‘দর্শন’ শব্দটির সঙ্গে সাক্ষাৎজ্ঞানের ঘনিষ্ঠ যোগ রয়েছে। ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে আমরা সরাসরি যা অনুভব করি, সেটিই প্রত্যক্ষ জ্ঞান; আর বুদ্ধি ও যুক্তির মাধ্যমে অর্জিত হয় পরোক্ষ জ্ঞান।
তত্ত্ববিদ্যা অর্থে দর্শন মানে হলো, তত্ত্বের প্রত্যক্ষ অনুধাবন, যেখানে যুক্তিনির্ভর জ্ঞানও শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞতার দ্বারাই যাচাই হয়। তবে পশ্চিমে ‘ফিলসফি’ শব্দটি মূলত ‘জ্ঞানপ্রীতি’র প্রতীক, যা অধিকাংশ দার্শনিকের কাছে একটি যুক্তিভিত্তিক প্রক্রিয়া। ইউরোপের আধুনিকতা ও আলোকপ্রাপ্তির ভিত্তি ছিল যুক্তির সার্বভৌমত্ব। পারমেনিদেস থেকে প্লেটো পর্যন্ত বহু দার্শনিক ইন্দ্রিয়লব্ধ জগৎকে জ্ঞানের আসল ক্ষেত্র বলে মানেননি। দেকার্তও মনে করতেন যে জ্ঞানের মূল কর্তা সেই যুক্তিশীল মানুষ, যাঁর যুক্তিসিদ্ধ জ্ঞানই প্রকৃত জ্ঞান। তবে বার্ট্রান্ড রাসেলের ক্ষেত্রে ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষণের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। বিশ্লেষণাত্মক দর্শনের প্রভাবশালী এই চিন্তক যুক্তিবিদ্যা, অভিজ্ঞতাবাদ ও ইন্দ্রিয়বাদ—সবকিছুর সমন্বয় ঘটাতে চেয়েছিলেন। গণিত ও দর্শনের পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর ফিলসফিক্যাল এসেস (১৯১০), যা আমিনুল ইসলাম ভুইয়ার অনুবাদে দার্শনিক প্রবন্ধাবলি নামে প্রকাশিত, রাসেলের চিন্তার বিকাশে এক তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
১৯১০ সালে ৩৮ বছর বয়সে বার্ট্রান্ড রাসেলের দার্শনিক প্রবন্ধাবলি প্রকাশিত হয়। এতে প্রথমে ছিল ৯টি বিচ্ছিন্ন প্রবন্ধ। পরবর্তী সংস্করণে তিনি ‘স্বাধীন মানুষের আরাধনা’ ও ‘গণিতচর্চা’ বাদ দিয়ে গ্রন্থটিকে নিখুঁতভাবে বিন্যস্ত করেন। এতে প্রকাশ পায় অজ্ঞেয়বাদী রাসেলের স্পষ্ট অবস্থান। অবশিষ্ট সাতটি প্রবন্ধের মধ্যে তিনটি নৈতিক বিষয় এবং চারটি সত্যের প্রকৃতি নিয়ে রচিত। প্রতিটি প্রবন্ধ গড়ে উঠেছে নতুন সংজ্ঞা, সূক্ষ্ম পরিভাষাসচেতনতা ও দৃঢ় যুক্তির সমন্বয়ে। চসারের দ্য নানস্ প্রিস্টেস্ টেল-এর মতো রাসেলও অক্টরিটির যথাযথ প্রয়োগে বক্তব্যকে শক্তিশালী করেছেন। ভাবনার বৈচিত্র্য, অন্তর্দৃষ্টির গভীরতা ও প্রকাশভঙ্গির স্বচ্ছতায় এসব রচনা আজও প্রথম প্রকাশের দিনের মতোই প্রাসঙ্গিক ও দীপ্তিমান।
প্রথম প্রবন্ধ ‘নৈতিকতার উপাদান’-এ রাসেল যুক্তি দেন ‘উত্তম’ নৈতিকতার মৌলিক ধারণা, যাকে সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব নয়। জ্ঞানবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি জি ই ম্যুরের নৈতিক কগনিটিভিজমকে বিস্তারিত করেন এবং দেখান যে সহজাত ‘উত্তম’ ও ‘অশুভ’ মানব অভিজ্ঞতা থেকে পৃথক। তবে এ ধারণার প্রবল সমালোচনা করেন জর্জ সান্তায়ানা। তাঁর মতে, রাসেল ইচ্ছার বিরুদ্ধেও নৈতিক মূল্যবোধকে জীবনের বাইরে ‘স্বাধীন সত্তা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। নৈতিক মূল্য সর্বদাই মানব অস্তিত্ব ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত। উল্লেখ্য যে পরবর্তী সময়ে রাসেল ধীরে ধীরে কগনিটিভিজম থেকে সরে এসে নন-কগনিটিভিস্ট অবস্থান গ্রহণ করেন।
রাসেলের প্রবন্ধগুলোয় চিন্তার বহুমাত্রিকতা স্পষ্ট। ‘ইতিহাস নিয়ে’ প্রবন্ধে তিনি ইতিহাসের কোনো নির্দিষ্ট অর্থ খোঁজেন না, বরং কবিতার মতো করে এর অনিশ্চয়তাকে পাঠ করতে চান। তিনি কাব্যিক ভাষায় লিখেছেন: ‘অতীত সর্বদাই বর্তমানের অপস্রিয়মাণ সন্তানকে গিলে খাচ্ছে, বিশ্বজনীন মৃত্যুর মাধ্যমে বেঁচে আছে; সকল যুগ যা নির্মাণ করছে দৃপ্ত পায়ে অপ্রতিরোধ্যভাবে তা ছিনিয়ে তার নীরব মন্দিরে নতুন ট্রফি যোগ করে চলেছে; প্রতিটি মহান কর্ম, প্রতিটি সুন্দর জীবন, প্রতিটি অর্জন, প্রতিটি নায়কোচিত ব্যর্থতা সেখানে স্থান করে নিচ্ছে’। এভাবে ইতিহাসের আধারে ধরা পড়ে দর্শনের স্রষ্টা শুধু দার্শনিক নন, তার স্রষ্টা জনসাধারণও। আরেকটি প্রবন্ধ ‘বিজ্ঞান ও অনুকল্পনা’তে তিনি পোঁয়েকারের মতকে ভ্রান্ত প্রমাণ করে দেখান যে বিজ্ঞান আসলে অবরোহী পদ্ধতিতেই অগ্রসর হয়। যেমন আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব। ‘প্রয়োগবাদ’ বিষয়ে তিনি যুক্তিবাদ দিয়ে এর গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের পথ দেখান। আর ‘সত্যের অদ্বৈতবাদী তত্ত্ব’–তে রাসেল জোয়াকিমের ভাবনার প্রতিধ্বনি করে এক নতুন দার্শনিক আলোচনার সূত্রপাত ঘটান। জোয়াকিম বলেছিলেন, ‘খোদ সত্য এক এবং সমগ্র, এবং সম্পূর্ণ, এবং সকল চিন্তা এবং সকল অভিজ্ঞতা এর স্বীকৃতির মধ্যে এবং এর প্রকাশ্য কর্তৃত্বের শর্ত মেনে চলাচল করে।’ জোয়াকিমের মতো রাসেলও নিঃসন্দেহ যে ‘কেবল সমগ্র সত্যই পুরোপুরি সত্য’।
বার্ট্রান্ড রাসেলের উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপীয় মানবচিন্তার বিবর্তনকে অনুধাবন করা। তাঁর চিন্তা গভীর, জটিল ও প্রায়ই দুর্বোধ্য। কারণ, যুক্তির পরম্পরা ক্রমে এক জটিল জালে রূপ নেয়। এই জটিলতা ভেদ করার দৃঢ় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে আমিনুল ইসলাম ভুইয়ার ক্ষুরধার অনুবাদ দার্শনিক প্রবন্ধাবলি। বইটির শুরুতে ‘অনুবাদকের ভূমিকা’ ও শেষে ‘পরিভাষা’ সাধারণ পাঠককে অজ্ঞতার আবরণ ভেদ করে নতুন উপলব্ধির বাড়তি সাহস জোগাবে। যেমন অগ্নিবেশের শিষ্যরা বুঝেছিলেন যে মানুষ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ক্ষুদ্র অংশ, তেমনি মানুষকে জানতে হলে তাকে ব্রহ্মাণ্ডও জানতে হয়। দর্শনপাঠের অপরিহার্যতা এখানেই স্পষ্ট হয় এবং এ ক্ষেত্রে রাসেল প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন সর্বাংশে। গ্রন্থটি অনুবাদের ফলে বাংলা ভাষায় দর্শনচর্চার এক স্বতন্ত্র সড়ক নির্মিত হয়েছে, যেখানে জীবনের স্থিরতা ও চলিষ্ণুতা পাশাপাশি প্রবাহিত। গ্রন্থটি পাঠের পর দার্শনিক অনুসন্ধিৎসা মহাকল্লোলের মতো বিস্তৃত হবে। অনুবাদকের নিরলস প্রচেষ্টা কঠিন দর্শনকেও সহজ করে তুলেছে শীতল ঝরনার মতো, যার প্রবাহ পাঠকের মনে জাগাবে
অনাবিল স্বস্তি।
দার্শনিক প্রবন্ধাবলি
বার্ট্রান্ড রাসেল
অনুবাদ: আমিনুল ইসলাম ভুইয়া
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
প্রথম প্রকাশ: সেপ্টেম্বর ২০২৪
প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল
পৃষ্ঠা: ১৮৪; মূল্য: ৫০০ টাকা