গ্রাফিকস: প্রথম আলো
গ্রাফিকস: প্রথম আলো

বৌদ্ধ দার্শনিক ও কবি

নাগার্জুন: প্রজ্ঞা ও করুণার যুগলবন্দী

বিস্ময়কর এক বৌদ্ধ দার্শনিক ও কবি ছিলেন নাগার্জুন। তিনি ছিলেন জীবন্ত চিন্তার নদী, যা ভারতের মধ্যযুগীয় বৌদ্ধজগৎকে ভেঙেচুরে নতুন পথ দেখায়। তাঁর গুরুত্ব এতটাই বেশি যে তাঁকে কখনো কখনো ‘দ্বিতীয় বুদ্ধ’ হিসেবেও সম্মানের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়।

নাগার্জুন মহাযান বৌদ্ধধর্মের বিকাশে একজন প্রধান প্রবক্তা ছিলেন। এই ভাবধারা শুধু নিজের মুক্তির জন্য নয়, বরং সব জীবের জ্ঞানার্জন ও দুঃখ থেকে মুক্তির জন্য বোধিসত্ত্বের প্রতিজ্ঞা গ্রহণের ওপর জোর দেয়।

নাগার্জুনের জন্ম ও জীবনকাল সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে নানা মতভেদ আছে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, তিনি খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতকে দক্ষিণ ভারতের অমরাবতীর কাছে এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। এই সময় বৌদ্ধধর্ম চীন এবং অন্যান্য পূর্ব এশীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছিল।

ছোটবেলা থেকেই নাগার্জুন লেখাপড়ায় অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। তখন থেকেই তিনি তাঁর প্রখর বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিলেন, যা তাঁর পরবর্তী লেখাগুলোতে প্রতিফলিত হয়েছে। যৌবনে তিনি বেদ-বেদাঙ্গ, জ্যোতিষ, আয়ুর্বেদ, রসায়নশাস্ত্র ইত্যাদি নানা শাস্ত্রে পাণ্ডিত্য লাভ করেন।

কিংবদন্তি আছে, তরুণ বয়সে অদৃশ্য হওয়ার মন্ত্র শিখে নাগার্জুন বন্ধুদের সঙ্গে রাজপ্রাসাদে গিয়ে নারীদের সঙ্গে আমোদ করতে গিয়ে ধরা পড়েন। তাঁর বন্ধুরা নিহত হন। এই অভিজ্ঞতা থেকে নাগার্জুন উপলব্ধি করেন, কীভাবে কামনা-বাসনা দুঃখের কারণ হয়। এরপর তিনি একজন বৌদ্ধ গুরুর শিষ্যত্ব গ্রহণের জন্য পাহাড়ে গিয়ে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন এবং নালন্দার কাছাকাছি অঞ্চলে অধ্যয়ন করেন।

পরবর্তীকালে নাগার্জুন ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করেন। তিনি বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের সঙ্গে, এমনকি যাঁরা নতুন মহাযান বৌদ্ধধর্মের বিরোধিতা করতেন সেসব বৌদ্ধের সঙ্গেও ধর্মতত্ত্ব নিয়ে বিতর্কে অংশ নিতেন। নাগার্জুন পরবর্তী সময়ে একটি মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে তিনি নিজস্ব সন্ন্যাসী দল গড়ে তোলেন। তিনি দক্ষিণ ভারতের শাতবাহন রাজাদের, বিশেষত গৌতমীপুত্র শাতকর্ণী বা যজ্ঞশ্রী শাতকর্ণীর—রাজগুরু ও উপদেষ্টা ছিলেন বলেও কথিত আছে।

নাগার্জুনের জন্ম ও জীবনকাল সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে নানা মতভেদ আছে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, তিনি খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতকে দক্ষিণ ভারতের অমরাবতীর কাছে এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। এই সময় বৌদ্ধধর্ম চীন এবং অন্যান্য পূর্ব এশীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছিল।

বৌদ্ধ সাহিত্যে নাগার্জুনের অন্যতম প্রধান অবদান হলো অতি প্রভাবশালী ‘প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্র’ (বা ‘জ্ঞানের কথোপকথন’)। এটি বুদ্ধ ও তাঁর শিষ্যদের মধ্যে শূন্যতার গুরুত্ব নিয়ে কথোপকথনের একটি সংকলন, যা পূর্ণ জাগরণের জন্য অপরিহার্য।

একটি গল্প প্রচলিত আছে, একদিন নাগার্জুন একটি হ্রদের কাছে ধ্যান করছিলেন। তখন নাগ বা জলীয় জ্ঞান-সর্প হ্রদের উপরিভাগে এসে তাঁকে নাগদের জলজ রাজ্যে গিয়ে তাদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করে। তিনি তা করেন। কৃতজ্ঞতার নিদর্শন হিসেবে নাগেরা তাকে বারো খণ্ডের প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্র অর্পণ করে, যা মানুষের চেতনার জন্য উপযুক্ত ছিল। বলা হয়, এ ঘটনাই তাঁর ‘নাগার্জুন’ নামের উৎস। নাগার্জুনের প্রতিমামূলক চিত্রে তাঁকে প্রায়ই জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রতীক নাগ-সর্পদের একটি প্রতিরক্ষামূলক ছাউনির নিচে ধ্যানরত অবস্থায় দেখা যায়।

নাগার্জুনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ‘মূলমধ্যমিককারিকা’ (‘কেন্দ্র থেকে আসা শ্লোক’ বা ‘মধ্যম পথের মৌলিক প্রজ্ঞা’ বা ‘মাধ্যমিক সূত্র’)। এটি কবিতা আকারে লেখা। শূন্যতা ও আত্ম-অস্তিত্বের ক্ষণস্থায়ী প্রকৃতি নিয়ে কোয়ানের মতো ধাঁধা ও অনুসন্ধানের একটি সিরিজ এটি।

এই গ্রন্থে তিনি তাঁর বিখ্যাত শূন্যতাবাদ তথা শূন্যতার ধারণাটি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। শূন্যতা বলতে কোনো কিছুকে ‘নেই’ বা ‘শূন্য’ বলা হয় না, বরং এটি সব বস্তুর নিজস্ব অস্তিত্বের অভাবকে বোঝায়। নাগার্জুনের মতে, সবকিছুই পারস্পরিকভাবে নির্ভরশীল এবং কোনো কিছুরই স্বাধীন বা স্ব-অস্তিত্ব নেই। তিনি দেখিয়েছেন, সব ধারণাই আপেক্ষিক এবং বিপরীত ধারণার ওপর নির্ভরশীল। যেমন ‘দীর্ঘ’—এই ধারণার অস্তিত্ব শুধু ‘খাটো’ ধারণাটির পরিপ্রেক্ষিতেই সম্ভব।

নাগার্জুনের এই দর্শনকে মধ্যমক বা মাঝারি পথ বলা হয়। তিনি একদিকে যেমন শাশ্বতবাদী মতবাদকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, যারা বিশ্বাস করে সবকিছুই চিরন্তন, তেমনি উচ্ছেদবাদী (নিহিলিস্ট) মতবাদকেও বাতিল করেছেন, যারা মনে করে সবকিছুই ধ্বংসশীল। তাঁর মতে, কোনো বস্তুই চিরন্তনও নয়, আবার সম্পূর্ণ বিলীনও হয় না। সবকিছুই নির্ভরশীল উৎপত্তির (ডিপেন্ডেন্ট অরিজিনেশন) মাধ্যমে বিদ্যমান।

একদিন নাগার্জুন একটি হ্রদের কাছে ধ্যান করছিলেন। তখন নাগ বা জলীয় জ্ঞান-সর্প হ্রদের উপরিভাগে এসে তাঁকে নাগদের জলজ রাজ্যে গিয়ে তাদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করে। তিনি তা করেন। কৃতজ্ঞতার নিদর্শন হিসেবে নাগেরা তাকে বারো খণ্ডের প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্র অর্পণ করে, যা মানুষের চেতনার জন্য উপযুক্ত ছিল।
রুশ চিত্রশিল্পী এবং দার্শনিক নিকোলাস রোরিখের চিত্রকর্ম ‘নাগার্জুন: সর্প বিজয়ী’ (১৯২৫)

নাগার্জুনকে কেন্দ্র করে অসংখ্য রচনা প্রচলিত আছে। তবে পণ্ডিতেরা তাঁর ছয়টি প্রধান গ্রন্থকে খাঁটি বলে মনে করেন, যা ষড়-যুক্তিতত্ত্ব নামে পরিচিত। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘মূলমধ্যমককারিকা’। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো: ‘বিগ্রহব্যবর্তনী’—এখানে তিনি শূন্যতার ধারণার বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন যুক্তির খণ্ডন করেছেন। ‘যুক্তিশাষ্টিকা’—এটিও মধ্যমক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। ‘রত্নাবলী’—এই গ্রন্থে রাজা শাতকর্ণীকে উদ্দেশ করে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নীতি সম্পর্কে উপদেশ দেওয়া হয়েছে। ‘শূন্যতাসপ্ততি’—শূন্যতা নিয়ে রচিত আরেকটি মৌলিক গ্রন্থ। ‘বৈদল্যসূত্র’—এখানে তিনি যুক্তিতর্কের মাধ্যমে অন্য দার্শনিকদের মতবাদ খণ্ডন করেছেন।

এ ছাড়া তিনি রসায়নবিদ ও ভেষজবিশেষজ্ঞ হিসেবেও পরিচিত। তাঁর নামে কিছু রাসায়নিক ও ওষুধ–সম্পর্কিত গ্রন্থও প্রচলিত আছে, যা থেকে বোঝা যায় তাঁর জ্ঞান কত বহুমুখী ছিল।

নাগার্জুনকে প্রায়ই শুধু একজন দার্শনিক হিসেবে দেখা হলেও, তাঁর রচনায় কাব্যিক গভীরতা ও শিল্পসম্মত প্রকাশভঙ্গি সুস্পষ্ট। তাঁর রচনাগুলোতে গভীর তত্ত্বকথাকে সরল ও কাব্যিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁর দর্শন এতটাই সূক্ষ্ম এবং দার্শনিক যুক্তিতর্ক এতটাই জটিল যে তা বোঝার জন্য একধরনের আধ্যাত্মিক ও কাব্যিক অন্তর্দৃষ্টি প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, তাঁর শূন্যতার ধারণাটি কেবল একটি শুষ্ক দার্শনিক তত্ত্ব নয়, বরং এটি বিশ্ব এবং অস্তিত্বের এক গভীর কাব্যিক উপলব্ধি। তিনি উপমা ও রূপকের মাধ্যমে তাঁর জটিল ধারণাগুলোকে প্রকাশ করেছেন, যা সাধারণ পাঠকের কাছেও আকর্ষণীয়। ‘রত্নাবলী’র মতো গ্রন্থে তিনি কাব্যিক শৈলীতেই রাজা ও সাধারণ মানুষের জন্য জীবন ও ধর্মের উপদেশ দিয়েছেন।

নাগার্জুনের দর্শন–পরবর্তী বৌদ্ধচিন্তা, বিশেষ করে মহাযান বৌদ্ধধর্মের বিকাশকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। চীন, তিব্বত, কোরিয়া ও জাপানে মধ্যমক দর্শনের অসংখ্য অনুসারী ও টীকাকার তৈরি হয়েছে। তাঁর শূন্যতার ধারণা হিন্দু দর্শন ও অদ্বৈত বেদান্তের ওপরও প্রভাব ফেলেছিল। আদি শঙ্করাচার্যের অদ্বৈতবাদ ও নাগার্জুনের মধ্যমক দর্শনের মধ্যে কিছু সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়, যদিও তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য ভিন্ন। আজও তাঁর রচনাগুলো বৌদ্ধধর্মের পাশাপাশি দর্শন, যুক্তিশাস্ত্র ও জ্ঞানতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। নাগার্জুন তাই কেবল একজন দার্শনিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন চিন্তাবিদ, শিক্ষক ও কবি, যিনি মানব অস্তিত্বের মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজেছিলেন আর তা প্রকাশ করেছিলেন এক অনন্য শৈলীতে।

মহাযান বৌদ্ধধর্মের প্রায় সব শাখা (জেন, তিব্বতি, পূর্ব এশীয়) তাঁর শূন্যতাবাদকে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। চন্দ্রকীর্তি, শান্তিদেব, আর্যদেব, ভাববিবেক প্রমুখ মাধ্যমিক আচার্য তাঁর শিষ্যপরম্পরায় রয়েছেন। আধুনিক পাশ্চাত্য দার্শনিক (ভিটগেনস্টাইন, দেরিদা, নাগেল প্রমুখ) তাঁর যুক্তি ও ভাষাদর্শন নিয়ে আলোচনা করেছেন। কোয়ান্টাম ফিজিকস ও সমকালীন বিজ্ঞানের সঙ্গে শূন্যতার তুলনা করে অনেকে আলোচনা করেন।

নাগার্জুন কেবল একজন দার্শনিক নন, তিনি যুক্তি ও কবিতার সমন্বয়ে জগৎবোধের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। তাঁর শূন্যতার তত্ত্ব শুধু বৌদ্ধধর্মই নয়, সমগ্র ভারতীয় দর্শনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। আজও তাঁর চিন্তাধারা পণ্ডিতদের গবেষণার বিষয় ও আধ্যাত্মিক সাধকদের পথপ্রদর্শক। তিনি ছিলেন মানবমনের সীমাকে অতিক্রম করার সাহস প্রদানকারী মহাপুরুষ।

নাগার্জুনের দর্শনে বোধিসত্ত্বের ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি তাঁর শূন্যতা ও করুণার মূলনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাঁর কাছে বোধিসত্ত্ব হলেন এমন একজন আদর্শ ব্যক্তি, যিনি প্রজ্ঞা বা জ্ঞান এবং করুণার পূর্ণাঙ্গ সমন্বয় সাধন করেছেন। জ্ঞান (প্রজ্ঞা) হলো শূন্যতার উপলব্ধি।

নাগার্জুনের দর্শনে বোধিসত্ত্বের ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি তাঁর শূন্যতা ও করুণার মূলনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাঁর কাছে বোধিসত্ত্ব হলেন এমন একজন আদর্শ ব্যক্তি, যিনি প্রজ্ঞা বা জ্ঞান এবং করুণার পূর্ণাঙ্গ সমন্বয় সাধন করেছেন।

জ্ঞান (প্রজ্ঞা) হলো শূন্যতার উপলব্ধি। বোধিসত্ত্ব উপলব্ধি করেন যে সব ধর্ম (বস্তু বা ঘটনা) স্ব-ভাব বা নিজস্ব, স্বাধীন অস্তিত্ব থেকে শূন্য। এই উপলব্ধি তাঁকে সব ধরনের দার্শনিক মতবাদ, বিভেদ এবং বন্ধন থেকে মুক্ত করে।

শূন্যতার এই উপলব্ধি থেকেই জন্ম নেয় এক বিশাল করুণা। যেহেতু বোধিসত্ত্ব বোঝেন যে সব সত্তাই পরস্পর নির্ভরশীল এবং তারা উৎপত্তির (প্রতীত্যসমুৎপাদ) জালে আবদ্ধ, তাই তিনি এই মায়াজাল বা দুঃখ থেকে অন্যদের মুক্ত করার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেন। শূন্যতার জ্ঞান করুণাকে নিরাসক্ত করে তোলে, ফলে বোধিসত্ত্বের সেবাকর্ম কোনো ফল লাভের আকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্ত থাকে।

নাগার্জুন ব্যাখ্যা করেছেন, সংসার (দুঃখময় জীবনচক্র) এবং নির্বাণ (মুক্তি) মৌলিকভাবে পৃথক নয়। বোধিসত্ত্ব এ সত্যটি গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। নাগার্জুন বলেন, ‘সংসারের চরম সীমা হলো নির্বাণ; নির্বাণের চরম সীমাও সংসার।’ সাধারণ মানুষ অবিদ্যা বা অজ্ঞানতাবশত সংসারের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। বোধিসত্ত্ব হলেন শূন্যতার জ্ঞানী এবং করুণার মূর্ত প্রতীক, যিনি নিজস্ব নির্বাণকে স্থগিত রেখে সব সত্তার মুক্তির জন্য পৃথিবীতে কাজ করে যান।

নাগার্জুনের দৃষ্টিতে মুক্তি কোনো অতীন্দ্রিয় চমক নয়। এটা দৃষ্টিভঙ্গির একটি বদল। সত্তার আঁকড়ে ধরার প্রবণতা শিথিল হলে বিশ্বের সবকিছু সহজ লাগে। আর সেই সহজভাব থেকেই জন্ম নেয় করুণা। কারণ, তখন বোঝা যায়, অপর আর আমি আলাদা কোনো দুর্গ নয়, একটি বয়ে যাওয়া সম্পর্কমাত্র।

নাগার্জুনের শূন্যতাবাদ আজও আমাদের মুক্ত দৃষ্টিতে জীবন ও জগতের সত্য উপলব্ধি এবং সব মানুষ ও সর্বসত্তার প্রতি মমতা ও দায়িত্বশীলতা চর্চায় প্রণোদনা জাগায়। তাঁর ভাবধারা আমাদের জ্ঞান ও প্রেমের যুগলবন্দী শোনায় নিত্য।

নাগার্জুনের কিছু কাব্যিক প্রকাশ


জগৎকে যেভাবে দেখি
সেভাবেই সে বাঁধে আমাদের।
যদি দেখা বদলায়
বাঁধনও খুলে যায় শান্তির মতো নিঃশব্দে।


আমি কোনো সত্য বলি না
তুমি কোনো অসত্যও খুঁজে পাবে না—
শুধু দেখিয়ে দিই
যে সত্য-অসত্য দুটোই দাঁড়িয়ে আছে নির্ভরতাহীনতায়।


যেখানে জন্ম নেই
সেখানে মৃত্যু কীভাবে থাকবে?
যা আসে, আসে জোয়ারের ঢেউয়ের মতো
কেবল মিলনের কারণে।


শূন্যতা ভয় পাবার কিছু না—
এটা এমন শূন্যতা
যেখানে সবকিছুই সময়ের সঙ্গে বদলে অন্য রূপ নেয়।
এটাই অমৃত।


যে বোঝে নির্ভরতার সুতো
সে বোঝে করুণার ভারী গভীরতা।
এমন মানুষ
নিজের কোনো সম্পদ রাখে না—
তবু সবার জন্য আলো হয়ে থাকে।


বোধির সঙ্গে একীভূত মন
জ্বলন্ত অগ্নিশিখার মতো,
যা কাঠ দগ্ধ করে—
তেমনি সে দগ্ধ করে মোহ,
ভস্ম করে মিথ্যা আত্মবোধ।


না আছে সত্তা, না অসত্তা,
না তা চিরন্তন, না তা লুপ্ত।
এই জগৎ—
এক প্রতিফলন মাত্র,
স্বপ্ন কিংবা মরীচিকা।


নিজ হতেই কিছু জন্মায় না,
পর হতেই নয়,
না তা দুইয়ের মিলনে—
কারণহীনও নয় কিছুই।
সৃষ্টির সবই নির্ভরশীল।


হে শূন্যতা!
তুমি করুণার গর্ভগৃহ,
তুমি আবির্ভাব-লয়ের মূল।
তুমি শূন্য নও,
তুমি সম্ভাবনার বিশাল নীড়।

১০
যদি খোঁজো সুখ—
এই জগতে ও পরজগতে,
তবে গড়ো করুণা,
গড়ো প্রজ্ঞা,
গড়ো অনাসক্তির গঠন।
এটাই জ্ঞানীর প্রকৃত অলংকার।

১১
যেখানে আছে প্রত্যক্ষণ,
সেখানে আছে বিভ্রান্তি।

১২
জলের মাঝে প্রতিফলিত চাঁদের মতো—
জাগতিক বস্তু বড়ই বাস্তব মনে হয়।
তবে ধরতে গেলেই—
সেগুলো মিলিয়ে যায় মুঠোর ফাঁকে।

১৩
শূন্যতা: যদি না থাকে করুণা,
তবে তা খাপহীন এক তলোয়ার।
আর করুণা: যদি না জানে শূন্যতা,
তবে তা কূলহীন নদীর মতো।

১৪
যা কিছু জন্মায়—
তা একদিন মরবে।
যা কিছু জড়ো হয়—
তা একদিন বিচ্ছিন্ন হবে।
যা কিছু গড়া হয়—
তা একদিন ধসে পড়বে।
যা কিছু উঠেছে—
তা একদিন পড়বেই।

১৫
যে মায়ার ফাঁকি বুঝতে পারে,
সে জগতে চলে নির্ভীক পায়ে।
জলের ওপর চাঁদের মতো—
থাকে, কিন্তু ছোঁয়া যায় না।

১৬
যে মন চায় সকল প্রাণের মুক্তি,
সে-ই সর্বোচ্চ রত্ন।
জীবন দিয়ে আগলে রাখো তাকে—
কারণ এ-ই পারে নিয়ে যেতে তোমায় মুক্তির দিকে।

১৭
শব্দ—মনকে ফাঁসায়।
যুক্তি—সত্যের ওপর এক আবরণ।
তবে শ্রেয় হলো নিঃশব্দে বসা,
আর মৌনতার মাঝে আত্মবোধ গলিয়ে দেওয়া।

১৮
দড়ি আসলে দড়িই,
সেখানে সাপ নেই।
তবু হৃদয়ে যে ভয়—
তা বড়ই বাস্তব, বড়ই তীব্র।

১৯
চোখ ছুটে চলে রূপের পিছে,
কান আকুল ধ্বনির খোঁজে।
মন ধরে রাখে মায়াকে,
ভুলে যায় নিজের দীপ্ত সত্য।

২০
অতীত মানে স্মৃতি,
ভবিষ্যৎ মানে কল্পনা।
বর্তমান—ধরা যায় না।
তবে তুমি কে—আসলেই?

২১
হাজার উৎসর্গের চেয়েও শ্রেয়—
একটি সত্যিকারের দয়ার কাজ।
লক্ষ প্রার্থনার চেয়েও বড়—
একটি করুণাময় মুহূর্ত।

২২
তুমি পাঠ করো শাস্ত্র,
উচ্চারণ করো মন্ত্র।
কিন্তু জানো কি সেই আত্মা—
যে আছে ওসবের অতীত?

২৩
যখন আত্মা ধরা দেয় শূন্যরূপে,
আর জগৎ প্রতিভাত হয় মনের খেলা,
তখন আসে শান্তি—
আর পথ নিজেই মিলিয়ে যায়।