প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় নয়, সব যুগের সাহিত্যে ফিরে ফিরে আসে। এই কাহিনির প্রভাব মানবসভ্যতার দুই প্রাচীন ও প্রভাবশালী গ্রন্থে স্পষ্টভাবে রয়েছে—বাইবেল ও হোমারের রচনাবলি। হোমারের দুই মহাকাব্য ইলিয়াড ও অডিসি— একেকটি মহা অভিযাত্রার গল্প, যে গল্পের প্রতিটি বাঁকে রয়েছে আত্ম–উপলব্ধির শিক্ষা। অন্যদিকে, বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টে এমন বেশ কিছু অধ্যায় আছে, যেগুলো দ্য এপিক অব গিলগামেশের অবিকল অনুলিপির মতো। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য গার্ডেন অব ইডেন এবং মহাপ্লাবন, যেখানে উতনাপিশটিমের বদলে আছেন নোয়া, যাঁকে আমরা নবী নুহ (আ.) হিসেবে চিনি।

দ্য এপিক অব গিলগামেশ এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত মানবজাতির প্রাচীনতম লিখিত কাহিনি। এর মূল্য গভীরতর হয়ে ওঠে, যখন দেখা যায় যে প্রায় ৯০০ বছরব্যাপী বিভিন্ন সময়ে এই কাহিনির অসংখ্য সংস্করণ রচিত হয়েছে। এই মহাকাব্যে বারবার ব্যবহৃত কিছু শব্দবন্ধ ইঙ্গিত দেয়, এটি হয়তো আরও পুরোনো মৌখিক গল্প বলার ঐতিহ্য থেকে উৎসারিত। এ ধরনের গল্প বলার রীতি গিলগামেশের জীবদ্দশাতেই প্রচলিত ছিল। ভাবতে অবাক লাগে, যদি উনিশ শতকের প্রত্নতত্ত্ববিদেরা ধুলায় ঢাকা ইতিহাস থেকে এমন এক মহাকাব্য উদ্ধার করতে পেরে থাকেন, না জানি এমন আর কী কী অনাবিষ্কৃতই রয়ে গেছে—কে বলতে পারে?