অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান
অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান

গুচ্ছকবিতা

ছাতিম ফুলের ঘ্রাণ অন্ধকারে ঘন হয় আরও

বাংলা আমার আজনমের দ্রোহ

আমি অনার্য, আমি ব্রাত্যজন, বাংলাভাষী
আমি তোমার চক্ষুশূল চিরদিন।
আমি ভুসুকু বাঙালি
আমার হাঁড়িতে ভাত নেই,
আমি অপাঙ্ক্তেয়, রৌরব নরকে আমার অধিষ্ঠান।
তোমার ওই দেবভাষা আমি বুঝতে পারি না।
বুঝতে পারি না ফারসি বয়েত।
আমাকে দেখলে তোমার নাসিকা কুঞ্চিত হয়
আমার ভাষায় কথা বললে
তোমার আভিজাত্যে কলঙ্ক লাগে।
তবু আমি টিকে আছি পুণ্ড্রধামে
আমার অবয়ব উৎকীর্ণ পাহাড়পুরে
আমি অনার্য, কৈবর্ত, কৃষক, মালো
আমার দেহে রক্তের দাগ, ঘামের গন্ধ, মাটির সৌরভ।
আমার ভাষা? সে তো পাখির জবান।
তবু আমি সোনাভানের পুঁথিপাঠ করি, গাই মনসার গীত।
এসো আর্যজন, ইংরেজ, বর্গির দল, এসো মোগল পাঠান
আমারই কণ্ঠে শোনো মঙ্গলসন্ধ্যার গান।
বাংলা আমার আজনমের দ্রোহ
সংগ্রামের চিরন্তন গৌরবগাথা।
এই ফাল্গুনে আমি সারা বিশ্বে
ছড়িয়ে দিই মাতৃভাষার অনন্ত আগুন, বিপ্লবের শিখা অনির্বাণ।
আমি কথা বলি বিশুদ্ধ বাংলায়।

আবহমান বৈশাখী গীত

পহেলা বৈশাখে এসো প্রিয়
এসো রমনায়, বটের ছায়ায়
এই সব জটিল জীবন ছেড়ে চলো যাই
আমাদের ভোরের আলাপে
বৈশাখের তীব্র রোদে, কৃষ্ণচূড়া, জারুলের দিনে।
চৈতালি বিকেল, নতুন চালের ক্ষীর, পুতুল নাচের অনন্ত ইশারা
চলো যাই চন্দ্রদ্বীপে, হরিকেলে, তাম্রলিপ্তি, দ্বীপান্বিতা গৃহে।
ধূপের ধোঁয়ায় বাঁধি চুল, লোধ্ররেণু মুখে।
ঘুড়ি ওড়ে বাংলার প্রাচীন আকাশে।
কামিনীর সুবাসিত ঝোপ, মধুপুর শালবন
দারুণ জোছনায় বাঁধি ঘর,
আমাদের সেই সব ভুলে যাওয়া পুরোনো বাসর।
সংক্রান্তির মেলা, রসুলপুরের হাট, শোলার ময়ূর
ধীমানের হাতে গড়া শিলালিপি, বাঁকুড়ার ঘোড়া।
বৈশাখী পূর্ণিমা, শাক্যগৃহে বাজে শঙ্খধ্বনি
ধরাধামে আবির্ভূত সিদ্ধার্থ গৌতম।
তারপর কত রাত, কত অন্ধকার তমাল প্লাবন
চলো যাই রাজগির, পুণ্ড্রনগর
সাঁওতাল পরগনা, সারা রাত বাজুক মাদল
মহুয়ার রঙে ভেসে যাক নক্ষত্রের পুরাতন মন।
এসো প্রিয়, সুলতানি যুগের ছায়ায়
পাঠ করি আলাওল, ইউসুফ জুলেখার প্রেম,
সুবে বাংলার সোনালি অতীতে
মেঘডম্বর শাড়ির আঁচলে
মসলিন পিরানের ভাঁজে
হালখাতা, পুণ্যাহ উৎসবে
চড়কে বৈশাখে আরেকবার হাত ধরো প্রিয়
সংক্রান্তির লগ্ন খুঁজি ঝড়ের তাণ্ডবে।

দেখা হলো নিজের সাথে

নিজের সঙ্গে হয় না দেখা অনেক বছর
ওরে মেয়ে, কেমন আছিস?
দিনগুলো তোর কেমন করে কাটছে এখন?
নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া অনেক হলো।
কোনটা অতীত, কোনটা ভালো
কোনটা এখন, কোনটা আলো
না বুঝে তুই হেঁটে গেছিস
হেঁটে গেছিস পুড়ে যাওয়া টিনের চালে
দেখেনি কেউ কি ভয়ানক পায়ের ক্ষত
দেখছে কেবল এগিয়ে যাওয়া দৃঢ়তর পদক্ষেপে।
কেউ বলেনি, আহারে মেয়ে
বোস এখানে।
এখানে তোর বুকের বাটি উপুড় করে
আঁক না ছবি দুঃখ দিনের।
কান্নাগুলো জমে জমে ফসিল হলো
সেই ইতিহাস কেউ লেখেনি।
কেউ বলেনি, রক্তগুলো পাথর কেন?
দেখছে কেবল কী দ্যুতিময়
রঙিন ছটা।
কেউ বলেনি
পুতুলগুলো ভেঙেছে কে, ভাঙল কেন
সবাই কেবল চমৎকৃত
কী অয়োময় কঠিন শিলা।
বৃষ্টি এসে মুছিয়ে দেবে সকল ধুলো
এমন কোনো মেঘ জমেনি।
সবাই কেবল দেখে গেছে
রোদ ঝলমল আকাশ বাড়ি
মেধার ঝিলিক, চোখের ঘুড়ি
শাণিত এক তরবারি
কেউ দেখেনি, কেউ বলেনি
ইস্পাত যে কঠিন এমন
আগুন ছিল ভীষণ গভীর।
নাই-বা বলুক কী এসে যায়
নিজের কাঁধে হাতটা এবার রেখেই দেখি
দিনের শেষে আপন তো
সেই নিজেরই হাত।
নিজের সাথে হাত মেলানো
হয়নি এমন অনেক প্রহর।
কেমন আছিস? ভালো আছিস?
থাকিস ভালো অনেক বছর।

মৃত্যু এক অচেনা শহর

মৃত্যু এক অচেনা শহর
সেখানে হাত বাড়ালে ছোঁয়া যায় সব পাহাড়চূড়া
সাফল্যের মগডাল।
মৃত্যু বিষণ্ন মোহন পুরুষ
তার হাতে সর্ব দুঃখহর আশ্চর্য মলম
আতশবাজির চেয়ে দ্রুত ফুরিয়ে যায়
জীবনের চটুল উৎসব
ত্বকের ভাঁজে অট্টহাসি হাসে প্রসাধনী
আহা মৃত্যু পোষা সারমেয় তুই
তোর গলায় ঝোলে জীবনের শিকল।
ব্যাঙ্গমা পক্ষীর ডানা থেকে খসা
সাদা পালকের নাম মৃত্যু
আর রঙিন জীবন।
রং ধুয়ে যায় যন্ত্রণার ধোপকাঠে
মৃত্যুর জোছনা ফিনিক ফোটে
জীবনের রাত্রি ঘেঁষে
দুধসাদা ফুল সৌরভ ছড়ায়।

অনার্য কোজাগরী

বাংলার আকাশজুড়ে বহমান কোজাগরী রাত
শিকড়ের গান গায় ভেজা মাটি, বকের পালক
কুমারীর হাতে জ্বলে কবেকার লক্ষ্মীর প্রদীপ
স্তোত্রপাঠে মুখরিত আশ্বিনের প্রাচীন পূর্ণিমা।
রক্তের ভিতর ওড়ে দুধসাদা প্যাঁচার শাবক
ধূপের সুবাসে ভাসে শিশিরের নিভৃত আলাপ।
ছাতিম ফুলের ঘ্রাণ অন্ধকারে ঘন হয় আরও
মাটির গভীর স্রোতে কান পেতে শোনা যাক এসো
জলের বাতাসি গান, ফসলের আদিম ইশারা।
অপরূপ খোলা চুল, সাদা শাঁখা, রক্তিম সিঁদুর
প্রবারণা জেগে থাক প্রেমিকের উদাসীন চোখে
কোজাগরী, কোজাগরী, বরমাল্য কার হাতে বলো,
রুপালি ফানুস ওড়ে সুপ্রাচীন লক্ষ্মীর অন্তরে।
অনার্য আকাশে আজ নিজস্ব নক্ষত্র জ্বলে
কমলে কামিনী হাসে শঙ্খপাড় নদীর প্রবাহে
অন্ধকারে ভেসে যায় আকাঙ্ক্ষার মাটির প্রদীপ।