গ্রাফিকস: প্রথম আলো
গ্রাফিকস: প্রথম আলো

স্মৃতিগদ্য

শূন্যতায় জেগে থাকা স্মৃতি

মুর্তজা বশীর দেশের আধুনিক চিত্রকলার অন্যতম পথিকৃৎ, যিনি একই সঙ্গে ছিলেন চিত্রশিল্পী, মুদ্রাতত্ত্ববিশারদ ও সংগ্রাহক এবং ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। ১৭ আগস্ট ছিল তাঁর জন্মদিন। তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণা করেছেন তাঁর মেয়ে মুনীরা বশীর

আজ বাবাকে নিয়ে কিছু স্মৃতিময় কথা লিখছি। লেখাটা বাবার কাছে পৌঁছাবে কি না, তাতে কিছু যায় আসে না। লিখছি কারণ আমাদের একসঙ্গে কাটানো অবিস্মরণীয় মুহূর্তগুলো উদ্​যাপন করার এটি একটি উপায়।

আমার মনে আছে, ২০২০ সালের ১৩ আগস্ট রাত প্রায় ২টায় আমি যখন বাবাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম, তখনই আমার হৃদয় লক্ষ লক্ষ ছোট ছোট টুকরো হয়ে গিয়েছিল। আমি কেন জানি বুঝতে পেরেছিলাম এবং বাবাকে হারাচ্ছি ভেবে ভীত ছিলাম। ২০১৩–২০—দীর্ঘ সাত বছর ধরে আমি বাবাকে নানাবিধ শারীরিক অসুবিধা ও শ্বাসকষ্টে চোখের সামনে শেষ হয়ে যেতে দেখেছি।

ছোটবেলায় আমি উদয়ন স্কুলের ছাত্রী ছিলাম। বাবা স্কুলে নিয়ে যেতেন এবং আম্মা নিয়ে আসতেন। বেগম বাজারের বাসার সামনে আমি আর বাবা রিকশার জন্য অপেক্ষা করতাম। একদিন বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরও কোনো রিকশাওয়ালা স্কুলে যেতে চাচ্ছিল না। এদিকে রোদের তাপে আমার চেহারা লাল হয়ে যাচ্ছিল। বাবা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কষ্ট হচ্ছে? চুপ করে ছিলাম বা কিছু বলেছিলাম কি না মনে নেই। ১৯৬৮ সালে স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানে বাবা ‘টাকার ক্রমবিকাশ’ নামে একটা ৭৪৯ বর্গফুটের ম্যুরাল করেছিলেন, যা বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংগ্রহে আছে। সেখান থেকে টাকা পেয়ে আমার জন্য ব্র্যান্ড নিউ ড্যাটসন গাড়ি কিনে এনেছিলেন। ড্রাইভার রেখেছিলেন ৩০০ টাকা দিয়ে, যেখানে ১০০ টাকায় সংসার ভালোমতো চলত।

ফরাসি টেলিভিশন চ্যানেলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের খবরগুলো দেখে বাবা খুব মনমরা হয়ে যেতেন। তখন দেখেছি বাবা ‘এপিটাফ ফর দ্য মারটায়ার্স’ কাজগুলো করার সময় পাথরের নুড়ি নিয়ে আসতেন। আমি জিজ্ঞাসা করায় বলেছিলেন ‘অজানা অচেনা শহীদদের উদ্দেশে আমি ছবি আঁকব।’

যৌথ পরিবারে সবার ঘরে ফ্রিজ থাকলেও আমাদের ছিল না। আমি বারবার চাচিদের ঘরে গিয়ে ঠান্ডা পানি খাব আর বাবার জন্য নিয়ে আসব, বাবার এটা ভালো লাগছিল না। একদিন দেখলাম, বাবা ফ্রিজ ও এসি কিনে এনেছেন।

২৫ মার্চ ১৯৭১। আমি বেগম বাজারে আমার দাদার বাসায় ছিলাম। বাবা, আম্মা আর ছোট বোন যুথী সায়েন্স ল্যাবের বাসায় ছিল। মুক্তিযুদ্ধের কোনো কথা আমার মনে নেই, শুধু মনে আছে বাসার ছাদে উঠে চাচাতো ভাইবোনদের সঙ্গে লুকিয়ে লুকিয়ে চকবাজারের চারদিকের আগুনের লেলিহান শিখা দেখে ভয়ে শিহরিত হয়ে উঠছিলাম। বাবা যখন বেগম বাজারে দাদার বাসায় আমাকে নিতে এসেছিলেন, মূল দরজায় তালা মারা ছিল। পরে কীভাবে জিনজিরায় এসেছিলাম মনে নেই। এখানে বাবা, আম্মা আর যুথীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেক আবেগে কেঁদে ফেলেছিলেন। মনে করেছিলেন, দাদার বাসার সবাই মারা গেছে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাবার প্রাণ সংশয়ের কারণে জীবন বাঁচানোর তাগিদে বাবা আম্মা, আমাকে আর যুথীকে নিয়ে প্যারিসে চলে আসেন। বাবার কাছে শুনেছি, তখন ছিল তেজগাঁও বিমানবন্দর। আমরা করাচি হয়ে প্যারিস গিয়েছিলাম এবং ঢাকা থেকে এটাই ছিল যাত্রীবাহী শেষ বিমান। প্যারিসে আমাদের জীবনটা খুব সহজ ছিল না। প্যারিসে যাওয়ার পর প্রথমে আমরা রশিদ চাচার (রশিদ চৌধুরী) বাসায় উঠি। যদিও আমি খুব ছোট ছিলাম; কিন্তু আমার মনে আছে, আমরা চাচার বাসায় ওঠার কিছুদিনের মধ্যে চাচা এ্যানি চাচি ও তাঁর দুই মেয়ে রিতা ও রোজাকে নিয়ে চাচির গ্রামের বাড়িতে চলে যান। বাসায় আমাদের জন্য খাবার খুব একটা ছিল না। ভাত খাওয়ার জন্য কাঁদতে কাঁদতে আমার চোখে ঘা হয়ে গিয়েছিল। কত দিন চাচার বাসায় ছিলাম, সেটা আমার মনে নাই।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাবার প্রাণ সংশয়ের কারণে জীবন বাঁচানোর তাগিদে বাবা আম্মা, আমাকে আর যুথীকে নিয়ে প্যারিসে চলে আসেন। প্যারিসে আমাদের জীবনটা খুব সহজ ছিল না। বাসায় আমাদের জন্য খাবার খুব একটা ছিল না। ভাত খাওয়ার জন্য কাঁদতে কাঁদতে আমার চোখে ঘা হয়ে গিয়েছিল।

পরে বুশকে নামে বাবার এক বন্ধুর মায়ের বাসায় উঠি। সেই বয়স্ক মহিলা আমাদের খুব মানসিক যন্ত্রণা দিত। তীব্র শীতে গিজার ছাড়তে দিত না। যুথী অনেক ছোট ছিল। বেচারি ঠান্ডা পানি দেখলেই চিৎকার শুরু করে দিত। আম্মাকে দিয়ে পুরো কাঠের বাড়ির মেঝে মোম পলিশ করাত। আম্মা তো আর ফরাসি ভাষা জানতেন না। সেই বয়স্ক মহিলা আকারে, ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিত ভালোভাবে ঘষে নিতে হবে, যেন মসৃণতা আসে। পরে আমরা মমরোসি বলে একটা জায়গায় ভাড়া বাসায় উঠি এবং আমাদের নিয়ে বাবার সংগ্রামের জীবন শুরু হয়। আমার বাবার পঞ্চম ভাই ড. প্যারিস চাচা সেই সময় সৌদি আরবের বাদশাহ ফয়সাল বিন আবদুল আজিজের হাউস ফিজিশিয়ান ছিলেন। তিনি আমাদের প্যারিসে থাকাকালে আর্থিকভাবে অনেক সাহায্য করেছেন। আমি ওখানে স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম। স্কুলে অনেক বুলিংয়ের শিকার হতে হয়েছিল। ফরাসি টেলিভিশন চ্যানেলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের খবরগুলো দেখে বাবা খুব মনমরা হয়ে যেতেন। তখন দেখেছি বাবা ‘এপিটাফ ফর দ্য মারটায়ার্স’ কাজগুলো করার সময় পাথরের নুড়ি নিয়ে আসতেন। আমি জিজ্ঞাসা করায় বলেছিলেন ‘অজানা অচেনা শহীদদের উদ্দেশে আমি ছবি আঁকব।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স পরীক্ষার সময় আমি প্রেগন্যান্ট ছিলাম। বাংলা আমার সাবসিডিয়ারি ছিল। পরীক্ষার আগে সারা রাত জেগে বাবা আমার জন্য নোট তৈরি করে দিয়েছিলেন। ২০১১ সালে আমি টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলাম। বাবা তখন সারা দিন হাসপাতালে থেকে আমার দেখাশোনা করেছেন। সেই সময় দেখেছি, একজন স্নেহময় পিতা তাঁর সন্তানের মঙ্গল কামনায় কতটা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিলেন। বাবা বলতেন পৃথিবীতে সবচেয়ে দুর্বহ ভার—পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ।

বাবার সঙ্গে আমার অসংখ্য স্মৃতি আছে। বাবাকে বৃদ্ধ বয়সে সীমাহীন যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে। ব্যয়বহুল চিকিৎসার জন্য টাকা কীভাবে আসবে, সেই চিন্তা করতেন। বলতেন, ‘ছবি আঁকলে টাকা আসবে। অসুস্থতার কারণে ছবি আঁকতে পারছি না।’ একবার বাবার মেডিকেল রিপোর্টে ‘কার্সিনোমা’ শব্দটা দেখে ঘাবড়ে গিয়েছিলেন এবং আমাকে বলেছিলেন, ‘আমার ক্যানসার হলে কোনো ট্রিটমেন্ট করবা না। তোমাদের পথে বসিয়ে ট্রিটমেন্ট করে আমি বাঁচতে চাই না।’

যখন বাবাকে হারিয়েছিলাম, তখন আমি নিজের একটি বড় অংশ, আমার পরিচয় হারিয়ে ফেলেছিলাম। বাবা ছিলেন আমার মায়ের যত্নশীল স্বামী এবং আমাদের দুই বোন, এক ভাইয়ের স্নেহশীল পিতা। মৃত্যুর আগে আম্মা শারীরিক যন্ত্রণায় ভুগেছিলেন। ২০১৭ সালের ১৩ মে তিনি অনন্তলোকে চলে যান। তাঁর কষ্টের সময় বাবা কিছু করতে না পারায় ২০ মে তিনি ফেসবুকে লিখলেন—‘শেম অন মি!! অ্যাজ আ সেলফ–সেন্টারর্ড লাইফ পার্টনার কুড নট শেয়ার দ্য পেইন।’ আম্মার চলে যাওয়া বাবা কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি। আমাকে বলতেন, ‘যুই তোর আম্মা আমাকে এভাবে একা করে কী করে চলে গেল। তোর আম্মার শূন্যতা অনেক কষ্ট দেয়।’

বাবা অনন্তলোকে চলে গেছেন পাঁচ বছর হলো। আমি তাঁর সঙ্গে প্রতিদিন কথা বলতাম, কখনো দিনে একাধিকবার। মৃত্যুর ৪৮ ঘণ্টা আগেও কথা বলেছি। বাবা ছাড়া প্রতিটি দিনই যেন আমাকে মানিয়ে নিতে হয়। এটি আমার জীবনের বিশাল শূন্যতা, যা স্মৃতিগুলোকে নিষ্ঠুরভাবে জাগিয়ে তোলে। আমার হৃদয়ের একটি অংশে বাবা থাকবে, যতক্ষণ না আমরা আবার দেখা করব। প্রিয়জন হারানোর ব্যাপারটা এমন—তাঁরা চলে গেলে প্রতিটি স্মৃতি এমনভাবে প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে, যেন পাঁচ মিনিট আগের ঘটনা। আমার সবকিছু মনে আছে। বাবার সঙ্গে প্রতিটি স্মৃতি।