
জীবনানন্দ দাশ তাঁর ‘বনলতা সেন’ কবিতাটির যে ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন, সেখানে মালয় সাগরকে করেন ‘দ্য সিজ অব মালয়া’। তাঁর জীবনীকার ও অনুবাদক ক্লিনটন সিলিও মালয় সাগরকে ‘মালয়ান সিজ’ অনুবাদ করেন। অবশেষে ক্লিনটন উপলব্ধি করেছেন, এর সঠিক ভৌগোলিক অনুবাদ হবে ‘সিজ আপ দ্য মালাবার কোস্ট’। কেন? এটিই রচনাটির প্রতিপাদ্য।
জীবনানন্দ দাশের বিভ্রান্তিকর একটা কবিতার শিরোনাম ‘নিরঙ্কুশ।’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ ‘অঙ্কুশবিহীন।’ অঙ্কুশ হচ্ছে সুচালো লাঠি, যেটা দিয়ে মাহুত হাতিকে পরিচালনা করে। তাহলে নিরঙ্কুশ শব্দটার অর্থ হতে পারে ‘অপ্রতিরোধ্য, অরোধ্য, স্বাধীন, অনিবার্য, নিয়ন্ত্রণহীন’ ইত্যাদি—যেহেতু অঙ্কুশ ছাড়া মাহুতের হাতে নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। কবিতাটার যে কয়েকটি শব্দকে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করি, পরে সেই শব্দগুলোর কাছে ফিরে আসব আমি।
‘মালয় সমুদ্র পারে সে এক বন্দর আছে শ্বেতাঙ্গিনীদের।
যদিও সমুদ্র আমি পৃথিবীতে দেখে গেছি ঢের:
নীলাভ জলের রোদে কুয়ালালুম্পুর, জাভা, সুমাত্রা ও ইন্দোচীন, বালি
অনেক ঘুরেছি আমি—তারপর এখানে বাদামী মলয়ালী
সমুদ্রের নীল মরুভূমি দেখে কাঁদে সারাদিন।’
কবিতাটির সমস্যাপূর্ণ অন্য সব বিষয়ের মধ্যে প্রথম শব্দটি নিয়েই লেগে পড়তে হয় আমাকে, শব্দটি হচ্ছে ‘মালয় সমুদ্র পারে’ পঙ্ক্তির ‘মালয়’। আমার ইংরেজি অনুবাদে ‘মালয়ান’ হচ্ছে মালয়। মলয় থেকে উদ্ভূত একটা বিশেষণ হিসেবে দেখানো হয়েছে এটাকে, যা দিয়ে দক্ষিণ ভারতের (মালাবার) পশ্চিম ঘাট এবং মালয় উপদ্বীপ—দুটোকেই বোঝায়। আমার অনুবাদে ‘মালয়ান’ বলতে বোঝাতে চেয়েছি বাংলায় কোনো ‘মালয়ালি’ ব্যক্তিকে। মালাবার উপকূল এবং মালয় উপকূলের মধ্য থেকে কবিতাটির স্থানিক বর্ণনা হিসেবে বেছে নেওয়ার সময় আমি জীবনানন্দের নিজের অনুবাদ ‘মালায়া’-এর ওপর ভরসা করেছি, যে শব্দটি তিনি ‘বনলতা সেন’ কবিতাতেও ব্যবহার করেছেন ‘মালয়’ হিসেবে।
বাংলা-ইংরেজি কিংবা বাংলা-বাংলা অভিধান কোনোটি ঘেঁটেই ‘মালয়ালি’ শব্দটি পাওয়া যায়নি, অথচ ‘নিরঙ্কুশ’ কবিতাতে নামহীন ব্যক্তিটিকে বোঝাতে জীবনানন্দ এই শব্দটিই ব্যবহার করেছেন। তবে কেবল সবচেয়ে ভালো অভিধানে অর্থাৎ বাংলা থেকে বাংলা অভিধানের দুই খণ্ডে ‘মালয়’ শব্দটি আছে, যেটি দিয়ে শুরু হয় জীবনানন্দের কবিতাটি। ‘মলয়’ থেকে নিয়ে বিশেষণ হিসেবে দেখানো হয়েছে শব্দটিকে। ‘মলয়’ সব অভিধানেই পাওয়া যায়, যার অর্থ দক্ষিণ ভারতের পশ্চিম ঘাট পর্বতের একটা ভৌগোলিক অঞ্চল, যেখানে চন্দনগাছ জন্মায়। একই শব্দ দিয়ে মালাবারও বোঝানো হয়, অর্থাৎ পশ্চিম ঘাটের মালাবার উপকূল। উচ্চ মানসম্মত সংসদ বাংলা-ইংরেজি অভিধানে প্রথমে মলয়-এর তরজমা করা হয়েছে পশ্চিম ঘাট পার্বত্যাঞ্চল হিসেবে। তবে দ্বিতীয় সংজ্ঞাটি বিশেষ কৌতূহলোদ্দীপক, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে ‘মালাবার কিংবা মলয় উপদ্বীপের প্রাচীন নাম।’ প্রথমবারের মতো এখানে বর্তমানের মালয়েশিয়া তথা মলয় উপদ্বীপের সঙ্গে সম্পর্কটি স্থাপিত হয়। তবে উল্লেখ করা দরকার যে এটা ‘মলয়,’ ‘মালয়’ নয়, যে শব্দ দিয়ে শুরু হয়েছে জীবনানন্দের কবিতাটা, যা ব্যবহৃত হয়েছে মালয় উপদ্বীপ বোঝাতে। আবারও বলতে গেলে, ‘মালয়’ শব্দটা সংসদ বাংলা–ইংরেজি অভিধানে পাওয়া যায় না। অভিধান বাদ দিলেও, কেউ যদি একটা বাংলা মানচিত্র খুঁজে দেখে, সেটিতে মলয় উপদ্বীপটা পাওয়া যাবে মালয় নামে, যা থেকে নিশ্চিতভাবে বোঝা যায় যে জীবনানন্দ মালয় উপদ্বীপকে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন মালয় নাম দিয়ে।
‘বনলতা সেন’ কবিতার অন্তর্জালিক সংস্করণের তিনটিতে অনুবাদকদের সবাই কথককে মলয় উপদ্বীপের দূরবর্তী জলসীমায় সঠিকভাবেই স্থাপন করেছেন। একজন বলেছেন ‘মালয়েশিয়া’, অন্যজন ‘মলয় দ্বীপপুঞ্জ’ এবং শেষোক্তজন বলেছেন ‘মালাক্কা বন্দরের’ কথা।
প্রায় ত্রিশ বছর আগে আমার অভিসন্দর্ভের পাদটীকায় লিখেছিলাম, আমার অনুবাদে জীবনানন্দের নিজের ইংরেজিতে তরজমা করা ‘মালয়’ শব্দটির ওপর ভরসা করেছি আমি। ‘নিরঙ্কুশ’ কবিতাটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেননি তিনি, তবে তাঁর প্রতিনিধিত্বশীল কবিতা ‘বনলতা সেন’ করেছেন।
জীবনানন্দের কবিতার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত এই কবিতাটা বহুবার ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। ১৯৬২ সালে পি লাল এবং রাইটার্স ওয়ার্কশপ ষোলোটি কবিতা নিয়ে একটা ক্ষীণকায় সংকলন প্রকাশ করেছিল, যে সংখ্যাটি কাকতালীয়ভাবে ১৯৪০-এর দশকের প্রথম দিকে প্রকাশিত ‘এক পয়সায় একটি’ সিরিজের জন্য যথার্থ হতে পারত। রাইটার্স ওয়ার্কশপের সংকলনটির নাম ছিল বনলতা সেন এবং যার প্রথম চারটি ছিল ‘বনলতা সেন’ কবিতার চারটি আলাদা অনুবাদ। এর মধ্যে প্রথমটির অনুবাদকের নাম সংক্ষিপ্তাকারে ছিল কেবলই এস ডি।
বর্তমান সময়ে সব ধরনের তথ্যের সমৃদ্ধ উৎস হিসেবে ক্রমাগত প্রমাণ রেখে যাচ্ছে ইন্টারনেট। কেউ যদি গুগলে ‘বনলতা সেন’ লিখে খোঁজ করে, কবিতাটির বিস্ময়কর অনুবাদ-বৈচিত্র্যের দেখা মিলে যাবে তৎক্ষণাৎ, কিংবা পি লালের ভাষায় পাওয়া যাবে জীবনানন্দের সেরা কাজটির ‘ভাষান্তরিত সৃষ্টি’ (ট্রান্সক্রিয়েশনস)। ওয়েবসাইটে এ রকম চারটি অনুবাদের কথা উল্লেখ করা যায়।
‘বনলতা সেন’ কবিতার অন্তর্জালিক সংস্করণের তিনটিতে অনুবাদকদের সবাই কথককে মলয় উপদ্বীপের দূরবর্তী জলসীমায় সঠিকভাবেই স্থাপন করেছেন। একজন বলেছেন ‘মালয়েশিয়া’, অন্যজন ‘মলয় দ্বীপপুঞ্জ’ এবং শেষোক্তজন বলেছেন ‘মালাক্কা বন্দরের’ কথা। আলোচ্য চারটি অনুবাদের প্রথমটিতে বলা হয়েছে ‘দ্য বে অব মালয়’-এর কথা, সেটা যেখানেই হোক না কেন। আমরা যদি ভূচিত্রাবলিতে খোঁজ করি, সেখানে কোথাও বে অব মালয় (মালয় উপসাগর) কিংবা মালয় সি কিংবা মালয়ান সি (মালয় সাগর) দেখতে পাই না। মলয় উপদ্বীপের পূর্ব দিকের জলরাশিকে বলা হয় চীন সাগর। পশ্চিম উপকূলের জলরাশি, অন্তত যে অংশ ইন্দোনেশিয়ার দিকে, সেটির নাম মালাক্কা প্রণালি। মলয় উপদ্বীপের আশপাশে কোথাও মালয় সাগর বলে কিছু নেই।
এই পর্যায়ে সমালোচনার তিরটা নিজের দিকে ফেরাতে চাই আমি এবং পরিষ্কার ও উচ্চকণ্ঠে জানাতে চাই আমার ঘাটতির কথা।
আমরা জীবনানন্দের রাজনৈতিক ও দুর্বোধ্য যুগে লেখা কবিতাটিকে ঢেকে রাখা পর্দার অস্পষ্টতার একটিকে সরিয়ে ফেলতে সক্ষম হই। মলয়ালী উল্লেখ করা চতুর্থ পঙ্ক্তিতে অকুস্থল হিসেবে ব্যবহৃত ‘এখানে’ শব্দটি জীবনানন্দের পাঠকদের জানায় যে সেটি কুয়ালালুম্পুর, জাভা, বালি ইত্যাদি নয়, বরং অন্য কোনো জায়গা।
জীবনানন্দের কবি-কথককে আমি পাই মলয় উপদ্বীপের কোনো একটি উপকূলঘেঁষা জলসীমায়। ত্রিশ বছর আগের পাদটীকায় লিখেছিলাম, কবি-কথককে মলয় উপদ্বীপের কাছাকাছি কোনো এক জায়গায় উপস্থাপন করার সিদ্ধান্তটি আমি নিয়েছিলাম জীবনানন্দের নিজ হাতে করা অনুবাদটি পড়ার পর। এবারে সেই অনুবাদে ফিরে গিয়ে সেটিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতে চাই আমি।
জীবনানন্দের অনুবাদে ‘ওয়াইন্ডিং’ শব্দটা লক্ষ করা যাক। বাংলা ভাষ্যে তৃতীয় পঙ্ক্তিতে ‘ঘুরেছি’ ক্রিয়াপদটি রয়েছে, তবে সেটি বলতে ‘ঘুরে বেড়ানো’ অর্থাৎ ভ্রমণ করা বোঝানো যায়, যেভাবে প্রথমে অনুবাদ করেছিলাম আমি। ক্রিয়াপদটির আরেকটি অর্থ হচ্ছে ‘পাক খাওয়া’ কিংবা ‘চক্রাকারে ঘোরা।’ এখন আমরা যদি ‘ঘুরেছি’ বলতে ‘ভ্রমণ করা’র বদলে ‘ওয়াইন্ডিং’ (পাক খাওয়া) কিংবা ‘সার্কলিং’ (চক্রাকারে ঘোরা) বোঝাই, তাহলে অপেক্ষাকৃত ভালো একটা অর্থ পাওয়া যায় যে ‘সিংহল সমুদ্র’ ছেড়ে কোথায় অর্থাৎ কোন দিকে যাচ্ছেন কবি-কথক। যদি তিনি ‘পাক খান’ কিংবা ‘চক্রাকারে’ ঘোরেন, ধারণা করা যায়, তিনি সোজা মালয় উপদ্বীপের পূর্ব দিকে যাচ্ছেন না; বরং ভারতের সর্বদক্ষিণ বিন্দু কন্যাকুমারীতে পাক খেয়ে উত্তর দিকে পশ্চিম উপকূলের দিকে অগ্রসর হন, যেটি মালাবার উপকূল নামেও পরিচিত। আমরা যদি ‘মলয়’ উপদ্বীপকে নাম হিসেবে না ভেবে দক্ষিণ ভারতের পশ্চিম উপকূলের ‘মলয়’ অঞ্চলের বিশেষণ হিসেবে ‘মালয়’-এর অর্থ পুনর্বিবেচনা করি, তাহলে দেখতে পাই জীবনানন্দ ‘মালয়’ বলতে মলয় উপদ্বীপ বোঝাননি মোটেও, তার পরিবর্তে ‘সাগর’ বা ‘মহাসাগর’ শব্দকে পরিবর্তন করে বোঝাচ্ছেন মালাবার উপকূলের জলসীমাকে। অতএব ‘মালয় সাগর’ হচ্ছে মালাবার উপকূল বরাবর সমুদ্রের নাম, কিংবা অন্যভাবে বললে, গোয়া থেকে মহাদেশের দক্ষিণ বিন্দু অবধি পশ্চিম উপকূলঘেঁষা আরব সাগর। প্রথম অক্ষরে ‘অ’ সংবলিত ‘মলয়’ একটা যথার্থ তৎসম—অর্থাৎ সংস্কৃত বিশেষ্য, যা মূলত বোঝায় চন্দনগাছের জন্য বিখ্যাত দক্ষিণ ভারতের পশ্চিম উপকূল নিকটবর্তী মালাবার সৈকত এবং পশ্চিম ঘাট পর্বত। তাহলে জীবনানন্দের নিজের অনুবাদে ‘মলয় সাগর’ বলতে বোঝানো হয়েছে দক্ষিণ ভারতের পশ্চিম উপকূলের বিপরীত দিকের জলসীমা।
উল্লেখ্য, আধুনিক বাংলা ভাষায় সেটা মালাবার নাকি মলয় উপদ্বীপের ভৌগোলিক সীমানা, তা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। আমরা যদি ‘নিরঙ্কুশ’ কবিতাটা আবার পড়ি, যার প্রথম তিনটি শব্দ এ রকম: মালয় সমুদ্র পাড়ে। ঠিক সেই মুহূর্তে পাঠক-পাঠিকা জানেন না তাঁরা মলয় উপদ্বীপ নাকি মালাবারের কথা ভাববেন। কবিতার তৃতীয় পঙ্ক্তিতে কুয়ালালুম্পুর, জাভা, সুমাত্রা, ইন্দোচীন এবং বালির উল্লেখ পাঠককে ধারণা দেয় যে প্রথম শব্দটি মলয় উপদ্বীপের কথা বোঝাচ্ছে। তারপর ‘মলয়ালী’ শব্দের সহযোগে আমরা চতুর্থ পঙ্ক্তিতে আসি, যেটিকে ‘নিরঙ্কুশ’-এর প্রথম অনুবাদে কবিতাটির মধ্যে পূর্বাপর মিল রাখার জন্য ‘মালয়ান’ করতে বাধ্য হয়েছিলাম আমি। কিন্তু মলয়ালী মূলত মলয়ালী, মলয়ী ‘মালয়ান’ নয়—যেভাবে বাংলাভাষীরা এটিকে চেনেন, যদিও এখন পর্যন্ত কোনো অভিধানে শব্দটির দেখা পাওয়া যায়নি। চতুর্থ পঙ্ক্তিতে শব্দটির মুখোমুখি হওয়ার পরই আমরা বুঝতে পারি যে ‘মালয়’ বলতে মালাবারকেই বোঝায়, যেখানে বাস করে মলয়ালীরা। অন্তত এই কবিতায় শব্দটি মলয় উপদ্বীপ বোঝায় না।
মলয় থেকে মালাবারে এই ভৌগোলিক স্থানান্তরের সঙ্গে আমরা জীবনানন্দের রাজনৈতিক ও দুর্বোধ্য যুগে লেখা কবিতাটিকে ঢেকে রাখা পর্দার অস্পষ্টতার একটিকে সরিয়ে ফেলতে সক্ষম হই। মলয়ালী উল্লেখ করা চতুর্থ পঙ্ক্তিতে অকুস্থল হিসেবে ব্যবহৃত ‘এখানে’ শব্দটি জীবনানন্দের পাঠকদের জানায় যে সেটি কুয়ালালুম্পুর, জাভা, বালি ইত্যাদি নয়, বরং অন্য কোনো জায়গা। উল্লেখ্য, আমি নিজেও সেই আলোকিত পাঠকদের অন্তর্ভুক্ত। কবি-কথক যেখানে বাস করেন ‘এখানে’ অর্থাৎ ভারতে, মলয়ালীরা যে দেশটির পশ্চিম উপকূলে বাস করে।
‘অ’ সংবলিত ‘মলয়’ একটা যথার্থ তৎসম—যা মূলত বোঝায় চন্দনগাছের জন্য বিখ্যাত দক্ষিণ ভারতের পশ্চিম উপকূল নিকটবর্তী মালাবার সৈকত এবং পশ্চিম ঘাট পর্বত। তাহলে জীবনানন্দের নিজের অনুবাদে ‘মলয় সাগর’ বলতে বোঝানো হয়েছে দক্ষিণ ভারতের পশ্চিম উপকূলের বিপরীত দিকের জলসীমা।
কবিতাটির মধ্যে একটা রাজনৈতিক উচ্চকণ্ঠ আছে বলেই উপলব্ধ হয়ে এসেছে সব সময়। দীপ্তি ত্রিপাঠি কবিতাটি সম্পর্কে লেখেন যে এটি বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যবাদী এবং খ্রিষ্টান মিশনারিদের মধ্যে যোগসাজশের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা একটা বক্তব্য। তবে তাঁর বক্তব্য থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার হয় না যে কবিতাটিকে তিনি ভারতের পটভূমিতে দেখেছেন নাকি অন্য কোথাও। তাঁর শব্দান্তরিত ভাবের মধ্যে একটা ‘দারুচিনিসুবাসিত দ্বীপময় ভারত’-এর কথা বলা হয়। এটি জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ কবিতার প্রতি তাঁর সুস্পষ্ট ইঙ্গিত, যেটি দ্বিতীয় স্তবকের একটা বর্ধিত উপমায় মনের পর্দায় তুলে আনে ‘দারুচিনি দ্বীপ’-এর চিত্রকল্প। ‘নিরঙ্কুশ’ কবিতাটিতে অবশ্য দারুচিনি কিংবা দ্বীপের কোনো উল্লেখ নেই। এটিতে আছে নির্দিষ্টতার একটা কৌতূহলী ইঙ্গিত, অর্থাৎ একটা বিশেষ ঘটনার কথা উল্লেখ করছেন জীবনানন্দ। চার স্তবকের তৃতীয়টিতে একটা সময়ের কথা বলা হয় ‘একদিন শতাব্দীর শেষে।’ স্তবকের দ্বিতীয় পঙ্ক্তি শুরু হয় ‘অভ্যুত্থান’ শব্দ দিয়ে, যার পরে রয়েছে ‘শুরু হওয়া’ ক্রিয়াপদের অতীত রূপ। রাজনৈতিক ঘটনা, বিদ্রোহ, অভ্যুত্থান যা-ই হোক না কেন, শুরু হয়েছে ‘একদিন শতাব্দীর শেষে’, যা এখনো অস্বচ্ছ রয়ে গেছে। এই ‘দুর্বোধ্য, রাজনৈতিক কবিতাটি’র প্রথম অর্থ বোঝার চেষ্টা শুরু করার প্রায় ত্রিশ বছর পর আজ মনে হয় উপলব্ধির আরও কাছে এসেছি আমি, তবে খুব কাছে নয়, কিছুটা কাছে। জীবনানন্দ একটা প্রকৃত ঘটনার ওপর আলোকপাত করছেন, যে ঐতিহাসিক ঘটনাটি ঘটেছিল দক্ষিণ পশ্চিম ভারতের মলয়ালীদের অঞ্চলে। আমার বলতে ইচ্ছা হচ্ছে, তিনি হয়তো মালাবার বিদ্রোহ সম্পর্কে লিখেছেন, যা মোপলা বিদ্রোহ নামেও পরিচিত, তবে সেটি ঘটেছিল ১৯২১ সালে, ‘একদিন শতাব্দীর শেষে’ নয়। অন্তত অস্পষ্টতার আরও একটি পরত জীবনানন্দের কবিতার অর্থের ভেতর থেকে যায়, আমাদের মধ্যেও। তৃতীয় স্তবকে উল্লেখিত ঘটনা সম্পর্কে আমাদের জানানোর কাজটা অন্যদের ওপর ছেড়ে দিচ্ছি আমি। যা-ই হোক, সম্ভবত এখনো অপূর্ণভাবে উপলব্ধ এই বিশেষ কবিতাটির রংধনু-রং ছড়ানো কাচের ভেতর দিয়ে দেখে তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত এবং অনুমিতভাবে সুবোধগম্য কবিতা ‘বনলতা সেন’-এর একটা নতুন পরিপ্রেক্ষিত লাভ করি আমরা।
দেরিতে জ্ঞানপ্রাপ্ত হয়ে আমি এখন ‘বনলতা সেন’ কবিতার অনুবাদ শুদ্ধ করা এবং ‘মালয়ান সিজ’-এর (মালয় সাগর) জায়গায় ‘সিজ আপ দ্য মালাবার কোস্ট’ করার জন্য প্রস্তুত। এখন জীবনানন্দের নিজস্ব ইংরেজি ভাষাভঙ্গি আমার কাছে স্পষ্ট, ‘মালয় সাগরে অনেক ঘুরেছি’ দিয়ে বোঝানো হচ্ছে ‘করমন্ডল উপকূল থেকে ঘুরতে ঘুরতে ভারতের কন্যাকুমারী অন্তরীপ ঘুরে মালাবার উপকূলরেখার নিকটবর্তী হওয়া।’ ‘মালয়’কে ‘মালাবার’ বলে চিনে নেওয়ার উপলব্ধি প্রকৃতপক্ষে নিজের ভেতর আরও বেশি সংগতিপূর্ণ পাঠে উদ্বুদ্ধ করায়। কবিতাটিতে চিত্রিত করা সব কর্মকাণ্ড ঘটে দক্ষিণ এশিয়ায়। জীবনানন্দের কবিতাটির তিনটি স্তবকে আমরা যা পাই, সেটি হচ্ছে খ্রিষ্টপূর্ব যুগের রাজা ও রাজ্য থেকে শুরু করে সমসাময়িক কালের ইতিহাসের বিশাল নিরন্তর প্রবাহে কল্পিত হলেও সান্ত্বনাদাত্রী এক রমণীকে।
ইতিহাসের এই পরিসরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা কাব্যিকভাবে অতিক্রম করে যাই দুই মহাসাগরের মধ্যবর্তী দক্ষিণ ভারত থেকে উত্তরবঙ্গের ছোট বিভাগীয় শহর নাটোর পর্যন্ত দূরত্বের বিশাল বিস্তার। এককথায়, আমাদের হাতে যে কবিতাটি আছে, সেটি দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশের পুরোটা ঘুরে এসে থামতে পারে এবং আলোকপাত করতে পারে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি এবং মুহূর্ত—উভয়ের ওপর। এটি মূলত সময় ও ভূখণ্ড পেরিয়ে এক উত্তেজনাপূর্ণ যাত্রা, সেই সময় ও ভূখণ্ড দক্ষিণ এশিয়ার যে নির্দিষ্ট জায়গা নিবদ্ধ, সেটিকে কবিতাটির রচনাকাল, অর্থাৎ ১৯৩০-এর দশকে বিশ্ব চিনত ভারত হিসেবে, যদিও নাটোর এখন বাংলাদেশের একটি অংশ। ‘বনলতা সেন’ বহু বিবেচনায় সূক্ষ্মভাবে একটা প্রবল জাতীয়তাবাদী কবিতা। এ কবিতার কবি-কথক মূর্ত করে সব ভারতীয়, দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ, বর্তমান ও ইতিহাসের পুরো সময়কে। একই সঙ্গে তিনি অর্থাৎ কবি-কথক স্পষ্টতই একজন পুরুষ, একক ব্যক্তিত্ব, যাকে আশ্রয় দেয় এক নামধারী নারী, অনির্দিষ্ট কোনো ভারত মাতা নয়, পরিচিত এক বাঙালি নারী।
• রচনাটি ক্লিনটন বি সিলির প্রবন্ধগ্রন্থ বরিশাল অ্যান্ড বিয়ন্ড-এর প্রকাশিতব্য বাংলা সংস্করণ থেকে উদ্ধৃত ও সংক্ষেপিত।