‘চলে যায় বসন্তের দিন’ বলে হাহাকার করে সবাই; কিন্তু অস্তপ্রায় শীতের জন্য আমি আকুল মর্সিয়া গাই। আহ্, কুয়াশার লতাপাতায় হেজেমেজে থাকি না আরও কিছুকাল, মাতৃগর্ভ কিংবা কবরের আদিম অন্ধকারের মতো! এই শীতে অনুভবের আঁখিকে এতিম করে একের পর এক ফিল্মের আত্মীয়স্বজন চলে যাচ্ছে; বিনোদ শুক্লা কবিতারও—উপন্যাসের যেমন, ফিল্মেরও তেমন। আর মায়াস্ত্রো বেলা তার; তুরিনের ঘোড়ার কেশর আছড়ে পড়ে বুকের ভেতর ঘনীভূত আস্তাবলে। বিমূর্ত রাতকে মৌনতার সুতোয় চাদরের মতো বুনে, দূর বিদেশে ঘুমিয়ে গেছেন জয়শ্রী কবীরও। প্রিয়বিয়োগে একা লাগে খুব আবার ভাবা যায় একাকিতাই তো এদের সবার প্রিয় প্রসঙ্গ, র ম্যাটারিয়াল।
তুষার ঝরছে দুনিয়ার দিকে দিকে। ভিজে যাচ্ছেন প্রিয় মৃতেরা; কাফকা-লোরকা-সিলভিয়া। পুড়ে যায় জীবন নশ্বর, গাওদিয়া গ্রামে শশী তার কুসুমের দেখা পেল কি না; সে ভাবনা অবিনশ্বর।
যে যাকে ছেড়ে যাক, একাকিতা কাউকে ছাড়ে না, তাকে বুঝে নিতে হয়। রক্তে জিনে নিতে হয়। শীত চলে যাচ্ছে, শাকসবজির গায়ের নতুন রং একটা নতুন কবিতার কথা ভাবায়। পূর্ববর্তী কবিতা থেকে পরবর্তী কবিতা লেখার মধ্যবর্তী ফাঁকা সময়ে কি কেউ ‘কবি’ থাকে? না বোধ হয়, থাকে শুধু অসহ যন্ত্রণা অমোঘ। মুখোমুখি বসিবার শূন্যতা সেন। তুষার ঝরছে দুনিয়ার দিকে দিকে। ভিজে যাচ্ছেন প্রিয় মৃতেরা; কাফকা-লোরকা-সিলভিয়া। পুড়ে যায় জীবন নশ্বর, গাওদিয়া গ্রামে শশী তার কুসুমের দেখা পেল কি না; সে ভাবনা অবিনশ্বর। শীত ফুরিয়ে যায়, শরীরও ফুরোয় হায়, মন ঝুলে থাকে তালবনে, টিলায় অথবা সূর্যাস্ত দেখবার সাধে। গাজায় এখনো বোমা পড়ছে, শান্তি প্রস্তাবের সরু ছায়ায় ঢাকা পড়ে গেছে ক্ষুধার্ত শিশুর অস্বাভাবিক-ফোলা পেট। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের শতবর্ষের প্রাক্কালে লাতিন কি লন্ডভন্ড হয়ে যাবে? স্লাভোয় জিজেক কী বলেন, শুনে আসি। একটু সান্ত্বনা তো পাব। শীতের মতো ইতিহাসও নাকি একদিন ফিরবে মানুষের দিকে। রাতে রক্তকরবী দেখা হলো, দিনে চাখা হলো ধুলোবালি। চিতই আর ভাঁপা পিঠার অভূতপূর্ব নগরায়ণ দেখে অন্য পিঠারা হতাশায় ধুঁকছে।
‘গ্রামের গরিবদের প্রতি’ বইটাতে কী বলেছিলেন লেনিন? কবে, কোন শীতে পড়া! ভুলে গেছি একেবারে। স্মৃতিতে কুয়াশা জমেছে। আমাদের মতো মেট্রোপলিটনের গরিবদের কথা কে বলবে! যেখানে মাছ নদীর বদলে ডিপফ্রিজে থাকে। হায় রে বরফ, মাছ ও মানুষের মুর্দা তুমি ভালোবেসে জড়িয়ে রাখো। শীতে প্রিয় গানগুলো আরও প্রিয় লাগে। গাঁওবাংলার ভাষায় যেন ‘ওশ’ পড়ে আমার শ্রোতা-কানে; ‘কিছুই তো হলো না’, গেয়ে কোথায় ডুবে গেল বিক্রম সিং খাঙ্গুরা! বিফল বাসনা লয়ে বসে থাকি, এই তো বিশাল সফলতা। চাঁদের বুড়ি রুটি বেলছে সে-ই কত অনন্ত আগে থেকে! তার গায়ে একটা কিছু দাও। ঠান্ডা লেগে যাবে তো। কম্বল-কমফোর্টারের জন্য মায়া লাগছে। শীত চলে গেলে তারা শীতঘুমে যাবেন। যৌননৈতিকতা, প্রেমসর্বস্বতা, কবিতায় ক্রিয়াপদের ব্যবহারযোগ্যতা, জ্বর-কাশি ও আনুষঙ্গিক দুর্বলতাসহ অপেক্ষায় আছে সকাল সাতটা, কখন বাজবে বেলা বারোটা। দুপুর গড়ালে রোদ মেখে বসি তোমার দিবাস্বপ্নের কাছাকাছি। এখন রাতের স্বপ্ন আর নিরাপদ-নিরবচ্ছিন্ন না যেহেতু।
আমার মনের বনে যে ঘন শীত পড়ছে, তা নিবারণ করতে তুমি আসবে তো হিমা? একজন বলল, ‘আপনার কবিতায় এত এত মৃত্যু আসে কেন?’ তাকে এবং সবাইকে বলি, জীবনজুড়ে আমরা মনে হয় মৃত্যুবোধ অর্জন করেই চলি কেবল।
যাই, বেঙ্গলে যাই। প্রদর্শনী চলছে, ‘অন্যস্বর’। আরেহ, দিলারা বেগম জলির রেখা আর রঙে বিক্ষত জরায়ু দেখে নাজলী লায়লা মনসুরের উথালপাতাল চরম সুন্দর হয়ে নাজিয়া আন্দালিব প্রিমার ক্যানভাসে ফোটা নেকাব ও গোলাব! আর, এদের সঙ্গে গ্যালারিতে ফ্রিদা কাহলোও কি নেই? আমি তো দেখলাম একটা আহত হরিণ ছুটে আসছে রঙের বাক্স ভেদ করে অলীকের ইতিউতি রেখা বিস্তার করতে, বিশদে। শীতকাল সফরবান্ধব ঋতু বটে তবে এবারের শীতে বসে থেকে কাটিয়ে দিলাম। এ–ও এক সফর। ছুটে চলা যখন জীবন, বসে থাকা তবে ভ্রমণ। বসে বসে, অল্প শীতে অধিক কাবু হয়ে ভাবছি দূর পাইনবনে জ্যোৎস্না ঝরে পড়ছে, মহিষেরা মধ্যাহ্নভোজের প্রস্তুতি নিচ্ছে, জাফর পানাহি আরও এমন একটা মুভি বানানোর কথা ভাবছেন, যেটা আসলে কোনো মুভিই না। সুলতানার স্বপ্নে একাকার হয়ে আসে পায়রাবন্দ-মাদ্রিদ-বৃন্দাবন। বহুদিন যাবৎ একটা ন্যানো কবিতার কথা ভাবছিলাম; কিন্তু এআই আমার বদলে অথবা আমার হয়ে লিখে দিচ্ছে পাঁচটা দীর্ঘকবিতা। কবিতার নাটবল্টু আমি ফেলে এসেছি এই শীতের শুরুতে, উত্তরবঙ্গে; যেখানে শিশিরে মরে বেঁচেছিল শব্দের শিব ও শব।
শীত পড়লে কুকুর-বিড়াল-হাঁস-মুরগি সবার জন্য কষ্ট হয়। তারা তো আর গায়ে দিতে পারে না সোয়েটার-জ্যাকেট-চাদর, তবু উষ্ণতার অভাবও হয় না। সেদিন একটা গ্রামপথে হাঁটছি, দেখি গাইগরুর গায়ে ভারী বস্তা দিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন একজন। আমার মনের বনে যে ঘন শীত পড়ছে, তা নিবারণ করতে তুমি আসবে তো হিমা? একজন বলল, ‘আপনার কবিতায় এত এত মৃত্যু আসে কেন?’ তাকে এবং সবাইকে বলি, জীবনজুড়ে আমরা মনে হয় মৃত্যুবোধ অর্জন করেই চলি কেবল। আর আমি হয়তো তা সংকলন করে চলি নিষ্ঠভাবে, কবিতা কতটুকু হলো—কে সেই রায় দেবে! মৃত্তিকার সোঁদা আবৃত্তি শুনি পথ চলতে চলতে যদিও জানি না পথের শেষ কোথায় আর জানি না শুরুও ছিল কি না তার কোনো। শীতেই বসন্তপঞ্চমী কড়া নাড়ে, ঘৃণার মচ্ছবে কোথাও তবু তো প্রেম ফুটে ওঠে। বিধুর বিকেল শেষ হয়ে এলে সন্ধ্যায় আর এক রকম হাহাকার দানা বাঁধতে থাকে। বিরহ গাঢ় হচ্ছে গোধূলির প্রশ্রয় পেয়ে। যেখানেই যাই বায়োগ্রাফিক্যাল ফিকশনের ছড়াছড়ি পাই। জীবনীমূলক উপন্যাস অনেক তো হলো, এবার মৃত্যুমূলক উপন্যাসও শুরু করবে কেউ নিশ্চয়ই। মহাশূন্যে কয়েকটা ময়ূর কী করছে? তাদের নাচের বিষে ভিজে মধুর হচ্ছে পাতাল। ভূতলবাসের দিনগুলো ঝরে পড়ে দুনিয়ার আগানে, রাতগুলো লেপ্টে থাকে পরাদুনিয়ার বাগানে। ছায়া নিভে এলে আবছায়া জ্বলবে হয়তো রক্তের শীতল কাননে।