গ্রাফিকস: প্রথম আলো
গ্রাফিকস: প্রথম আলো

জন্মদিনে অর্ঘ্য

আমার মায়েস্ত্রো, মনিরুল ইসলাম স্যার

অনেক অনেক শুভকামনা স্যার। আপনার তারুণ্যভরা জীবন আরও দীর্ঘ হোক। সৃষ্টিমুখরতায় মগ্ন থাকুন জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত। শিল্পী মনিরুল ইসলামের জন্ম ১৯৪৩ সালের ১৭ আগস্ট। জন্ম জামালপুর জেলার ইসলামপুরে। অবশ্য স্যারের পৈতৃক ভিটামাটি চাঁদপুর। তাঁর সঙ্গে আমি চাঁদপুরে গেছি। তিনি আমাকে কিশোরগঞ্জের কথাও বলেছিলেন, সেখানে ছেলেবেলা কেটেছে।

আর্ট কলেজের খুব মেধাবী ও পরিশ্রমী ছাত্র ছিলেন তিনি। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সান্নিধ্য পেয়েছেন। ১৯৬৬ সালে তখনকার চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েট হন। এর পরে পরেই চারুকলা মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে তিনি স্প্যানিশ গভর্নমেন্টের একটি বৃত্তি নিয়ে স্পেনে উচ্চশিক্ষার্থে চলে যান। প্রথমবার তিনি ৪০ বছর পর দেশে ফিরেছিলেন, ১৯৯০-এর দশকের প্রথমভাগে। তত দিনে তিনি স্পেনে শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান হয়েছেন। ইউরোপ থেকে তিনি বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়ে গেছেন।

২০১৮ সালে পেয়েছেন স্পেনের সর্বোচ্চ পুরস্কার কমান্ডার স্প্যানিশ অর্ডার অব মেরিট। ২০১০ সালে পেয়েছেন স্পেনে বেসামরিক আরেকটি রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ক্রস অব অফিসার অব দ্য অর্ডার অব কুইন ইসাবেলা। স্পেনের ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন ১৯৯৭ সালে। বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘একুশে পদক’ পেয়েছেন ১৯৯৯ সালে।

শিল্পী মনিরুল ইসলামের সঙ্গে লেখক

এতক্ষণ যাঁকে নিয়ে লিখছিলাম, তিনি আমার শিক্ষক, আমার মায়েস্ত্রো। আজ শিল্পী মনিরুল ইসলামের ৮৩তম জন্মদিন। তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছাত্র-শিক্ষকেরও অধিক। থাকি একই শহরে, পাশাপাশি, খুব বেশি দূরে নয়। তবু আজকাল দেখা হয় না। দেখা না হওয়ার ব্যাপারটা একটু দীর্ঘ হলে স্যার চিঠি লেখেন। কী যে সরল সেই চিঠি। কী যে স্নেহমাখা, ভালোবাসাময় সেই চিঠি—আমি পড়ি আর চোখ ভিজিয়ে ফেলি। আমার চোখ বেয়ে টপ টপ করে জল পড়তে থাকে। তখন মনে হয় এই এত বড় মানুষটির ভেতর এমন শিশুর সারল্য?

তাঁর ছবি, শিল্পদর্শন, শিল্পচেতনা এসব নিয়ে আজ লিখব না। আমি তাঁকে মানুষ হিসেবে কেমন জেনেছি দীর্ঘ ৩০ বছরে, সেটাই লিখব। তাঁর শিল্পকর্মকে জানতে হলে তাঁকে চিনতেই হবে।

২.

একদিনের কথা বলি। একদুপুরে আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। খুব খারাপ বোধ করছি। মনে হচ্ছে আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না। আমি কাউকে ফোন করব, সেই বোধবুদ্ধিও হারিয়ে ফেলেছি। প্যানিক ডিজঅর্ডারের মতো। মনির স্যার ঠিক ওই মুহূর্তেই ফোন করেছেন। আমার কণ্ঠস্বর শুনে তিনি বললেন, ‘ওই... তুমি ঠিক আছ তো? তোমার গলা এমন ক্যান?’ আমি কিছু বলার আগেই তিনি ফোন রেখে দিলেন।

বিশ্বাস করুন বন্ধুরা আমার, উনি ১০ মিনিটের মধ্যে আমার বাড়িতে এসে হাজির, ‘রফি, আইছি। ডা. মাহবুবরে ফোন করতাছি। তুমি আমার লগে এখুনি হসপিটালে চলো। কুনু কিছু পাইলাম না, ...একটা কাইলা ট্যাক্সি (কালো ট্যাক্সি ক্যাব) ধইরা আনছি। দেরি কইরো না।’

৩.

আমি তখনো কাঁপছি। ট্যাক্সি পর্যন্ত যাবার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছি। স্যার এবার সত্যি ঘাবড়ে গেলেন। কিন্তু স্যারের ধইরা আনা ‘কাইল্যা ট্যাক্সিতে’ উঠে মনটা ভালো হয়ে গেল! কারণ, ট্যাক্সির দরজা খুলতে স্ক্রুড্রাইভার লাগে, দরজার নিচের কিছু অংশ মরচে ধরে খসে পড়ে গেছে। গাড়ি চলতে শুরু করলে ঝুরঝুর করে চানাচুরের ঝুরির মতো গাড়ির নানা অংশের টিনের গুঁড়া ঝরে পড়ে রাস্তার ঝাঁকুনিতে। দরজার কাচ নামাতে হয় স্ক্রুড্রাইভার আর প্লায়ার্সের সংযোগ ঘটিয়ে বিশেষ কায়দায়। যে সিটে বসেছি, সিটটি মোড়ার ওপরে বসানো! ...আমি ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছি গাড়িতে উঠে। এটা ঠিক করি, ওটা ঠিক করি। কালশিটে তেল চিটচিটে সিটে বসে স্যারও হাসেন, আমিও হাসি। ওই সিটেই স্যারকে মহারাজার মতো লাগছে। জানালার তেরছা আলো এমন শৈলীতে তাঁর মুখে পড়েছে যে একটা আলো-আঁধারির রহস্য তৈরি হয়েছে। আমি ভুলেই গেলাম, আমি একটু আগেও মুমূর্ষু ছিলাম! আমরা হাসপাতালে চলেছি!

৪.

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ইমার্জেন্সি, আউটডোর, ইনডোর পুরোটাই দুর্বৃত্ত আর দালালদের দখলে। আমাকে ইসিজি করানো হবে প্রথমেই। ইমার্জেন্সি বেডও নিয়ন্ত্রণ করে ওই সব দালাল। দালালদের একজন আমাকে মেঝেতে শুয়ে পড়তে বলল। স্যার ওই দালালকে ইশারা করে বললেন, ‘ওই মিয়া হেরে চিনো... হের খবর পাইলে মিয়া দৌড়াদৌড়ি শুরু হইব...’

মুহূর্তেই বেড আর নতুন সাদা চাদর হাজির!

শিল্পী মনিরুল ইসলামের পেইন্টিং

৫.

স্যারকে নিয়ে কত কথা আমার। মাটির মানুষ। সরল মানুষ। বন্ধুপ্রাণ মানুষ শিল্পী মনিরুল ইসলাম। তাঁর স্টুডিওতে গেছেন—আপনাকে নিজ হাতে রান্না করে খাওয়াবেন না, এটা হতেই পারে না। হাসিমুখে রান্না করবেন ছবি আঁকার ফাঁকে ফাঁকে। স্প্যানিশ সালাদ বানাবেন। থালাবাসন মাজবেন। শেষে একটা অসাধারণ কফি...! আর আপনি মুগ্ধ হয়ে শিল্পী মনিরুল ইসলামকে দেখবেন।

৬.

মাদ্রিদে গিয়ে তাঁকে আরও অন্যভাবে দেখেছি। তাঁর সঙ্গে থেকেছি। দূরে বেড়াতে গেছি। আমার কাছে মানুষটি অবিশ্বাস্য। এখন তাঁর ৮২! অবিরাম স্মোক করেন। এখনো তিনি সারা রাত ছবি আঁকেন। ভোর চারটা-পাঁচটায় ঘুমাতে যান। আবার সকাল নয়টাতেই তাঁকে পাওয়া যাবে ব্রেকফাস্ট টেবিলে। তাঁর তুলনা তিনি।

৭.

স্যার আপনি দীর্ঘজীবী হোন।

আমাদের শিল্পকলার অঙ্গনকে আরও সমৃদ্ধ করুন।

ভালোবাসি স্যার আপনাকে।