গ্রাফিকস: প্রথম আলো
গ্রাফিকস: প্রথম আলো

দুই জয়ন্তীর ক্রিকেটীয় কোলাজ

হৃৎপুরের রূপকথা থেকে মিরপুরের রাজত্ব

মিরপুরে কাল রাত থেকে ঝিরঝিরে বৃষ্টি। সঙ্গে দমকা বাতাস। আবহাওয়ার এই খামখেয়ালি রূপ যেন স্রেফ প্রকৃতির স্বাভাবিক খেয়াল নয়। এটা আসলে একটা টাইমমেশিন। এই বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা আমাকে টেনে নামিয়ে দিল ২১ বছর আগের এক চেনা রাতে। হৃৎপুর বন্দরের সেই রাত।

২০০৫ সালের ১৮ জুন। তখন আমরা ক্রিকেটের বিশ্বমঞ্চে কেবলই একচিলতে কৌতূহল। আর প্রতিপক্ষ? ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে দাপুটে, অহংকারী আর অপরাজেয় দল শেন ওয়ার্নের অস্ট্রেলিয়া। কার্ডিফের সোফিয়া গার্ডেনসে যখন মাশরাফি-তাপসের স্বপ্নের স্পেলের পর মোহাম্মদ আশরাফুলের সেই জাদুকরি সেঞ্চুরিতে অজিদের দর্পচূর্ণ হলো, হৃৎপুর বন্দরে তখন মাঝরাত। ঘুমের বারোটা বাজিয়ে আমি আর পুলক—দুই ভাই তখন ঘর থেকে বেরোনোর ফন্দি খুঁজছি। বাইরে তখন ক্রিকেটের প্রথম ‘বিজয় জয়ন্তী’র গর্জন। নিস্তব্ধ রাস্তা মাতিয়ে মিছিল নামল। মর্নিংসান ক্রিকেট ক্লাব, উপজেলা ক্লাব নাকি মাস্টারপাড়া—কে প্রথম মিছিল নিয়ে বন্দরে এসেছিল, সেই বিতর্ক আজও অমীমাংসিত। মন্দ লোকে অবশ্য বলে, প্রফেসরপাড়া ক্রিকেট ক্লাবই নাকি প্রথম মিছিলের নোঙর ফেলেছিল বন্দরে। কিন্তু তাতে কী? মিছিলের রং তো একটাই ছিল—লাল-সবুজ।

ক্রিকেট আমাদের সেদিন প্রথম শিখিয়েছিল, ওই পরাক্রমশালী অজিদেরও মাটিতে নামানো যায়। ওটা ছিল আমাদের ক্রিকেটের প্রথম জয়ন্তী—এক অবিস্মরণীয় রূপকথা।

শেডের বাইরে ঢাকাইয়া ছাট বৃষ্টি। জল ছুলে ‘টাইগারে’র রং ধুয়ে যাবে। অস্ট্রেলিয়া বধের পর বাংলাদেশ সমর্থকদের যৌথ সেলফি। ৯ জুন ২০২৬, মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম, ঢাকা

আর গত মঙ্গলবার রাতে মিরপুরে ধরা দিল আমাদের দ্বিতীয় ‘জয়ন্তী’। ২১ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডেতে আবার জয়। তবে এবার কোনো রূপকথা নয়, এবার স্রেফ ‘রাজত্ব’।

ম্যাথু শর্টকে করা তাসকিনের প্রথম বলের সেই ইনসুইঙ্গার যখন স্টাম্প উড়িয়ে দিল, অজি ওপেনারের অবিশ্বাসে মাথা ঘোরানো ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। এরপর মোস্তাফিজের ছোবল আর সবার ওপরে তরুণ নাহিদ রানার ১৪০+ গতির আগুন আর বাউন্সার! জশ ইংলিসকে আউট করে নাহিদ যেভাবে তেড়ে গিয়ে চোখে চোখ রেখে অজি অহমে আঘাত করলেন, তাতেই বোঝা যায়—ক্রিকেটের ব্যাকরণটা এখন আমরা লিখছি। মোসাদ্দেকের অপরাজিত ৮৬ রানের ইনিংস আর বল হাতে অলরাউন্ডার দাপট যেন অজিদের মনে করিয়ে দিল, এটা বাংলাদেশ…ভুবনখ্যাত বেঙ্গল টাইগারের ডেরা।

তবে ম্যাচের শেষটায় একটা দারুণ কাব্যিক টুইস্ট ছিল। অস্ট্রেলিয়া যখন ক্যামেরন গ্রিনের ব্যাটে চড়ে ম্যাচটা স্রেফ টেনে লম্বা করার ব্যর্থ চেষ্টা করছিল, তখনই আকাশ ভেঙে নামল বৃষ্টি। আর তাতেই ডাকওয়ার্থ-লুইস (ডিএলএস) পদ্ধতিতে ৮৬ রানের বিশাল ব্যবধানে জয়ী বাংলাদেশ!

শেডের বাইরে বৃষ্টি। জল ছুলে ‘টাইগারে’র রং ধুয়ে যাবে। অস্ট্রেলিয়া বধের পর বাংলাদেশ সমর্থকদের সাথে ‘টাইগার’। ৯ জুন ২০২৬, মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম, ঢাকা
হৃৎপুরের সেই রাতের কাঁচা আবেগের মিছিল আর মিরপুরের আজকের এই ঘটমান বর্তমান। দুই যুগের দুই জয়ন্তী এসে মিলে গেছে পেশাদারি বিন্দুতে। মিরপুরের এই দমকা বাতাস আসলে ২০০৫ আর ২০২৬-এর এক অনবদ্য ক্রিকেটীয় সুইং…গুড লাক, বাংলাদেশ!

কী চমৎকার রসিকতা, তাই না? ক্রিকেটের বৃষ্টি-আইন বা ডিএলএস পদ্ধতি সাধারণত বড় দলগুলোর পক্ষে যায় বলে একটা অলিখিত দুর্নাম আছে। কিন্তু কাল মিরপুরের বৃষ্টি যেন আমাদের ঘরের ছেলে হয়ে গেল। অজিরা যখন গ্রিনের ঢিমেতালের ব্যাটিংয়ে চড়ে কোনো অলৌকিক কিছুর আশায় ম্যাচটা টেনে নিচ্ছিল, বৃষ্টি এসে যেন আম্পায়ারের চেয়েও কড়া গলায় বলল, ‘আর কত খেলবে? দ্রুত হোটেলে ফিরে জিঙ্ক নিয়ে বসতে হবে, ব্যাগ গোছাও!’ বৃষ্টির কল্যাণে আসা এই ৮৬ রানের ব্যবধানটা অজিদের অহংকারে রসগোল্লার ঠোসা দিল।

হৃৎপুরের সেই রাতের কাঁচা আবেগের মিছিল আর মিরপুরের আজকের এই ঘটমান বর্তমান। দুই যুগের দুই জয়ন্তী এসে মিলে গেছে পেশাদারি বিন্দুতে। মিরপুরের এই দমকা বাতাস আসলে ২০০৫ আর ২০২৬-এর এক অনবদ্য ক্রিকেটীয় সুইং…গুড লাক, বাংলাদেশ!