শিল্পী কামরুল হাসানের মৃত্যুদিন

বড় আশার বাসা এ ঘর

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

শিল্পী কামরুল হাসান স্যার একদিন আমাদের ক্লাসে এসেছিলেন। আমরা তখন ফার্স্ট ইয়ারে। তাঁর বন্ধু সাহিত্যিক সরদার জয়েন উদ্দিনের মেয়েকে দেখতে। তিনি হয়তো শুনেছিলেন তাঁর বন্ধুকন্যা আর্ট কলেজে পড়ে। আমাদের শ্রেণিশিক্ষক মাহবুবুল আমিন স্যার একদিন সকালে ক্লাসে বললেন, সাহিত্যিক সরদার জয়েন উদ্দিন সাহেবের মেয়ে কে? আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে আমাদেরই রূপশিখা বানু উঠে দাঁড়াল।

কামরুল হাসান স্যার তাকে কাছে ডেকে নিলেন। মাথায় হাত রেখে স্নেহ করলেন। আমরা অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম। আমাদের বিস্ময়ের শেষ নেই। আমরা নিজের চোখে কামরুল হাসানকে দেখছি! সেই প্রথম দেখেছিলাম স্যারকে। তিনি তখন কত বিখ্যাত! তিনি বোধ হয় তখন বিসিক থেকে অবসর নিয়েছিলেন। বিসিকের শিল্প বিভাগ তাঁর হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান। আমাদের শিল্পকলা একাডেমিও তাঁর হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান। পরে তিনি বিসিকের নকশা কেন্দ্র (ডিজাইন সেন্টার) গড়বেন বলে শিল্পকলা একাডেমির দায়িত্ব শিল্পী সৈয়দ জাহাঙ্গীরের হাতে দিয়ে বিসিকে চলে গেলেন।

কামরুল হাসানের শিল্পকর্ম

২.

যা বলছিলাম, ওই বছরেই স্যারের সঙ্গে আবার দেখা হলো আর্ট কলেজের পিকনিকে। স্যার আমাদের সঙ্গে গাজীপুর জাতীয় উদ্যানে গিয়েছিলেন। তখনকার গাজীপুর—গভীর বন আর জঙ্গল। টঙ্গী পার হয়ে গাজীপুরের জয়দেবপুর চান্দনা চৌরাস্তায় আব্দুর রাজ্জাক স্যারের ভাস্কর্য ‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’ পার হলেই গা ছমছম করা গভীর ঘন বন-গাছপালা-জঙ্গল শুরু হতো। তার মাঝখানে, জঙ্গলের বুক চিরে কালো পিচের রাস্তা। এখন কত পরিবর্তন হয়ে গেছে। সেসবের কিছুই অবশিষ্ট নেই বলতে গেলে।

গাজীপুর জাতীয় উদ্যানে শিল্পী কামরুল হাসানের সান্নিধ্যে আমরা

সেবার স্যার পিকনিকে আমাদের সঙ্গে গোল হয়ে মাটিতে বসে আড্ডা দিলেন। রূপশিখা স্যারকে লালনের গান শোনাল:

‘পরিয়ে কৌপনি ধ্বজা মজা উড়ালো ফকিরী
দেখ না মন ঝাকমারি এই দুনিয়াদারি।
বড় আশার বাসা এ ঘর
পড়ে রবে কোথা রে কার ঠিক নাই তারই
পিছে পিছে ঘুরছে শমন কোনদিন হাতে দেবে দড়ি।’...

রূপশিখার গলায় লালনের এই গান আমার মনকে আজও আর্দ্র করে তোলে। আমি নিজেও অন্তরের গভীর থেকে এই গানের ধ্বনি শুনি, গুনগুন করি—দেখ না মন ঝাকমারি এই দুনিয়াদারি...আহা!

...বড় আশার বাসা এ ঘর
পড়ে রবে কোথা রে তার ঠিক নাই তারই...

কামরুল হাসানের শিল্পকর্ম

স্যারের মৃত্যুর দুদিন আগে ভোরে আমরা আর্ট কলেজের ভেতরেই চিড়িয়াখানার কাছে ওয়াটার কালারে ছবি আঁকছিলাম। সাড়ে ছয় বা সাতটা বাজে। হঠাৎ দেখলাম স্যার বড় পন্ডের সিমেন্টের রাস্তা ধরে এগিয়ে আসছেন। আমাদের কলেজের মালি স্যারকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘স্যার, এত সকালে?’

স্যার বললেন, ‘গাছের পাতাগুলোর রং দেখতে এসেছি। দেখেছ, কী সুন্দর নতুন কাঁচা সবুজ পাতা এসেছে গাছে।’...

আমার মনে হলো, সারা রাত স্যার টিএসসিতে কবিতা উৎসবে ছিলেন। সেখান থেকেই তাঁর প্রিয় আর্ট কলেজে এসেছেন। আর্ট কলেজের গাছগুলোকে দেখতে।

৩.

কামরুল হাসান (জন্ম: ২ ডিসেম্বর ১৯২১—মৃত্যু: ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮)

এর দুদিন বাদেই কবিতা উৎসবেই স্যারের মৃত্যু হলো। মৃত্যুর কয়েক মিনিট আগে তিনি স্বৈরশাসক এরশাদকে নিয়ে স্কেচ আঁকেন ‘দেশ আজ বিশ্ববেহায়ার খপ্পরে’ শিরোনামে।

এর আগে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালে এঁকেছিলেন—পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের রক্তপায়ী, হিংস্র মুখমণ্ডলসংবলিত একটি পোস্টার। পোস্টারটির শিরোনাম ছিল: ‘এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে’।

মৃত্যুর পর সামরিক জান্তা এরশাদ কামরুল হাসানের লাশ গুম করে দিতে চেয়েছিল; কিন্তু পারেনি তা। সে সময়ের সাহসী তরুণ ছাত্রনেতা শিল্পী কামাল পাশা চৌধুরীর প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে ও নেতৃত্বে স্যারের মৃতদেহ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল থেকে বের করে আনতে পেরেছিলেন।

কামরুল হাসান স্যারের মরদেহ গোসল শেষে কাফন পরিয়ে চারুকলায় আনা হলে সেখানে পাহারা দিয়েছিলেন কে জানেন? শুনলে অবাক হবেন। তিনি হলেন সবার শ্রদ্ধেয় কবি সুফিয়া কামাল। মরদেহের পাশে অবিরাম কোরআন পাঠ করছিলেন। আমাদের ভয় ছিল, তাঁর মরদেহ সামরিক জান্তা উঠিয়ে নিয়ে যাবে।

বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে সারা রাত লুকিয়ে রাখা হয়েছিল কামরুল হাসান স্যারের মরদেহ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের ইমাম সাহেবের জ্বর ছিল, শিল্পী কামরুল হাসানের শেষ গোসলটা করিয়েছিলেন আমাদের সহপাঠী কামাল পাশা চৌধুরী।

কামরুল হাসানের শিল্পকর্ম

৪.

পরদিন প্রত্যুষে কামরুল হাসান স্যারের সেই মরদেহ গোসল শেষে কাফন পরিয়ে চারুকলার জয়নুল গ্যালারিতে আনা হলে সেখানে পাহারা দিয়েছিলেন কে জানেন? শুনলে অবাক হবেন। তিনি হলেন সবার শ্রদ্ধেয় কবি সুফিয়া কামাল। তিনি মরদেহের পাশে অবিরাম কোরআন পাঠ করছিলেন। তখনো আমাদের ভয় ছিল, তাঁর মরদেহ সামরিক জান্তা উঠিয়ে নিয়ে যাবে। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই চারুকলায় দেশের কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, লেখক, ফিল্মমেকার, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, বিচারপতি, সম্পাদকসহ সর্বস্তরের নগরবাসীর ঢল নেমে যায়। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। এমন রাজকীয় বিদায় আর হয় না।

এখানে বলে রাখি, স্যারের দাফন নিয়েও অনেক ঝামেলা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পাসে দাফনে সম্মত হচ্ছিল না। ওই সময়ের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন স্যারের পাশে শিল্পী কামরুল হাসানকে দাফন করতে সম্মত না হয়ে পুলিশ দিয়ে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। কিন্তু ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এবং সাংস্কৃতিক জোট আর আমরা চারুকলার ছাত্রছাত্রীরা জোর করেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন স্যারের কবরের পাশে দাফন সম্পন্ন করি।

আজ ২ ফেব্রুয়ারি শিল্পী কামরুল হাসানের মৃত্যুদিন। তাঁর স্মৃতির প্রতি এ শ্রদ্ধাঞ্জলি।